বিশ্বজুড়ে ব্যক্তিগত কম্পিউটারের বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ডেস্কটপ, ল্যাপটপ ও ওয়ার্কস্টেশন মিলিয়ে কম্পিউটার সরবরাহ কমেছে ২১ দশমিক ২ শতাংশ। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যন্ত্রাংশের মূল্যবৃদ্ধি এবং পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে ক্রেতাদের আগ্রহ কমে যাওয়াই এই পতনের প্রধান কারণ।
প্রযুক্তি বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওমডিয়ার সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে মোট ৫ কোটি ৮১ লাখ ইউনিট কম্পিউটার সরবরাহ হয়েছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি-মার্চের পর কোনো প্রান্তিকে এত বড় পতন দেখা যায়নি।
এর আগে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে কম্পিউটার বাজারে তুলনামূলক ভালো চাহিদা ছিল। ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কায় অনেক ক্রেতা নির্ধারিত সময়ের আগেই কম্পিউটার কিনে নিয়েছিলেন। ফলে বছরের প্রথমার্ধে বাজারে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়েছিল। তবে সেই আগাম কেনাকাটার প্রভাব কমে আসার পর তৃতীয় প্রান্তিকে বিক্রিতে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে।
ওমডিয়ার গবেষণা পরিচালক ইশান দত্ত বলেন, যন্ত্রাংশের দাম বাড়ার আশঙ্কায় বছরের প্রথমার্ধে অনেক ক্রেতা আগেই পণ্য কিনেছিলেন। সে সময় বাজার বেশ শক্তিশালী ছিল। তাই পরবর্তী সময়ে বিক্রি কমে যাওয়াটা অনেকটাই প্রত্যাশিত ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমানে কম্পিউটার শিল্প সবচেয়ে বেশি চাপের মুখে পড়েছে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে। মেমোরি, স্টোরেজ, প্রসেসর, গ্রাফিকস কার্ডসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের সমন্বিত সার্কিটের সরবরাহেও সংকট তৈরি হয়েছে।
কম্পিউটার তৈরির খরচের বড় অংশ এখন মেমোরি ও স্টোরেজের পেছনে যাচ্ছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে একটি কম্পিউটারের মোট ব্যয়ের প্রায় ১৫ শতাংশ আসে ডিআরএএম মেমোরি ও সলিড-স্টেট ড্রাইভ থেকে। কিন্তু সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই দুই উপকরণের ব্যয়ের অংশ বেড়ে প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছেছে।
ওমডিয়ার প্রধান বিশ্লেষক বেন ইয়ে জানান, কম্পিউটার নির্মাতারা কয়েক দফায় পণ্যের দাম বাড়ালেও যন্ত্রাংশের অতিরিক্ত খরচ পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে একদিকে নির্মাতাদের মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে দাম বাড়ার কারণে অনেক ক্রেতা নতুন কম্পিউটার কেনার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন।
বিশ্ববাজারে এই সংকট চলতি বছরের শেষ প্রান্তিকেও অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছে ওমডিয়া। প্রতিষ্ঠানটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের চতুর্থ প্রান্তিকে (অক্টোবর-ডিসেম্বর) কম্পিউটার সরবরাহ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২৪ শতাংশ কমতে পারে।
শুধু তাই নয়, ২০২৭ সালেও বাজারে সংকোচনের আশঙ্কা রয়েছে। ওমডিয়ার পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছর পুরো কম্পিউটার বাজার আরও ৭ শতাংশ কমে যেতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়তে পারে কম দামের কম্পিউটার নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ যন্ত্রাংশের বাড়তি খরচ পণ্যের দামে যুক্ত হলে সাধারণ ক্রেতাদের একটি বড় অংশ কেনাকাটা থেকে দূরে সরে যেতে পারেন।
তবে বিশ্বব্যাপী সরবরাহ কমলেও শীর্ষ কম্পিউটার নির্মাতাদের অবস্থানে বড় পরিবর্তন হয়নি। বাজার হিস্যা অনুযায়ী লেনোভো, এইচপি, ডেল, অ্যাপল ও আসুস এখনো শীর্ষ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের তালিকায় রয়েছে।
তৃতীয় প্রান্তিকে ১ কোটি ৪৯ লাখ ইউনিট কম্পিউটার সরবরাহ করে বাজারের শীর্ষ অবস্থান ধরে রেখেছে লেনোভো। বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠানটির অংশ ছিল ২৬ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা এইচপি সরবরাহ করেছে ১ কোটি ৩ লাখ ইউনিট কম্পিউটার। তবে শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এইচপির বিক্রি সবচেয়ে বেশি কমেছে, প্রায় ৩১ শতাংশ।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা ডেল সরবরাহ করেছে ৭৬ লাখ ইউনিট কম্পিউটার এবং বাজারে তাদের অংশ ছিল ১৩ শতাংশ। অন্যদিকে অ্যাপল ৬৮ লাখ ইউনিট কম্পিউটার সরবরাহ করে চতুর্থ অবস্থানে রয়েছে। আগের বছরের তুলনায় অ্যাপলের সরবরাহ কমেছে ১১ শতাংশ।
যদিও অ্যাপলের বিক্রি কমেছে, তবুও বাজারে তাদের অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। তুলনামূলক বেশি দামের কম্পিউটারের বাজারে শক্ত অবস্থানের কারণে মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব প্রতিষ্ঠানটি অন্যদের তুলনায় কিছুটা ভালোভাবে সামাল দিতে পেরেছে বলে মনে করছে ওমডিয়া।
সব মিলিয়ে বিশ্ব কম্পিউটার বাজার এখন একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। একদিকে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, অন্যদিকে ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়া এবং সরবরাহ ব্যবস্থার সংকট—সব মিলিয়ে বাজারে চাপ বাড়ছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে চলতি বছরের শেষ ভাগ এবং আগামী বছরেও কম্পিউটার শিল্পে নিম্নমুখী প্রবণতা অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

