আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সরবরাহ সংকট, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিশ্বজুড়ে কয়লার চাহিদা বাড়ছে। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে কয়লার দাম টনপ্রতি ১৫০ ডলারের বেশি হয়েছে, যা ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের পর সর্বোচ্চ পর্যায়।
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, ইরানকে ঘিরে চলমান সামরিক উত্তেজনা এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অনেক দেশ আবারও কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়াচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ায় নতুন কয়লা খনি সম্প্রসারণে আইনি বাধাও বাজারে প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে নিউ সাউথ ওয়েলসের মাউন্ট প্লিজেন্ট কয়লা খনির সম্প্রসারণ পরিকল্পনা নিয়ে অস্ট্রেলিয়ার সুপ্রিম কোর্টের একটি সিদ্ধান্ত কয়লা সরবরাহ নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
আদালত ওই খনি সম্প্রসারণের আবেদন বাতিল করে জানায়, খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে যে কার্বন নিঃসরণ হবে, সেটি পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয়নি।
এই সিদ্ধান্তের পর অস্ট্রেলিয়ার খনি খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মিনারেলস কাউন্সিল অব অস্ট্রেলিয়ার প্রধান নির্বাহী তানিয়া কনস্টেবল মনে করেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বিনিয়োগকারীদের আস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে এবং ভবিষ্যতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
এদিকে বৈশ্বিক বাজার বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, চলতি বছর কয়লার ব্যবহার নতুন রেকর্ড গড়তে পারে। প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ সংকট এবং এলএনজির মূল্যবৃদ্ধির কারণে এশিয়া ও ইউরোপের অনেক দেশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিকল্প হিসেবে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপর আবার গুরুত্ব দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার ‘কোল মিড-ইয়ার আপডেট ২০২৬’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের বাজারে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এলএনজি ব্যয়বহুল ও সীমিত হয়ে পড়ায় চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো বড় অর্থনীতিগুলো কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে বেশি ঝুঁকছে।
ইউরোপের কয়েকটি দেশও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত রাখতে কয়লার ব্যবহার অব্যাহত রাখার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। কারণ, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নির্ভরযোগ্য জ্বালানি উৎস নিশ্চিত করাই অনেক দেশের প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে নতুন কয়লা খনি সম্প্রসারণে কঠোরতা, অন্যদিকে প্রধান বাণিজ্যিক পথগুলোতে অস্থিরতা—এই দুই কারণে স্বল্পমেয়াদে কয়লার বাজারে চাপ বজায় থাকতে পারে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এখন জ্বালানি নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করছে। ফলে পরিবেশগত লক্ষ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার মধ্যে নতুন করে ভারসাম্য তৈরির চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে নীতিনির্ধারকেরা।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার শুধু সরবরাহ ও চাহিদার ওপর নির্ভর করছে না; বরং আন্তর্জাতিক রাজনীতি, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং পরিবেশনীতি—সবকিছুই এখন জ্বালানির দামে সরাসরি প্রভাব ফেলছে। কয়লার দাম তিন বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ওঠা সেই বৃহত্তর অস্থিরতারই একটি প্রতিফলন।

