বিশ্বজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার দ্রুত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর অন্যতম বড় সুবিধাভোগী হয়ে উঠেছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রযুক্তি জায়ান্ট স্যামসাং ইলেকট্রনিক্স। উন্নত মেমোরি চিপের ব্যাপক চাহিদার কারণে চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটির পরিচালন মুনাফা এক বছর আগের তুলনায় ৭৮০ শতাংশের বেশি বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্যামসাং জানিয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে তাদের পরিচালন মুনাফা প্রায় ১০৭ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন উন বা প্রায় ৮০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এই বৃদ্ধি ৭৮২ দশমিক ৫ শতাংশ। এটি শুধু স্যামসাংয়ের জন্য নয়, দক্ষিণ কোরিয়ার কোনো কোম্পানির এক প্রান্তিকে ১০০ ট্রিলিয়ন উনের বেশি পরিচালন মুনাফা অর্জনের প্রথম ঘটনা হতে যাচ্ছে।
একই সময়ে কোম্পানির আয়ও রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর সম্ভাবনা রয়েছে। স্যামসাংয়ের ধারণা, তৃতীয় প্রান্তিকে তাদের মোট রাজস্ব প্রায় ১৯৫ ট্রিলিয়ন উনে পৌঁছাবে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১২৭ শতাংশ বেশি। আয় ও মুনাফা—দুই ক্ষেত্রেই টানা চার প্রান্তিকে নিজেদের আগের রেকর্ড ভাঙতে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।
স্যামসাংয়ের এই অভাবনীয় সাফল্যের মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে এআই প্রযুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় উন্নত মেমোরি চিপের চাহিদা বৃদ্ধি। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এআইভিত্তিক ডেটা সেন্টার তৈরি করছে। এসব ডেটা সেন্টারে বিপুল পরিমাণ উচ্চক্ষমতার চিপ প্রয়োজন হচ্ছে, যার মধ্যে হাই ব্যান্ডউইডথ মেমোরি বা এইচবিএম চিপ অন্যতম।
স্যামসাং বিশ্বের সবচেয়ে বড় মেমোরি চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি। এআই প্রযুক্তির প্রসারের ফলে এইচবিএমসহ উন্নত চিপের সরবরাহ কমে গেছে, যার ফলে বাজারে এসব চিপের দাম বেড়েছে। এই পরিস্থিতি স্যামসাংয়ের চিপ ব্যবসাকে বড় ধরনের সুবিধা দিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার আর্থিক প্রতিষ্ঠান শিনহান সিকিউরিটিজের বিশ্লেষকরাও স্যামসাংয়ের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধি নিয়ে আশাবাদী। তাদের মতে, নতুন প্রজন্মের এইচবিএম৪ চিপ উৎপাদন বাড়ানোর মাধ্যমে স্যামসাং বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।
এইচবিএম বাজারে বর্তমানে স্যামসাংয়ের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ার এসকে হাইনিক্স এবং যুক্তরাষ্ট্রের মাইক্রন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। এআই ডেটা সেন্টারে ব্যবহৃত শক্তিশালী কম্পিউটিং ব্যবস্থার জন্য এসব কোম্পানির তৈরি উন্নত মেমোরি চিপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তবে এআই চিপের বাজারে সাফল্যের পাশাপাশি স্যামসাংয়ের সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও তৈরি হয়েছে। উন্নত মেমোরি চিপের দাম বাড়ার কারণে স্মার্টফোনে ব্যবহৃত ডিআরএএম ও ন্যান্ড ফ্ল্যাশ মেমোরির দামও বেড়েছে। এর ফলে কোম্পানির মোবাইল বিভাগকে একই চিপের জন্য বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এখন স্যামসাংয়ের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ বাজারে প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে প্রতিষ্ঠানটি পণ্যের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
শেয়ারহোল্ডারদের সুবিধা নিশ্চিত করতেও স্যামসাং বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। আগস্টে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের শেয়ার পুনঃক্রয়ের জন্য ৮০ বিলিয়ন ডলারের একটি পরিকল্পনা ঘোষণা করে। কোম্পানির পক্ষ থেকে বলা হয়, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধির সুফল সরাসরি বিনিয়োগকারীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
এদিকে স্যামসাংয়ের রেকর্ড মুনাফার মধ্যেই কর্মীদের পক্ষ থেকেও বাড়তি সুবিধার দাবি উঠেছে। দক্ষিণ কোরিয়ায় স্যামসাং চলতি বছরের শুরুতে একটি শ্রম বিরোধ এড়াতে সেমিকন্ডাক্টর বিভাগের কর্মীদের পরিচালন মুনাফার ১০ দশমিক ৫ শতাংশের সমপরিমাণ বোনাস দেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়।
এই চুক্তির আওতায় দেশটিতে কর্মরত প্রায় ৭৮ হাজার কর্মী বোনাস পাওয়ার যোগ্য হবেন। বাজার বিশ্লেষকদের হিসাবে, কোম্পানির মুনাফার ভিত্তিতে একজন কর্মী প্রায় ৩ লাখ ৭০ হাজার ডলার পর্যন্ত বোনাস পেতে পারেন।
অন্যদিকে তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মাইক্রনের একটি কারখানার শ্রমিকরা বোনাস কাঠামো নিয়ে আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ধর্মঘটের পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
সব মিলিয়ে এআই প্রযুক্তির বিস্ফোরণ বিশ্বজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। স্যামসাংয়ের রেকর্ড মুনাফা দেখাচ্ছে, ভবিষ্যতের প্রযুক্তি প্রতিযোগিতায় উন্নত চিপ উৎপাদন কতটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে উৎপাদন ব্যয়, শ্রমিক অসন্তোষ এবং বাজার প্রতিযোগিতা মোকাবিলা করাই হবে প্রতিষ্ঠানটির পরবর্তী বড় চ্যালেঞ্জ।

