বিশ্বজুড়ে ইসলামী অর্থায়নের বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ২০৩০ সালের মধ্যে এ খাতের মোট সম্পদ ১০ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছাতে পারে। অথচ বৈশ্বিক এই অগ্রগতির বিপরীতে বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতে সম্পদ বৃদ্ধির হার নেমে এসেছে মাত্র ৩ শতাংশে। আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ, দুর্বল সুশাসন এবং তারল্যসংকটের কারণে ব্যাংকগুলোর প্রতি আস্থাও চাপে রয়েছে।
ইসলামী করপোরেশন ফর দ্য ডেভেলপমেন্ট অব দ্য প্রাইভেট সেক্টর এবং লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের প্রকাশিত ২০২৬ সালের ইসলামী অর্থায়ন উন্নয়ন প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। আরব নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির বাড়তি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে।
পাঁচ ব্যাংক একীভূত করেও চ্যালেঞ্জ কাটেনি
বাংলাদেশের ইসলামী ব্যাংকিং খাতের আর্থিক দুর্বলতা মোকাবিলায় পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করেছে কর্তৃপক্ষ। এর উদ্দেশ্য ছিল ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার ওপর চাপ কমানো এবং খাতটির স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
তবে ব্যাংক একীভূত করলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। আমানতকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত, সম্পদের মান উন্নত করা এবং পরিচালনব্যবস্থায় জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট তৈরি হলে গ্রাহকেরা আমানত রাখা নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারেন। একই সঙ্গে তারল্যসংকট ব্যাংকগুলোর নিয়মিত লেনদেন, ঋণ বিতরণ ও নতুন বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। ফলে সম্পদ বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও প্রভাবিত হতে পারে।
পাঁচ বছরে বিশ্ববাজারে সম্পদ বাড়বে ৬১.৫ শতাংশ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে ইসলামী অর্থায়নের মোট সম্পদ ছিল ৬ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০৩০ সালের মধ্যে তা ১০ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই সময়ে মোট সম্পদ বৃদ্ধির হার হতে পারে ৬১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশ।
ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সম্প্রসারণ, শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ সনদ বা সুকুকের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং উদীয়মান অর্থনীতিতে এ ধরনের অর্থায়নের প্রসারকে সম্ভাব্য প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০২৫ সালে বিশ্বব্যাপী ইসলামী ব্যাংকিং সম্পদ ৮ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমানে ৮৪টি দেশে এই খাতের কার্যক্রম রয়েছে। অর্থাৎ ইসলামী অর্থায়ন এখন শুধু কয়েকটি মুসলিম-প্রধান দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বিভিন্ন দেশও নিজেদের আর্থিক ব্যবস্থায় এর সুযোগ তৈরি করছে।
ঘানায় সুদবিহীন ব্যাংকিংয়ের কাঠামো তৈরির কাজ চলছে। অন্যদিকে উজবেকিস্তানে ইসলামী ব্যাংকিংকে সহায়তা দিতে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব উদ্যোগ থেকে বোঝা যায়, ইসলামী অর্থায়নের বাজার সম্প্রসারণে নতুন দেশও যুক্ত হচ্ছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোতে তুলনামূলক স্থিতিশীলতা
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের বিভিন্ন বাজারের ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতার পার্থক্যও তুলে ধরা হয়েছে। আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যেও উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদভুক্ত দেশগুলোর ব্যাংকগুলো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রয়েছে।
এর পেছনে শক্তিশালী মূলধন, সম্পদের ভালো মান এবং সরকারের আর্থিক সহায়তার সক্ষমতাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রভাব সামলানো সম্ভব হবে বলে প্রতিবেদনে ধারণা দেওয়া হয়েছে। কারণ, দেশ দুটির ব্যাংকিং কার্যক্রমের বড় অংশ নিজ নিজ দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকেন্দ্রিক।
