ইরানের অর্থনীতিতে সংকট আরও গভীর হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধের কারণে দেশটির তেল রপ্তানি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে বিদেশে থাকা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতি প্রায় ৯০ শতাংশে পৌঁছেছে, কমছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বাড়ছে বেকারত্ব। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির মুদ্রা রিয়ালও বড় ধরনের পতনের মুখে পড়েছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার তেহরানের খোলা বাজারে প্রতি এক মার্কিন ডলারের বিনিময়ে রিয়ালের দর নেমে গেছে ২৫ লাখেরও বেশি পর্যায়ে, যা দেশটির ইতিহাসে অন্যতম বড় মুদ্রা অবমূল্যায়ন। এর আগে গত শুক্রবারও রিয়ালের রেকর্ড পতন হয়েছিল। তখন এক ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মূল্য নেমে এসেছিল প্রায় ২২ লাখে।
চলতি বছরের শুরুতে এক ডলারের বিনিময় মূল্য ছিল প্রায় ১৫ লাখ রিয়াল। ২০২৫ সালের আগস্টে এই হার ছিল প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার রিয়াল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ইরানি মুদ্রার বড় ধরনের অবমূল্যায়ন হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি হিসাবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ২০১৮ সালের শুরুতে এক ডলারের বিপরীতে রিয়ালের মূল্য ছিল মাত্র ৩৫ হাজার।
ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মূল কারণগুলোর একটি হলো জ্বালানি তেল রপ্তানিতে বড় ধস। দেশটির সরকারি আয়ের বড় অংশ আসে তেল বিক্রি থেকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তেল রপ্তানির পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
জ্বালানি খাতের তথ্য বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে ইরানের রপ্তানি টার্মিনাল থেকে কোনো অপরিশোধিত তেল জাহাজে তোলা হয়নি। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর এই প্রথম এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
ইরানের জন্য পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে কারণ একই সময়ে পারস্য উপসাগরের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলো—যেমন সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত—আন্তর্জাতিক বাজারে নির্বিঘ্নে তেল সরবরাহ বাড়িয়ে যাচ্ছে। এতে আঞ্চলিক জ্বালানি বাজারে তেহরানের প্রভাবও কমছে।
তেল রপ্তানি বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু জ্বালানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। সমুদ্রপথে পণ্য আমদানিতে বাধা তৈরি হয়েছে। স্থলপথে বিকল্প ব্যবস্থা থাকলেও সেখানে তৈরি হয়েছে পরিবহন জটিলতা। ফলে বাজারে পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের মূল্যস্ফীতি বর্তমানে প্রায় ৯০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছেছে। একই সঙ্গে চলতি বছরে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ৫ দশমিক ৪ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক চাপের কারণে শ্রমবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে এবং বেকারত্ব বাড়ছে।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় ইরানকে রেশনিং ব্যবস্থায় যেতে হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করতে হচ্ছে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনিও।
ইরানের রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতে তেলের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। দেশটির মোট সরকারি বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসে জ্বালানি তেল বিক্রি থেকে। পাশাপাশি ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) অর্থায়নের অন্যতম উৎসও এই খাত।
অর্থনৈতিক চাপের আরেকটি বড় কারণ হলো বিদেশে থাকা অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনার জটিলতা। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান জানিয়েছেন, চীনে থাকা ইরানের কিছু অর্থ আটকে আছে। ফলে বিদেশে পণ্য বিক্রি করেও সেই অর্থ সহজে দেশে আনা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে ইরান বর্তমানে একাধিক অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। একদিকে তেল রপ্তানি বন্ধ হওয়ার কারণে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ কমেছে, অন্যদিকে আমদানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে রিয়ালের ধারাবাহিক পতন।
তবে বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, চার দশকের বেশি সময় ধরে গড়ে ওঠা ইরানের ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ কাঠামো দেশটিকে কিছুটা স্থিতিশীল থাকতে সাহায্য করতে পারে। নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশটি স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা করেছে এবং আমদানিনির্ভরতা কমিয়েছে।
ইরান বর্তমানে ওষুধ, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও কিছু ইলেকট্রনিক পণ্য নিজস্বভাবে উৎপাদনের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞা মোকাবিলায় পণ্য বিনিময় বা বার্টার ব্যবস্থাও ব্যবহার করছে দেশটি। তেলের বিনিময়ে খাদ্য ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের কৌশলও দীর্ঘদিন ধরে অনুসরণ করছে তেহরান।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, তেল রপ্তানি থেকে বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে ইরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়বে। বর্তমান পরিস্থিতিতে দেশটির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মুদ্রার স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের পথ সচল রাখা।

