একসময় বিশ্ব অর্থনীতির মূল শক্তি হিসেবে দেখা হতো পারস্পরিক নির্ভরতাকে। এক দেশ উৎপাদন করবে, অন্য দেশ কাঁচামাল সরবরাহ করবে, আরেক দেশ সেই পণ্য কিনবে—এই আন্তঃনির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠেছিল আধুনিক বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থা। ধারণা ছিল, অর্থনৈতিক সম্পর্ক যত গভীর হবে, দেশগুলোর মধ্যে সংঘাতের সম্ভাবনাও তত কমবে।
কিন্তু বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা সেই ধারণাকে বদলে দিচ্ছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্য বিরোধ এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোকে নতুন কৌশল নিতে বাধ্য করছে। এখন অনেক দেশই মনে করছে, অতিরিক্ত বিদেশ নির্ভরতা অর্থনৈতিক শক্তির বদলে দুর্বলতায় পরিণত হতে পারে।
এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় উদাহরণগুলোর একটি হলো চীন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যকার সম্পর্ক। চীনা পণ্যের প্রবেশ বৃদ্ধি, বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ ইউরোপের নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বর্তমানে চীনের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য ঘাটতি প্রতিদিন প্রায় ১০০ কোটি ইউরো ছাড়িয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার মধ্যেই ইইউয়ের বাণিজ্যবিষয়ক কমিশনার মারোস সেফকোভিচ চীন সফর করেন। সেখানে চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী ওয়াং ওয়েনতাওর সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কের ভারসাম্য, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।
চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, দুই পক্ষের মতপার্থক্য দূর করতে সমমর্যাদা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে আলোচনা প্রয়োজন। বেইজিং মনে করছে, স্থিতিশীল অর্থনৈতিক সম্পর্ক শুধু দুই পক্ষের নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ইউরোপের প্রধান উদ্বেগ হলো বাজারে ভারসাম্যহীনতা। ইউরোপীয় দেশগুলোর অভিযোগ, চীনা কোম্পানিগুলো ইউরোপের বাজারে তুলনামূলক সহজে প্রবেশ করতে পারলেও চীনের বাজারে ইউরোপীয় ব্যবসাগুলোর জন্য একই সুযোগ পাওয়া কঠিন।
চীনের বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা, কম খরচে পণ্য তৈরি এবং রপ্তানি শক্তি ইউরোপের অনেক শিল্পখাতের ওপর চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক যানবাহন, সৌর প্রযুক্তি, ব্যাটারি এবং উন্নত উৎপাদন খাতে চীনা কোম্পানিগুলোর দ্রুত সম্প্রসারণ ইউরোপীয় শিল্পের জন্য প্রতিযোগিতার নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিরল খনিজের বিষয়টি। আধুনিক প্রযুক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং বিভিন্ন উন্নত শিল্পে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ খনিজের বড় অংশের সরবরাহে চীনের প্রভাব রয়েছে। এসব খনিজ রপ্তানিতে চীনের নিয়ন্ত্রণমূলক নীতি ইউরোপের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
কারণ, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তরের জন্য ইউরোপকে এসব কাঁচামালের ওপর নির্ভর করতে হয়। বিকল্প উৎস তৈরির চেষ্টা চললেও চীনের ওপর নির্ভরতা দ্রুত কমানো সহজ নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, এ পরিস্থিতি চীনকে আলোচনার টেবিলে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা দিচ্ছে। তবে একই সঙ্গে চীনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতার ঝুঁকি উপলব্ধি করে ইউরোপও বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাইছে।
বর্তমান বিশ্বে শুধু অর্থনৈতিক লাভ নয়, বিনিয়োগ ও উৎপাদনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ভূরাজনৈতিক নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আগে কোনো দেশে কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচনা ছিল খরচ কমানো ও বাজার সুবিধা। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি প্রশ্ন—ভবিষ্যতের সংকটে সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা নিরাপদ থাকবে।
এই কারণেই ইউরোপ নিজেদের শিল্প সক্ষমতা বাড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির উৎপাদন দেশে ফিরিয়ে আনা এবং বিকল্প সরবরাহকারী খোঁজার ওপর জোর দিচ্ছে।
তবে চীন-ইউরোপ সম্পর্ক পুরোপুরি সংঘাতের দিকে যাচ্ছে না। দুই পক্ষই জানে, একে অপরের ওপর তাদের অর্থনৈতিক নির্ভরতা অনেক গভীর। ইউরোপের জন্য চীন একটি বড় বাজার, অন্যদিকে চীনের জন্য ইউরোপ গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি গন্তব্য।
এদিকে ফ্রান্সও চীনের সঙ্গে কৌশলগত যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ফরাসি প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা ইমানুয়েল বোনের চীন সফরে বৈশ্বিক অর্থনীতি, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ইউরোপের নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান বজায় রাখার পাশাপাশি চীনের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনার ক্ষেত্রেও ফ্রান্স একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নিতে চায়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে চীন ও ইউরোপের সম্পর্ক নির্ভর করবে তারা কীভাবে বাণিজ্য ঘাটতি, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সরবরাহ নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে পারে তার ওপর।
যদি দুই পক্ষ বাস্তবসম্মত সমাধানে পৌঁছাতে পারে, তাহলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও স্থিতিশীল হতে পারে। কিন্তু আলোচনা ব্যর্থ হলে ইউরোপ চীন থেকে অর্থনৈতিক দূরত্ব বাড়ানোর পথে দ্রুত এগোতে পারে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্য ব্যবস্থায় নতুন বিভাজন তৈরি করতে পারে।
চীন ও ইউরোপের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—অর্থনৈতিক পারস্পরিক নির্ভরতা কি সহযোগিতার ভিত্তি হিসেবে টিকে থাকবে, নাকি ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ভবিষ্যতের সম্পর্কের মূল নিয়ামক হয়ে উঠবে।

