ইরান যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা এবং তেলের দাম বাড়ার চাপ সামাল দিতে জরুরি মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিশ্বের শিল্পোন্নত সাত দেশের জোট জি৭। শুক্রবার নেওয়া এই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জোটভুক্ত দেশগুলো ও তাদের অংশীদাররা সমন্বিতভাবে মোট ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়বে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বয়ে এই মজুত ছাড়ার কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু হবে এবং চার মাস ধরে চলবে। এর মধ্যে প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। জি৭ জানিয়েছে, ইতোমধ্যে যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে, সেগুলোর বিষয় বিবেচনায় রেখেই নতুন করে এই সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তবে মোট ১০ কোটি ব্যারেলের মধ্যে কত পরিমাণ অপরিশোধিত তেল, কত পরিমাণ ডিজেল এবং অন্যান্য জ্বালানি থাকবে, তা এখনো বিস্তারিতভাবে জানানো হয়নি। কোন কোন দেশ কতটা মজুত ছাড়বে, সেই হিসাবও প্রকাশ করা হয়নি। জি৭ জানিয়েছে, প্রয়োজন দেখা দিলে আরও ডিজেল বাজারে ছাড়ার সম্ভাবনা নিয়ে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার পরিসরে আলোচনা হবে।
এই সিদ্ধান্তের পেছনে আন্তর্জাতিক বাজারের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জ্বালানির বাড়তি দাম কমানোর জন্য মিত্র দেশগুলোর কাছ থেকে সহযোগিতা চেয়ে আসছেন। শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি ইউরোপের বড় মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে জানান, এর কার্যক্রম দ্রুত শুরু হবে।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম কমানোর এই তৎপরতার সঙ্গে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনও জড়িয়ে আছে। আগামী ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। এর আগে দেশটির ভোক্তাদের ওপর জ্বালানির বাড়তি দামের চাপ কমাতে ট্রাম্প প্রশাসন আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে।
রয়টার্সের আগের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন জার্মানি ও ফ্রান্সকে জরুরি ডিজেল মজুত থেকে জ্বালানি বাজারে ছাড়ার জন্য চাপ দিয়েছিল। তিনজন আলোচনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির বরাত দিয়ে ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশ দুটি মজুত কমাতে রাজি না হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল রপ্তানির ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।
এরই মধ্যে জি৭-এর যৌথ বিবৃতিতে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে জ্বালানি পণ্য রপ্তানির ওপর কোনো ধরনের বাধা না দেওয়ার অঙ্গীকার করা হয়েছে। অর্থাৎ সংকটের সময়ে এক দেশ থেকে আরেক দেশে জ্বালানি সরবরাহ যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সে বিষয়ে একটি সমন্বিত অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
তবে এই সিদ্ধান্তকে কতটা কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, তা নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে ভিন্ন ব্যাখ্যাও রয়েছে। জ্বালানি বাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান এনার্জি অ্যাসপেক্টসের বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এটি মূলত একটি রাজনৈতিক বার্তা। তাদের মতে, ১০ কোটি ব্যারেলের বড় অঙ্কের ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে সন্তুষ্ট করা এবং সম্ভাব্য ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা ঠেকানোর উদ্দেশ্যেও দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। একই সঙ্গে এটি জ্বালানি বাজারে সরবরাহ বাড়ানোর মাধ্যমে দামের ওপর চাপ কমানোর একটি প্রচেষ্টাও।
ইউরোপের জন্য ডিজেল সরবরাহের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইরান যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি উৎপাদনকারী দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় চলতি বছর ইউরোপ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ডিজেল আমদানি বাড়িয়েছে। ফলে ইউরোপীয় বাজারে জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কিছুটা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে ইউরোপের নিজস্ব জরুরি মজুত থেকে ডিজেল ছাড়ার উদ্যোগ বাজারের চাপ সাময়িকভাবে কমাতে পারে।
শুক্রবার ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে একটি প্রস্তাবও আলোচনা হয়েছে। আলোচনার সঙ্গে পরিচিত তিনজন ব্যক্তির বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, ফ্রান্সের প্রস্তাব ছিল ইউরোপীয় দেশগুলো মিলে ৫ কোটি ব্যারেল ডিজেল এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সদস্য দেশগুলো আরও ৫ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়বে। শেষ পর্যন্ত জি৭-এর যৌথ বিবৃতিতে মোট ১০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি ছাড়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
