বিশ্বের জ্বালানি বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ইউরোপকে নিজেদের মজুদ থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আগামী ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নকে মজুদ থেকে ১২ কোটি ব্যারেল ডিজেল ছাড়ার অনুরোধ করেছে ওয়াশিংটন। বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত দুটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে।
জ্বালানি বাজারে সাম্প্রতিক অস্থিরতার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের এই আহ্বানকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ বাজারে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানো গেলে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং ভোক্তাদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের চাপ কমানো সম্ভব হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রও এখন সেই লক্ষ্যেই ইউরোপের কৌশলগত মজুদের একটি অংশ ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছে।
তবে এই উদ্যোগের পেছনে শুধু বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতি নয়, ইউরোপীয় দেশগুলোর জ্বালানি ব্যবস্থাপনা নিয়েও ওয়াশিংটনের অসন্তোষ রয়েছে। মার্কিন প্রশাসন বিশেষ করে ফ্রান্স ও জার্মানির ওপর বিরক্তি প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের ধারণা, জরুরি তেল ও জ্বালানি মজুদের একটি অংশ বাজারে ছাড়ার বিষয়ে আগে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, দেশ দুটি সেগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করেনি।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ বাড়ানো এবং সাধারণ ভোক্তাদের জন্য ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই উদ্যোগে ইউরোপ যদি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাহলে সেটি ইউরোপের নিজেদের স্বার্থের জন্যও ইতিবাচক হবে।
ইউরোপে অবস্থানরত আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, আগামী ছয় মাসে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মজুদ থেকে ১২ কোটি ব্যারেল ডিজেল ছাড়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র অনুরোধ করেছে। এর মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে জ্বালানির সংকট ও মূল্যচাপ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে ওয়াশিংটন।
এই মুহূর্তে ইউরোপের জ্বালানি বাজার যে একাধিক চাপের মধ্যে রয়েছে, তার পেছনে দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনও কাজ করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর ইউরোপ রাশিয়া থেকে জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে ইউরোপকে বিকল্প উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ করতে হয়েছে।
রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কমানোর এই প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। ইউরোপীয় বাজারে যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি সরবরাহের পরিমাণ ও গুরুত্ব বাড়ার ফলে দুই পক্ষের জ্বালানি সম্পর্কও আগের তুলনায় গভীর হয়েছে।
এর মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নতুন করে জ্বালানি বাজারে চাপ তৈরি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন দেখা দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি উৎপাদনকারী অঞ্চলে সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই ইউরোপসহ আন্তর্জাতিক বাজারে ছড়িয়ে পড়ে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাব শুধু অপরিশোধিত তেলের বাজারেই সীমাবদ্ধ নয়। অপরিশোধিত তেল থেকে উৎপাদিত বিভিন্ন পরিশোধিত জ্বালানি, বিশেষ করে ডিজেলের সরবরাহ ও মূল্যও এতে প্রভাবিত হতে পারে। ইউরোপের পরিবহন, শিল্প ও কৃষি খাত ডিজেলের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হওয়ায় বাজারে সরবরাহ কমে গেলে এর প্রভাব অর্থনীতির বিভিন্ন অংশে পৌঁছাতে পারে।
এই বাস্তবতায় ইউরোপের কৌশলগত মজুদ যুক্তরাষ্ট্রের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মজুদ থেকে নির্দিষ্ট পরিমাণ জ্বালানি বাজারে ছাড়া হলে স্বল্পমেয়াদে সরবরাহের ঘাটতি কিছুটা কমানো সম্ভব হতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে আতঙ্ক কমিয়ে দাম নিয়ন্ত্রণে রাখার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
