যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ (ফেড) সুদহার অপরিবর্তিত রাখার পর একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) তিন সদস্য দেশ। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার ও বাহরাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক গত শুক্রবার সুদহার স্থির রাখার ঘোষণা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ডলারের সঙ্গে নিজেদের মুদ্রার বিনিময় হার বেঁধে রাখায় এসব দেশের মুদ্রানীতি অনেকাংশেই ফেডের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। আরব নিউজের বরাতে খবরটি জানা গেছে।
ফেডের নীতিনির্ধারণী কমিটি ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটি (এফওএমসি) ১০-২ ভোটে সুদহার ৩ দশমিক ৭৫ থেকে ৪ শতাংশের মধ্যে অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি ও কর্মসংস্থানের চিত্র বিবেচনায় নিয়ে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। এক বিবৃতিতে ফেড জানায়, সর্বোচ্চ কর্মসংস্থান ও মূল্যস্থিতি অর্জনের দ্বৈত লক্ষ্যে সহায়তা করতেই বর্তমান সুদহার বজায় রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত তারল্য নিশ্চিত করার নীতিও চলবে।
ফেডের মূল্যায়নে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি শক্তিশালী গতিতে সম্প্রসারিত হচ্ছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ ভোগ ব্যয় স্থিতিশীল আছে। মূলধনি বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিও প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করছে। বেকারত্বের হারেও বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। তবে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো বেশি বলে মনে করছে সংস্থাটি। বিশেষ করে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিই এর কারণ। এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যতে সুদহার নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
ফেডের সিদ্ধান্তের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাতারাতি আমানত সুবিধার বিপরীতে ভিত্তি সুদহার ৩ দশমিক ৯ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। ব্যাংকটি জানায়, ফেড ব্যাংকগুলোর রিজার্ভের ওপর সুদহার স্থির রাখার ঘোষণা দেওয়ার পরই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিদ্যমান ঋণ সুবিধার আওতায় স্বল্পমেয়াদি তারল্য ধার নেওয়ার সুদহারও আগের মতো আছে। এই হার ভিত্তি সুদহারের চেয়ে ৫০ বেসিস পয়েন্ট বেশি। অর্থাৎ ৩ দশমিক ৯ শতাংশের সঙ্গে আরও শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ যোগ করে এটি নির্ধারিত হয়েছে।
কাতারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও আমানত, ঋণ ও রেপো, তিন ধরনের সুদহারই স্থির রেখেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া পোস্টে ব্যাংকটি জানায়, আমানতের সুদহার থাকছে ৪ দশমিক ১০ শতাংশ, ঋণের সুদহার ৪ দশমিক ৬০ শতাংশ এবং রেপো সুদহার ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। দেশটির ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য নিয়ন্ত্রণ ও ঋণের ব্যয় নির্ধারণে এসব হার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমানতের সুদহার ঠিক করে দেয়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকে অর্থ রাখলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কত মুনাফা পাবে। ঋণের সুদহার নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ ধার নেওয়ার খরচ। আর রেপো সুদহার ব্যবহৃত হয় ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য জোগানের ক্ষেত্রে।
বাহরাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও রাতারাতি আমানতের সুদহার ৪ দশমিক ৫০ শতাংশেই রেখেছে। ব্যাংকটির ভাষ্য, বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেশের মুদ্রা ও আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর সুদহার নীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের মূল কারণ ডলারের সঙ্গে মুদ্রার স্থির বিনিময় হার। জিসিসির ছয় সদস্য দেশ হলো সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত ও ওমান। এর অধিকাংশই নিজেদের মুদ্রা ডলারের সঙ্গে বেঁধে রাখে। এই ব্যবস্থায় ফেড সুদহার বাড়ালে বা কমালে উপসাগরীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোও সাধারণত একই পথ ধরে। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় স্থানীয় সুদহার অনেক কমে গেলে বিনিয়োগকারীরা বেশি মুনাফার আশায় অর্থ অন্য দেশে সরিয়ে নিতে পারেন। তাতে স্থানীয় মুদ্রার ওপর চাপ তৈরির ঝুঁকি থাকে।
ফেডকে অনুসরণ করলেও এসব দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্থানীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ব্যাংক খাতের তারল্য ও আর্থিক স্থিতিশীলতাও বিবেচনায় নেয়। সুদহার অপরিবর্তিত থাকলে সাধারণত ঋণের খরচ ও আমানতের মুনাফায় হঠাৎ পরিবর্তনের চাপ কম থাকে। ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ আর্থিক পরিকল্পনার ক্ষেত্রে তুলনামূলক স্থিতিশীল পরিবেশ পায়।
জিসিসির বাকি তিন দেশ সৌদি আরব, কুয়েত ও ওমানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন সুদহার নিয়ে এখনো কিছু জানায়নি। দেশগুলোর সিদ্ধান্তের দিকে নজর রাখছেন ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টরা। ফেডের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁদের সিদ্ধান্তও অপরিবর্তিত থাকার সম্ভাবনাই বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ঘোষণা না আসা পর্যন্ত বিষয়টি নিশ্চিত নয়।

