বিশ্ববাজারে ইস্পাতের দাম কমতে শুরু করেছে। চাহিদা হ্রাস, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, মুনাফা কমে যাওয়া এবং চীনের আবাসন খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দার কারণে বড় ধরনের চাপের মুখে পড়েছে ইস্পাত শিল্প।
শিল্প খাতের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ চীনের মাত্র ৬ দশমিক ৯ শতাংশ ইস্পাত উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান মুনাফা করতে পেরেছে। অর্থাৎ দেশটির অধিকাংশ ইস্পাত কারখানাই বর্তমানে আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
হেলেনিক শিপিং নিউজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক সপ্তাহের ছুটির পর গত বৃহস্পতিবার চীনের বাজার খুললে ইস্পাতের দাম কমার প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইস্পাত উৎপাদনকারী দেশ চীনের বাজারের এই দুর্বলতা আন্তর্জাতিক বাজারেও প্রভাব ফেলছে।
বাজারসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চীনের ফিউচার বাজারে ইস্পাত সরবরাহ চুক্তির মূল্য টনপ্রতি ৩ হাজার ৯০ ইউয়ানের নিচে নেমে গেছে। এটি চার সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়।
ইস্পাত উৎপাদনকারীদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যবধান। কাঁচামাল, জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ বাড়লেও বাজারে চাহিদা কম থাকায় উৎপাদিত পণ্যের দাম কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উঠছে না।
ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান কমাতে উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে। কিছু কারখানা সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রেখেছে, আবার কেউ কেউ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছে।
চীনের ইস্পাত শিল্পের আরেকটি বড় সমস্যা হলো আবাসন খাতের দুর্বলতা। দেশটিতে নতুন ভবন নির্মাণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন কার্যক্রম ধীর হয়ে যাওয়ায় রড ও অন্যান্য ইস্পাত পণ্যের চাহিদা কমেছে।
চীনের অর্থনীতিতে আবাসন খাত দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই খাতে মন্দা দেখা দেওয়ায় ইস্পাতসহ নির্মাণসংশ্লিষ্ট শিল্পগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আবাসন খাত দ্রুত ঘুরে দাঁড়ানোর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ এখনো দেখা যাচ্ছে না। ফলে ইস্পাতের চাহিদা স্বাভাবিক হতে আরও সময় লাগতে পারে।
এদিকে শুধু চীন নয়, বিশ্বজুড়েই ইস্পাত উৎপাদনে ধীরগতি দেখা যাচ্ছে। ওয়ার্ল্ড স্টিল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের আগস্টে বিশ্বব্যাপী অপরিশোধিত ইস্পাত উৎপাদন আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ২ শতাংশ কমে ১৪ কোটি ৪২ লাখ টনে দাঁড়িয়েছে।
চীনের ইস্পাত বাজারের ওপর পুরো বিশ্বের নির্মাণ ও শিল্প খাতের বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে। দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইস্পাত উৎপাদনকারী হওয়ায় সেখানে উৎপাদন ও দামের পরিবর্তন আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত প্রভাব ফেলে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল থাকা, উৎপাদকদের মুনাফা কমে যাওয়া এবং কারখানাগুলোর উৎপাদন কমানোর প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বিশ্ববাজারে ইস্পাতের দামে আরও অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
তবে উৎপাদন কমে গেলে দীর্ঘমেয়াদে সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আসতে পারে। অনেক কারখানা যদি উৎপাদন কমিয়ে দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে বিশ্ববাজারে ইস্পাত সরবরাহেও প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, চীনের আবাসন সংকট ও শিল্পখাতের দুর্বলতার প্রভাব এখন বৈশ্বিক ইস্পাত বাজারে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্পে স্থিতিশীলতা ফিরতে হলে চাহিদা বৃদ্ধি এবং উৎপাদন খাতের পুনরুদ্ধার প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

