বিশ্বের অন্যতম আলোচিত বৈদ্যুচ্চালিত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলা চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত সময়ে প্রতিষ্ঠানটির গাড়ি বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ শতাংশ কমেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বৈদ্যুচ্চালিত গাড়ির চাহিদা কমে যাওয়াই এই পতনের প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বিক্রি কমলেও বাজার বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি গাড়ি সরবরাহ করতে সক্ষম হয়েছে টেসলা। জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে প্রতিষ্ঠানটি মোট ৪ লাখ ৮৬ হাজার ৫৩২টি গাড়ি বিক্রি করেছে। এর আগে বিশ্লেষকরা ধারণা করেছিলেন, এই সময়ে টেসলার গাড়ি সরবরাহ প্রায় ৪ লাখ ৬১ হাজার ৯৭৪ ইউনিট হতে পারে।
গত বছরের একই প্রান্তিকে টেসলার গাড়ি বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৯৯টি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিক্রি কমেছে প্রায় ২ শতাংশ। সংখ্যার দিক থেকে এই পতন খুব বড় না হলেও বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুচ্চালিত গাড়ির বাজারে টেসলার অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে টেসলার জন্য পরিস্থিতি তুলনামূলক কঠিন হয়ে উঠেছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে দেওয়া ৭ হাজার ৫০০ ডলারের কর সুবিধা বন্ধ হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই সুবিধা বাতিল করার পর অনেক সম্ভাব্য ক্রেতা নতুন গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে।
গত বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে টেসলার গাড়ি বিক্রি রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছিল। তখন কর সুবিধা শেষ হওয়ার আগে অনেক গ্রাহক দ্রুত বৈদ্যুচ্চালিত গাড়ি কিনেছিলেন। কিন্তু এবার সেই অতিরিক্ত চাহিদা না থাকায় বাজারে স্বাভাবিকভাবেই চাপ তৈরি হয়েছে।
টেসলা অঞ্চলভিত্তিক বিক্রির বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে না। তবে গবেষণা প্রতিষ্ঠান কক্স অটোমোটিভের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রে টেসলার গাড়ি বিক্রি ৩১ শতাংশ কমে ১ লাখ ২৩ হাজার ৮৮০ ইউনিটে নেমে আসতে পারে।
শুধু টেসলাই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক গাড়ির বাজারেও বৈদ্যুচ্চালিত গাড়ির চাহিদা কিছুটা দুর্বল হয়েছে। দেশটির বড় গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ফোর্ডের যুক্তরাষ্ট্রে গাড়ি বিক্রি গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ৫ লাখ ৯ হাজার ৭৬৪ ইউনিট হয়েছে।
অন্যদিকে জেনারেল মোটরসের গাড়ি বিক্রিও ৬ শতাংশ কমেছে। প্রতিষ্ঠানটি যুক্তরাষ্ট্রে ৬ লাখ ৭০ হাজার ৯৭৪টি গাড়ি বিক্রি করেছে। জেনারেল মোটরস জানিয়েছে, বৈদ্যুচ্চালিত গাড়ির বাজার আগের তুলনায় ছোট হয়ে আসায় বিক্রিতে প্রভাব পড়েছে।
তবে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে টেসলার চিত্র একেবারে ভিন্ন। বিশেষ করে ইউরোপের বাজারে প্রতিষ্ঠানটি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব পরিবহনের প্রতি আগ্রহ এবং বৈদ্যুচ্চালিত গাড়ির জন্য সরকারি উদ্যোগের কারণে ইউরোপে এই খাতের চাহিদা বাড়ছে।
ইউরোপীয় গাড়ি শিল্পের সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে টেসলার নতুন গাড়ির নিবন্ধন ৪৩ শতাংশ বেড়ে ১ লাখ ৯১ হাজার ৭৮৭টিতে পৌঁছেছে।
তবে ইউরোপেও টেসলার জন্য প্রতিযোগিতা ক্রমেই কঠিন হচ্ছে। বিশেষ করে চীনের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বিওয়াইডিসহ অন্যান্য চীনা কোম্পানি দ্রুত ইউরোপের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে। কম দামের বৈদ্যুচ্চালিত গাড়ি এবং উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠান টেসলার জন্য বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠছে।
এদিকে টেসলার স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালানোর প্রযুক্তি নিয়েও ইউরোপে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে টেসলার ‘ফুল সেলফ-ড্রাইভিং’ সফটওয়্যারের অনুমোদনের সিদ্ধান্ত অক্টোবর থেকে পিছিয়ে ডিসেম্বর করা হয়েছে। যদিও কিছু সদস্য দেশে সীমিত পরিসরে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে।
টেসলার এই প্রযুক্তির নামের মধ্যে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালানোর ধারণা থাকলেও বাস্তবে এটি এখনো পুরোপুরি চালকবিহীন নয়। গাড়ির চালককে সবসময় আসনে থাকতে হয় এবং গাড়ি চলার সময় নজর রাখতে হয়।
টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলোন মাস্ক এর আগে জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় ব্যবহারের অনুমোদন পাবে। তবে এখন পর্যন্ত বিশ্বের কোনো দেশেই সম্পূর্ণ চালকবিহীন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়নি।
গাড়ি বিক্রির চ্যালেঞ্জের মধ্যেও টেসলা ভবিষ্যৎ প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, তারা নতুন করে তিন হাজার কোটি ডলারের ঋণসুবিধা পেয়েছে। এই অর্থ বৈদ্যুচ্চালিত গাড়ির পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয় যান, মানবসদৃশ রোবট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যবহার করা হবে।
এর আগে জানুয়ারিতে টেসলা তাদের প্রিমিয়াম এস ও এক্স মডেলের উৎপাদন বন্ধ করে। এরপর প্রতিষ্ঠানটি সাইবারক্যাব নামের স্বয়ংক্রিয় ট্যাক্সি এবং অপটিমাস নামের মানবসদৃশ রোবট প্রকল্পে বেশি গুরুত্ব দিতে শুরু করে। এসব প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক উৎপাদন শুরু হলেও এখনো এগুলো থেকে বড় ধরনের বাণিজ্যিক আয় আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, টেসলার বর্তমান চ্যালেঞ্জ শুধুমাত্র গাড়ি বিক্রির সংখ্যা কমে যাওয়া নয়; বরং বৈদ্যুচ্চালিত গাড়ির বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, সরকারি সুবিধা কমে যাওয়া এবং নতুন প্রযুক্তি বাস্তবায়নের সময়সীমা—সবকিছু মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন কৌশল নিতে হচ্ছে।
তবে টেসলার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান থেকে নিজেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয় পরিবহন ও রোবট প্রযুক্তির প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের যে চেষ্টা টেসলা করছে, তার সফলতা নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক বছরের পথচলা।
বর্তমানে গাড়ি বিক্রিতে সাময়িক চাপ থাকলেও টেসলার মূল লক্ষ্য শুধু গাড়ি বিক্রি নয়, বরং ভবিষ্যতের পরিবহন ব্যবস্থায় নেতৃত্ব ধরে রাখা। এখন দেখার বিষয়, প্রতিষ্ঠানটির এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা সফল হয়।

