বিশ্বজুড়ে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুদ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে কমে গেছে বলে সতর্ক করেছেন সৌদি আরবের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি সৌদি আরামকোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আমিন নাসের।
তার মতে, বর্তমান মজুদ আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে চলা ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ কমে গেছে এবং এর প্রভাব পড়েছে বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থায়।
লন্ডনে অনুষ্ঠিত এনার্জি ইন্টেলিজেন্স ফোরামের এক সম্মেলনে আমিন নাসের বলেন, সাত মাস ধরে চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্য থেকে প্রায় ৩০০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি তেল সরবরাহ কমেছে।
তিনি বলেন, সরবরাহের ঘাটতি মোকাবিলা করতে বিভিন্ন মজুদ থেকে ১০০ কোটির বেশি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ব্যবহার করা হয়েছে।
আরামকো প্রধান জানান, বর্তমানে বিশ্বে বাণিজ্যিক তেলের মজুদ ৬০০ কোটি ব্যারেলের নিচে নেমে এসেছে। তবে এর বড় অংশ বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় নেই।
তিনি বলেন, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ইতোমধ্যে চাপের মধ্যে রয়েছে। নতুন করে বড় ধরনের সরবরাহ সংকট তৈরি হলে তা মোকাবিলা করার মতো অতিরিক্ত মজুদ এখন খুবই সীমিত।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নিজেদের কৌশলগত মজুদ থেকে বিপুল পরিমাণ তেল বাজারে ছেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন দেশের সরকার কৌশলগত মজুদ থেকে ৩০ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল বাজারে সরবরাহ করেছে। সম্প্রতি আরও তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তবে আমিন নাসের বলেন, সংকট মোকাবিলায় এখন পর্যন্ত ব্যবহৃত তেলের বড় অংশ এসেছে বিভিন্ন কোম্পানির নিজস্ব মজুদ থেকে।তার মতে, শুধু বর্তমান চাহিদা পূরণ নয়, ভবিষ্যতের জন্য পর্যাপ্ত মজুদ পুনর্গঠন করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেল পরিবহন নিয়েও উদ্বেগ বেড়েছে।উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তেল সরবরাহের জন্য এই নৌপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে কোনো ধরনের বড় বাধা তৈরি হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।তবে সাম্প্রতিক সময়ে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে তেল সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে।
পণ্যবাজার বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত মাসে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে প্রতিদিন ১ কোটি ৫৫ লাখ ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর এটিই সর্বোচ্চ সরবরাহ।
এই পরিমাণ যুদ্ধের আগের সরবরাহের ৮০ শতাংশের বেশি হলেও সরবরাহ বাড়ানোর কারণে পরিবহন ও অন্যান্য ব্যয় বেড়েছে। ফলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ এখনো সীমিত অবস্থায় রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু তেল সরবরাহ নয়, তেল অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজে হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি ইরান সমর্থিত বিভিন্ন গোষ্ঠী ইরাক ও ইয়েমেনে আরামকোর পাইপলাইন, শোধনাগার এবং বন্দরে হামলা চালিয়েছে।এসব ঘটনায় তেল উৎপাদন ও পরিবহন ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
আমিন নাসের বলেন, সংঘাত শেষ হলেও বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদা পূরণ এবং অপরিশোধিত তেলের মজুদ পুনর্গঠন করতে প্রায় দুই বছর সময় লাগতে পারে।তিনি বলেন, ভবিষ্যতে সরবরাহ ঝুঁকি মোকাবিলায় সরকারগুলোকে জ্বালানি নিরাপত্তার বিষয়ে আরও গুরুত্ব দিতে হবে।তার মতে, শুধু বর্তমান সংকট মোকাবিলা নয়, ভবিষ্যতের জন্য স্থিতিশীল জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা তৈরি করাও জরুরি।
জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য বিঘ্ন মোকাবিলায় সৌদি আরামকো বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করছে।প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি তেল রপ্তানির বিকল্প পথ এবং বিদেশে আরও তেল সংরক্ষণের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখছে।আরামকোর লক্ষ্য হলো, ভবিষ্যতে কোনো কারণে সরবরাহ ব্যাহত হলেও গ্রাহকদের কাছে নিয়মিত তেল পৌঁছানো নিশ্চিত করা।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু তেলের দাম নয়, বিশ্ব অর্থনীতি, পরিবহন ব্যয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে বিশ্বের দেশগুলো এখন নিজেদের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দিকে নজর দিচ্ছে।

