বিশ্ববাজারে আবারও বড় ধরনের দরপতনের মুখে পড়েছে সোনা। মার্কিন ডলারের শক্তিশালী অবস্থান এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের সুদের হার বাড়ার প্রভাবে মূল্যবান এই ধাতুটির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ কমেছে। এর ফলে শনিবার, ৩ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট সোনার দাম এক ধাক্কায় প্রায় ০.৯ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৪০ দশমিক ০৬ ডলারে নেমে এসেছে।
সপ্তাহের হিসাবেও সোনার বাজারে চাপ স্পষ্ট। চলতি সপ্তাহে এখন পর্যন্ত মূল্যবান ধাতুটির দাম প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে টানা আরেকটি সপ্তাহে সোনার দাম কমার রেকর্ড তৈরি হতে পারে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভবিষ্যৎ সরবরাহের জন্য সোনার দামও কমেছে। সেখানে সোনার দাম প্রায় ১ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৪ হাজার ১৬২ দশমিক ৩০ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
সোনার বাজারে এই পতনের পেছনে মূলত দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে—মার্কিন ডলারের শক্তিশালী হওয়া এবং দেশটির সরকারি বন্ডের সুদের হার বৃদ্ধি। সাধারণত ডলারের মূল্য বাড়লে ডলারভিত্তিক পণ্যের দাম অন্য মুদ্রায় থাকা ক্রেতাদের জন্য তুলনামূলক বেশি ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার চাহিদার ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডের সুদের হার বাড়লে বিনিয়োগকারীদের জন্য সুদনির্ভর সম্পদ তুলনামূলক আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। তখন সুদ না দেওয়া সোনায় বিনিয়োগের আগ্রহ কিছুটা কমতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ে এই দুই প্রভাব একসঙ্গে কাজ করায় মূল্যবান ধাতুটির বাজারে বিক্রির চাপ বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতেও যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিই এখন সোনার দামের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এক্সিনিটি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক হান তান মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর আর্থিক অবস্থান ধরে রাখায় বাজারের বিনিয়োগকারীরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
তার মতে, আগামী কয়েক মাসে সোনার বাজার কোন দিকে যাবে, তা অনেকাংশে নির্ভর করবে মূল্যস্ফীতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অবস্থান এবং দেশটির শ্রমবাজার দুর্বল হওয়ার সম্ভাবনার ওপর। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি যদি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ থাকে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার কমানোর ক্ষেত্রে সতর্ক থাকে, তাহলে সোনার বাজারে চাপ অব্যাহত থাকতে পারে। বিপরীতে শ্রমবাজারে দুর্বলতার লক্ষণ বাড়লে আর্থিক নীতির ভবিষ্যৎ অবস্থান নিয়ে নতুন প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে।
সোনার পাশাপাশি অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর বাজারেও শনিবার নেতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে রুপার দাম প্রায় ০.৮ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ৬০ দশমিক ৩৬ ডলারে নেমেছে। প্লাটিনামের দাম কমেছে প্রায় ২ শতাংশ, ফলে প্রতি আউন্সের মূল্য দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৯২ দশমিক ৯০ ডলারে। একই সময়ে প্যালাডিয়ামের দাম ০.৫ শতাংশ কমে প্রতি আউন্স ১ হাজার ১৬৫ দশমিক ৭৫ ডলারে নেমেছে।
শুধু দিনের লেনদেনেই নয়, সপ্তাহের সামগ্রিক হিসাবেও রুপা, প্লাটিনাম ও প্যালাডিয়ামের বাজারে দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। তিনটি ধাতুই সাপ্তাহিক দরপতনের দিকে এগোচ্ছে।
সোনার বাজারে সাম্প্রতিক এই পতন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ মূল্যবান ধাতুটি সাধারণত অর্থনৈতিক ও আর্থিক অনিশ্চয়তার সময়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে নিরাপদ সম্পদ হিসেবে সোনার চাহিদা থাকলেও এর দাম সবসময় একমুখী থাকে না। ডলারের অবস্থান, সুদের হার, মূল্যস্ফীতির প্রত্যাশা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে এর বাজারমূল্য দ্রুত ওঠানামা করতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক নীতি তাই সোনার বাজারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ধারক হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীরা এখন মূল্যস্ফীতি ও শ্রমবাজারের নতুন তথ্যের দিকে নজর রাখছেন। এসব তথ্যের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভবিষ্যৎ নীতির বিষয়ে বাজারে যে প্রত্যাশা তৈরি হবে, সেটিই সোনার দামকে পরবর্তী সময়ে নতুন দিক দেখাতে পারে।
চলতি সপ্তাহে প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ দরপতনের পর সোনার বাজার এখন এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে বিনিয়োগকারীদের সতর্কতা বেড়েছে। একদিকে শক্তিশালী ডলার ও উচ্চ বন্ড সুদ সোনার ওপর চাপ তৈরি করছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও আর্থিক নীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা বাজারকে সংবেদনশীল করে রেখেছে।
ফলে আগামী কয়েক মাসে সোনার বাজারের গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যস্ফীতি, শ্রমবাজার এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত অবস্থানের ওপর। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে ডলারের মূল্য ও বন্ডের সুদের হারের পরিবর্তনও মূল্যবান ধাতুটির দামে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।