অন্যদিকে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জন্য মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির বাড়তি ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপ অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব চাপ মোকাবিলায় ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা গুরুত্বপূর্ণ।
ইসলামী অর্থায়ন উন্নয়ন সূচকে শীর্ষে মালয়েশিয়া
২০২৬ সালের ইসলামী অর্থায়ন উন্নয়ন সূচকে ১৩৬ স্কোর নিয়ে প্রথম অবস্থানে রয়েছে মালয়েশিয়া। সৌদি আরব ১১৩ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত ৯৫ স্কোর নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তান যথাক্রমে চতুর্থ ও পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে।
বৈশ্বিক এই সূচকের স্কোর ২০২৫ সালের ১১ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালে ১২ হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সূচকের আওতায় থাকা ৭১ শতাংশ দেশের স্কোর বেড়েছে। এতে বোঝা যায়, ইসলামী অর্থায়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সামগ্রিক উন্নতি ঘটেছে।
তবে এই সূচক শুধু ব্যাংকের সম্পদের পরিমাণ বিবেচনা করে না। ইসলামী অর্থায়নের বিকাশ, সংশ্লিষ্ট শিল্পের কার্যক্রম এবং অন্যান্য উন্নয়নমূলক দিকও এতে বিবেচিত হয়। তাই সূচকে ভালো অবস্থান অর্জনের জন্য শুধু সম্পদ বৃদ্ধি নয়, খাতের সামগ্রিক সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।
আফ্রিকায় সুকুকের বাজারও সম্প্রসারিত হচ্ছে
ইসলামী অর্থায়নের প্রসারে সুকুকের ব্যবহারও বাড়ছে। সুকুক হলো শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগ সনদ, যার মাধ্যমে নির্দিষ্ট সম্পদ বা প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত কাঠামোয় অর্থ সংগ্রহ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আফ্রিকার দেশগুলোর সার্বভৌম সুকুক ইস্যুর পরিমাণ ২০২১ সালের ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
বেনিনের প্রথম ৫০০ মিলিয়ন ডলারের সুকুক ইস্যুতে ৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের আবেদন জমা পড়ে। এতে ইসলামী আর্থিক পণ্যের প্রতি আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের প্রমাণ পাওয়া যায়।
বাংলাদেশের জন্যও সুকুকের বাজার সম্প্রসারণ অবকাঠামো ও উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়নের বিকল্প তৈরি করতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগের সাফল্য নির্ভর করবে প্রকল্পের আর্থিক সক্ষমতা, স্বচ্ছতা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থার ওপর।
বাংলাদেশের সামনে কী করণীয়
বিশ্বজুড়ে ইসলামী অর্থায়নের সম্পদ বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাংলাদেশের জন্য সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে দেশের ব্যাংকিং খাতের মৌলিক দুর্বলতা দূর করা জরুরি।
প্রথমত, ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থা সম্পর্কে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে জবাবদিহির ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে তারল্য ব্যবস্থাপনা ও সম্পদের মানের ওপর কার্যকর তদারকি বাড়াতে হবে।
একই সঙ্গে উৎপাদনশীল খাতে অর্থায়ন, শরিয়াহসম্মত বিনিয়োগের নতুন সুযোগ এবং সুকুকের বাজার সম্প্রসারণের মাধ্যমে ইসলামী অর্থায়নের পরিসর বাড়ানো সম্ভব।
তবে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে শুধু ব্যাংকের সম্পদ বাড়ানো যথেষ্ট নয়। আর্থিক স্থিতিশীলতা, সুশাসন, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং গ্রাহকের আস্থা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্বে ইসলামী অর্থায়নের সম্পদ ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর পূর্বাভাস এই খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরে। বাংলাদেশের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো, আস্থার সংকট ও আর্থিক দুর্বলতা কাটিয়ে এই সম্ভাবনাকে বাস্তব অর্থনৈতিক সুফলে রূপান্তর করা।