তবে ১২ কোটি ব্যারেল ডিজেল বাজারে ছাড়ার প্রস্তাব বাস্তবায়ন করা ইউরোপের জন্যও সহজ সিদ্ধান্ত নয়। কৌশলগত মজুদ মূলত জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য সংরক্ষণ করা হয়। ফলে বর্তমান সংকট সামাল দিতে মজুদ থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ছাড়লে ভবিষ্যতে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট দেখা দিলে ইউরোপের হাতে তুলনামূলক কম নিরাপত্তা মজুদ থাকতে পারে।
এ কারণে ইউরোপকে একই সঙ্গে দুটি বিষয় বিবেচনা করতে হবে। একদিকে বর্তমান বাজারে সরবরাহ বাড়িয়ে দাম ও সংকট নিয়ন্ত্রণে আনা, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জরুরি পরিস্থিতির জন্য পর্যাপ্ত মজুদ ধরে রাখা। ১২ কোটি ব্যারেলের মতো বড় পরিমাণ জ্বালানি ছাড়ার সিদ্ধান্ত তাই শুধু বাণিজ্যিক নয়, কৌশলগত সিদ্ধান্তও।
ফ্রান্স ও জার্মানির বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অসন্তোষও এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিক মাত্রা দিয়েছে। ওয়াশিংটন মনে করছে, জ্বালানি বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ইউরোপের পক্ষ থেকে আরও সক্রিয় পদক্ষেপ প্রয়োজন। বিশেষ করে জরুরি মজুদ ব্যবহারের বিষয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর আগের অবস্থান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সন্তুষ্ট নয়।
অন্যদিকে ইউরোপের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ার ঝুঁকিও রয়েছে। রাশিয়ার জ্বালানি থেকে দূরে সরে এসে যদি ইউরোপ ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে তার নিজস্ব জ্বালানি নিরাপত্তা কৌশল নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। একটি নির্দিষ্ট উৎসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে নতুন ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপের জ্বালানি বাজার তাই একাধিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার সরবরাহ থেকে সরে আসা, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা বাড়া এবং মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক সংঘাত—সবকিছু মিলিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন ভারসাম্য তৈরি হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ১২ কোটি ব্যারেল ডিজেল ছাড়ার আহ্বান এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিরই একটি অংশ। ওয়াশিংটন মূলত বাজারে দ্রুত সরবরাহ বাড়িয়ে মূল্যচাপ কমাতে চাইছে। তবে ইউরোপ এই প্রস্তাবে কতটা সাড়া দেবে এবং মজুদের কতটা অংশ বাজারে ছাড়বে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
যদি ইউরোপ বড় পরিমাণে মজুদ বাজারে ছাড়ে, তাহলে স্বল্পমেয়াদে ডিজেলের সরবরাহ বাড়তে পারে এবং বাজারে মূল্যচাপ কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের মূল সমস্যা—উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থার ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা—এর মাধ্যমে সমাধান হবে না।
বরং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত অব্যাহত থাকলে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হতে পারে। তখন কৌশলগত মজুদ থেকে বারবার জ্বালানি ছাড়ার পরিবর্তে সরবরাহের নতুন ও স্থিতিশীল উৎস নিশ্চিত করা ইউরোপের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সব মিলিয়ে, ইউরোপকে আগামী ছয় মাসে ১২ কোটি ব্যারেল ডিজেল ছাড়ার মার্কিন আহ্বান বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের গভীরতাই তুলে ধরছে। যুক্তরাষ্ট্র বাজারে সরবরাহ বাড়াতে ইউরোপের মজুদ ব্যবহারের পথ বেছে নিতে চাইছে, আর ইউরোপকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বর্তমান সংকট মোকাবিলা ও ভবিষ্যতের জ্বালানি নিরাপত্তার মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য তৈরি করবে।
জ্বালানি বাজারের বর্তমান অস্থিরতা তাই শুধু তেল বা ডিজেলের দামের বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, সরবরাহ নিরাপত্তা, বৈদেশিক নির্ভরতা এবং বড় অর্থনীতিগুলোর কৌশলগত সিদ্ধান্ত। ইউরোপের মজুদ থেকে ১২ কোটি ব্যারেল ডিজেল ছাড়ার মার্কিন আহ্বান সেই বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ও জ্বালানি বাস্তবতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন।

