বিশ্বজুড়ে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের ঘনঘটার মধ্যেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতি নিয়ে এক দারুণ আশাব্যঞ্জক বার্তা দিয়েছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা বা ডব্লিউটিও। চলতি বছর বিশ্ব পণ্য বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে সংস্থাটি, যা এর আগে গত মার্চ মাসে মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশে সীমাবদ্ধ ছিল। মূলত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তিসংক্রান্ত পণ্যের অবিশ্বাস্য চাহিদা, বিশ্বজুড়ে রেকর্ড পরিমাণে বিনিয়োগ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অসাধারণ অভিযোজনক্ষমতা এই অপ্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় অনুঘটকের কাজ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ ও আঞ্চলিক উত্তেজনার কারণে জ্বালানি তেল ও পরিবহন খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগলেও, প্রযুক্তি খাতের অপ্রতিরোধ্য উত্থান এবং বিকল্প বাণিজ্যিক রুট খুঁজে নেওয়ার মানসিকতা বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় কোনো বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণে যে গতি দেখা গেছে, তা সমস্ত পূর্বাভাসকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। এই সাফল্যের মুকুটে সবচেয়ে বড় পালকটি যুক্ত করেছে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি খাত। ডব্লিউটিওর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, কেবল সেমিকন্ডাক্টর ও সার্ভারের মতো আধুনিক এআই সহায়ক যন্ত্রাংশের বিশ্ব বাণিজ্য গত বছরের একই সময়ের তুলনায় লাফিয়ে লাফিয়ে ৬৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বছরের প্রথম দুই অর্ধে বৈশ্বিক পণ্য বাণিজ্যের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির প্রায় অর্ধেক বা ৪৭ শতাংশই এসেছে এই একক খাত থেকে। লোহিত সাগরের নৌপথে নানা জটিলতা এবং বাণিজ্যপথ অবরুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হলেও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ী ও সরবরাহকারীরা সময়মতো বিকল্প পথ ও করিডোর বেছে নেওয়ায় বৈশ্বিক বাণিজ্যের চাকা এক মুহূর্তের জন্যও থমকে যায়নি।
মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের কারণে ওই অঞ্চল থেকে জ্বালানি রপ্তানি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় এক উদ্বেগের কারণ ছিল। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল রপ্তানি প্রায় ২৪ শতাংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি রপ্তানি প্রায় ৪৭ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পায়। তবে এই বিশাল ঘাটতি একা মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের বিকল্প জ্বালানি উৎপাদনকারী দেশগুলো দ্রুত সামাল দিয়েছে। অন্যান্য দেশ থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহ করায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের সার্বিক ঘাটতির হার মাত্র ৬ শতাংশে নেমে আসে এবং এলএনজির বিশ্ব রপ্তানি কমেছে মাত্র ১ শতাংশ। শুধু জ্বালানি নয়, রাসায়নিক সারের বাজার থেকে শুরু করে কনটেইনার পরিবহন ব্যবস্থায় বিকল্প সমুদ্রবন্দর ও করিডোর ব্যবহারের ফলে বিশ্বজুড়ে কনটেইনার পরিবহন প্রায় ৩ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
পণ্য বাণিজ্যের আকাশছোঁয়া সাফল্য দেখা গেলেও সেবা বাণিজ্য বা সার্ভিস সেক্টর নিয়ে কিছুটা রক্ষণাত্মক অবস্থান বজায় রেখেছে ডব্লিউটিও। সংস্থাটির সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি বছর বিশ্বে সেবা খাতের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে, যা গত মার্চে ধরা হয়েছিল ৪ দশমিক ৮ শতাংশ। ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও নানা আঞ্চলিক সংঘাতের নেতিবাচক প্রভাব পণ্য খাতের চেয়ে সেবা খাতের ওপর কিছুটা বেশি পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এছাড়া বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধান এনগোজি ওকোনজো ইওয়েলা সতর্ক করে বলেছেন যে, পণ্য বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধির এই ইতিবাচক সুফল সব দেশ সমানভাবে পাচ্ছে না। নির্দিষ্ট কোনো একক সরবরাহকারী বা নির্দিষ্ট ট্রানজিট পথের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল দেশগুলো বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। একই সঙ্গে সব দেশের পক্ষে এআই প্রযুক্তির বিপুল বিনিয়োগ ও বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সমানভাবে কাজে লাগানোর সক্ষমতা না থাকায় বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
বর্তমান প্রতিকূল পরিস্থিতি পেরিয়ে আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৭ সালে বিশ্ব পণ্য বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি আরও বেড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছাতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে ডব্লিউটিও। পাশাপাশি ওই সময়ে সেবা বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৪ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে এই ইতিবাচক সম্ভাবনার পথচলায় মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদী সংঘাত, সাপ্লাই চেইনের নতুন সমীকরণ এবং প্রযুক্তিপণ্যের টেকসই চাহিদা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে। ধনী ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যকার ফারাক কমিয়ে এনে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই সুফল সবার জন্য সমানভাবে উন্মুক্ত করার ওপর জোর দিয়েছেন সংস্থাটির নীতি নির্ধারকরা। সবমিলিয়ে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের এই নতুন রূপান্তর প্রমাণ করে যে প্রতিকূলতা যতই গভীর হোক না কেন, সঠিক প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও বিকল্প কৌশল জানলে অর্থনীতি তার নিজস্ব গতিতেই এগিয়ে যেতে সক্ষম।

