যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য বিরোধ ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ব অর্থনীতির প্রচলিত ধারণায় বড় পরিবর্তন আসছে। একসময় বৈশ্বিক অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল পারস্পরিক নির্ভরতা। একটি দেশ উৎপাদন করত, অন্য দেশ কাঁচামাল সরবরাহ করত, আবার অন্য দেশ সেই পণ্য কিনত। কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় অনেক দেশ এখন বিদেশ নির্ভরতাকে অর্থনৈতিক ঝুঁকি হিসেবে দেখছে।
এই পরিস্থিতিতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ গুরুত্বপূর্ণ পণ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর ক্ষেত্রে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। অর্থনীতিকে বাইরের ধাক্কা থেকে রক্ষা করতে যে কৌশল নেওয়া হচ্ছে, সেটিকে বিশ্লেষকরা বলছেন ‘দুর্গ অর্থনীতি’।
বিশ্লেষক আবিশুর প্রকাশের মতে, বিশ্ব এমন এক পর্যায়ে প্রবেশ করছে যেখানে সরকারগুলো অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে। বড় ধরনের সংকট বা সংঘাতের সময়ও যেন দেশের অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালু থাকে, সে লক্ষ্যেই প্রয়োজনীয় সরবরাহ ব্যবস্থা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে।
জাপান এই কৌশলের অন্যতম উদাহরণ। দেশটি প্রশান্ত মহাসাগর থেকে বিরল খনিজ উত্তোলনের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। এর উদ্দেশ্য শুধু নতুন সম্পদের উৎস তৈরি করা নয়, বরং কোনো কারণে চীনের সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হলেও নিজেদের শিল্পখাত সচল রাখা।
তাইওয়ানও একই ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটি ১৬০টি মাইক্রোগ্রিড তৈরির পরিকল্পনা করেছে, যাতে মূল বিদ্যুৎ ব্যবস্থা কোনো কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম চালু রাখা যায়। সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের মধ্যেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই এর লক্ষ্য।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোও নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে এগোচ্ছে। লাওস নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবহন ব্যবস্থায় আঞ্চলিক কেন্দ্র হতে চায়। সিঙ্গাপুর খাদ্য ও কাঁচামালের ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া প্রযুক্তি খাতে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তুলতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সেমিকন্ডাক্টর অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে শুধু অর্থনৈতিক লাভ নয়, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগে কোনো দেশে কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে উৎপাদন খরচ ছিল প্রধান বিষয়। এখন ব্যবসায়ীরা বিবেচনা করছেন দেশটির রাজনৈতিক পরিবেশ, সরবরাহ ব্যবস্থার স্থায়িত্ব এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কতটা নিরাপদ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় অর্থনীতিগুলোও কৌশলগত প্রযুক্তি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। বিশেষ করে উন্নত চিপ প্রযুক্তির ক্ষেত্রে রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বাড়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশও বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করছে।
তবে সব দেশ যে অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার পথে হাঁটছে, তা নয়। কিছু দেশ বরং বিকল্প বাণিজ্যপথ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে। থাইল্যান্ড মালাক্কা প্রণালির বিকল্প হিসেবে থাই খাল প্রকল্পের মতো উদ্যোগ নিয়ে পণ্য পরিবহন সহজ করার পরিকল্পনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার চেষ্টা প্রয়োজন হলেও অতিরিক্ত বিচ্ছিন্নতা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারে। এক দেশের নিরাপত্তামূলক পদক্ষেপ অন্য দেশের জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করলে বিশ্ব অর্থনীতি আরও প্রতিযোগিতামুখী হয়ে উঠতে পারে।
ভবিষ্যতের অর্থনীতি তাই শুধু বাণিজ্য ও উৎপাদনের ওপর নির্ভর করবে না; বরং সরবরাহ নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতাও হয়ে উঠবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

