বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দামে আবারও ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার খাদ্য মূল্যসূচক আগের মাসের তুলনায় ১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দামও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে খাদ্য মূল্যসূচক গড়ে ১৩৬ পয়েন্টে উঠেছে। আগস্টের সংশোধিত সূচকের তুলনায় এটি বেশি। এক বছর আগের সেপ্টেম্বরের তুলনায়ও সামগ্রিক খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৮ শতাংশ।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে খাদ্যপণ্যের সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় তৈরি হওয়া চাপ, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং ভবিষ্যতে সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কা দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে কাজ করছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো বলেছেন, হরমুজ প্রণালি ও কৃষ্ণসাগর এলাকায় পরিবহন বিঘ্নের পাশাপাশি জলবায়ুজনিত সমস্যাও জ্বালানি, পরিবহন ও গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্যের বাজারে চাপ তৈরি করছে।
এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর সাধারণ মানুষের খাদ্য ব্যয়েও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
গম ও ভুট্টার দামেও বড় উত্থান
সেপ্টেম্বরে খাদ্যশস্যের বাজারে উল্লেখযোগ্য মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার খাদ্যশস্য মূল্যসূচক আগস্টের তুলনায় ৫ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। এক বছরের ব্যবধানে এই সূচক বেড়েছে ১৭ দশমিক ২ শতাংশ।
এর মধ্যে গমের দাম সেপ্টেম্বর মাসে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সমস্যার পাশাপাশি উত্তর আমেরিকার কিছু এলাকায় বীজ বপনের মৌসুমের আগে শুষ্ক আবহাওয়া গমের দামে প্রভাব ফেলেছে।
একই সময়ে ভুট্টার আন্তর্জাতিক দাম বেড়েছে ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রে ফলন নিয়ে উদ্বেগ, ব্রাজিল থেকে রপ্তানির পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা এবং কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলে বাণিজ্যিক পরিবহনে বিঘ্ন—সব মিলিয়ে ভুট্টার বাজারেও চাপ তৈরি হয়েছে।
গম ও ভুট্টা খাদ্য, পশুখাদ্য এবং কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এসব পণ্যের দাম বাড়লে আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দামও বাড়ল
খাদ্যশস্যের অন্যান্য পণ্যের তুলনায় তুলনামূলক কম হারে হলেও সেপ্টেম্বরে চালের দামও বেড়েছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সব ধরনের চালের মূল্যসূচক আগস্টের তুলনায় ১ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
আবহাওয়াজনিত উদ্বেগ এবং মৌসুমি সরবরাহ কিছুটা কমে আসার কারণে বিশেষ করে ইন্ডিকা জাতের চালের দামে ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে। আগস্টেও চালের মূল্যসূচক শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছিল। অর্থাৎ সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম ধারাবাহিকভাবে কিছুটা বাড়ছে।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার চাল উৎপাদন নিয়েও অনিশ্চয়তা বাড়ছে। শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর প্রভাবে এসব অঞ্চলের আবহাওয়া ও কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে চাল উৎপাদন হতে পারে ৫৫ কোটি ২৫ লাখ টন। ভারতের উৎপাদন পূর্বাভাস কমে যাওয়ায় সামগ্রিক উৎপাদনের হিসাবেও প্রভাব পড়েছে। দেশটিতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত সঠিকভাবে না হওয়াকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে জাপান ও নেপালের উৎপাদন পূর্বাভাস কিছুটা ভালো হয়েছে।
এল নিনো বাড়াচ্ছে উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা
খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বলছে, ২০২৬ সালে আন্তর্জাতিক চালের বাণিজ্য ২ দশমিক ২ শতাংশ কমতে পারে। তবে ২০২৭ সালে তা আবার ১ দশমিক ৭ শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এল নিনোর সময় বিশ্বজুড়ে ধানের ফলন সাধারণ প্রবণতার তুলনায় প্রায় ১ থেকে ১ দশমিক ৫ শতাংশ কম হতে পারে। ফলে আগামী মাসগুলোতেও আন্তর্জাতিক চালের বাজারে আবহাওয়ার প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চালের পাশাপাশি অন্যান্য কৃষিপণ্যেও দাম বেড়েছে। সেপ্টেম্বরে ভোজ্যতেলের মূল্যসূচক শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। বিশ্ববাজারে আমদানির চাহিদা বৃদ্ধি এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় শুষ্ক আবহাওয়া নিয়ে উদ্বেগের কারণে প্রধানত পাম তেলের দাম বেড়েছে।
চিনির মূল্যসূচক আরও বেশি, ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়েছে। ২০২৬-২৭ মৌসুমে বিশ্ববাজারে সরবরাহ কিছুটা সংকুচিত হতে পারে—এমন প্রত্যাশা দাম বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
তবে সব খাদ্যপণ্যের দাম বাড়েনি। সেপ্টেম্বরে মাংসের মূল্যসূচক ১ দশমিক ১ শতাংশ কমেছে। দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যের মূল্যসূচকও শূন্য দশমিক ১ শতাংশ কমেছে।
খাদ্যশস্যের মজুত থাকলেও ঝুঁকি বাড়ছে
বিশ্বে খাদ্যশস্যের উৎপাদন এখনো তুলনামূলক বড় পর্যায়ে রয়েছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বে মোট খাদ্যশস্য উৎপাদন হতে পারে প্রায় ২৯৭ কোটি ৯০ লাখ টন। ২০২৫ সালের তুলনায় এটি ২ দশমিক ১ শতাংশ কম হলেও ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উৎপাদন হতে পারে।
২০২৬-২৭ মৌসুম শেষে বিশ্বে খাদ্যশস্যের মজুত প্রায় ৯৫ কোটি টনে দাঁড়াতে পারে। ব্যবহারের তুলনায় মজুতের অনুপাতও ৩১ দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে। অর্থাৎ সামগ্রিকভাবে বিশ্ববাজারে খাদ্যশস্যের মজুত এখনো যথেষ্ট রয়েছে।
তবে পরিবহন ব্যবস্থায় বিঘ্ন, পণ্য পরিবহনের খরচ বৃদ্ধি, সারের দাম বাড়া এবং আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা খাদ্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
বিশেষ করে চালনির্ভর এশীয় দেশগুলোর জন্য মৌসুমি সরবরাহ কমে যাওয়া, আবহাওয়ার পরিবর্তন এবং শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব আগামী কয়েক মাসে আন্তর্জাতিক খাদ্যবাজারের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠতে পারে বলে জানিয়েছে খাদ্য ও কৃষি সংস্থা।