ইউরোপের জন্য এই মজুত ছাড়ার পরিমাণও কম নয়। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ৫ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়ার অর্থ হবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট জরুরি ডিজেল ও গ্যাস তেল মজুতের প্রায় ১৭ শতাংশ বাজারে নিয়ে আসা। একই পরিমাণ জ্বালানি ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক বছরের মোট ব্যবহারের প্রায় ৩ শতাংশের সমান।
বাজারে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব ঘোষণার আগেই দেখা গেছে। মজুত জ্বালানি ছাড়ার আলোচনা সামনে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ডিজেল সরবরাহের দাম কমেছে। শুক্রবার প্রতি গ্যালন ডিজেলের ভবিষ্যৎ চুক্তির দাম ৪ শতাংশের বেশি কমে ৪ দশমিক ৪৪৯১ ডলারে নেমে আসে। ইউরোপের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ডিজেলের ভবিষ্যৎ চুক্তির দামও প্রতি মেট্রিক টনে ৯০ ডলারের বেশি কমেছে।
এই মূল্যপতন থেকে বোঝা যায়, বাজারে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনার খবরই জ্বালানি ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশায় তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে। তবে ঘোষণার পর দাম কমলেও দীর্ঘমেয়াদে বাজার কতটা স্থিতিশীল হবে, তা নির্ভর করবে ইরান যুদ্ধ কত দিন স্থায়ী হয় এবং উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে স্বাভাবিক সরবরাহ কত দ্রুত ফিরতে পারে তার ওপর।
কারণ জরুরি মজুত থেকে তেল ও ডিজেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত মূলত স্বল্পমেয়াদে সরবরাহের ঘাটতি সামাল দেওয়ার একটি ব্যবস্থা। যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে উৎপাদন ও পরিবহন দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হলে শুধু মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ার মাধ্যমে বাজারকে দীর্ঘদিন স্থিতিশীল রাখা কঠিন। বরং মজুত কমে গেলে ভবিষ্যতে নতুন কোনো সরবরাহ সংকট দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর হাতে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য কম মজুত অবশিষ্ট থাকবে।
এর আগে মার্চ মাসে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার সমন্বয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জরুরি জ্বালানি মজুত ছাড়ার ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় সংস্থাটির ৩২ সদস্য দেশ মিলে কৌশলগত মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ইরান যুদ্ধের কারণে সরবরাহ পরিস্থিতির অবনতি এবং জ্বালানি বাজারে ব্যাপক চাপের মধ্যেই ওই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাতিহ বিরোল চলতি সপ্তাহে জানিয়েছেন, মার্চে ঘোষিত ওই ৪০ কোটি ব্যারেলের মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ ইতোমধ্যে বাজারে ছাড়া হয়েছে। অর্থাৎ কয়েক মাসের ব্যবধানেই বিশ্বের কৌশলগত জ্বালানি মজুতের একটি বড় অংশ ব্যবহার করা হয়েছে। এর পর নতুন করে আরও ১০ কোটি ব্যারেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের বর্তমান চাপের মাত্রাটিও সামনে নিয়ে আসে।
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এবারের উদ্যোগের দুটি দিক রয়েছে। একদিকে জ্বালানির সরবরাহ বাড়িয়ে বাজারে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমানোর চেষ্টা চলছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে যে চাপ তৈরি হয়েছে, সেটিও সামাল দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপে ডিজেল সরবরাহ অব্যাহত রাখা এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর নিজেদের মজুত ব্যবহারের মধ্যে একটি সমন্বয় তৈরির চেষ্টা স্পষ্ট।
তবে মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্তের ফলাফল নির্ভর করবে বাস্তব সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর। শুধু ঘোষণা দিলেই বাজারে জ্বালানি পৌঁছে যাবে না; তা পরিশোধন, পরিবহন এবং বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাতে হবে। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হলে নতুন করে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও থাকবে।
জি৭-এর এই পদক্ষেপ তাই শুধু জ্বালানির দাম কমানোর একটি তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নয়, বরং চলমান ভূরাজনৈতিক সংকটের অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলায় বড় অর্থনীতিগুলোর সমন্বিত প্রচেষ্টারও প্রতিফলন। ১০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি বাজারে ছাড়ার সিদ্ধান্ত সাময়িকভাবে সরবরাহ বাড়াতে এবং বাজারের উদ্বেগ কমাতে পারে। কিন্তু আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের স্থায়ী স্থিতিশীলতার জন্য যুদ্ধজনিত সরবরাহ বাধা কমানো এবং স্বাভাবিক বাণিজ্যিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা শেষ পর্যন্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকবে।

