মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে বিশ্বের বৃহত্তম ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান বিন্যান্সের বিভিন্ন ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের সম্পদ সরিয়ে নিয়েছে সাইবার অপরাধীরা। ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডিজিটাল সম্পদ চুরির ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এটিকে। যুক্তরাষ্ট্রের একাধিক অনুসন্ধানী প্রতিষ্ঠান বলছে, উত্তর কোরিয়ার হ্যাকার গোষ্ঠী এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। ইতিমধ্যে চুরি হওয়া সম্পদের প্রায় অর্ধেক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় আটকে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তবে বাকি অর্থ উদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ঘটনাটি ঘটে গত বৃহস্পতিবার। ব্লকচেইনের লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস জানিয়েছে, বিন্যান্সের বিভিন্ন নেটওয়ার্কে থাকা ওয়ালেট থেকে প্রায় ৬৩৬ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ সরিয়ে নেওয়া হয়। এর বড় অংশ মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে অন্য ঠিকানায় পাঠানো হয়। অর্থ সরানোর পরপরই অপরাধীরা সেগুলো বিভিন্ন মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, যাতে শনাক্ত ও উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে।
যেভাবে ঘটল এত বড় চুরি
প্রাথমিকভাবে বিন্যান্সের ধারণা ছিল, প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মীর ব্যবহৃত কম্পিউটার বা ল্যাপটপের নিরাপত্তা ভেঙে এ হামলা চালানো হয়েছে। তবে পরবর্তী তদন্তে আরও কয়েকটি নিরাপত্তা দুর্বলতার সন্ধান পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। যদিও ঠিক কোন পদ্ধতিতে অপরাধীরা পুরো ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ পেয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রকাশ করেনি বিন্যান্স।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের মতে, অপরাধীরা বিন্যান্সের লেনদেন অনুমোদনের ব্যবস্থায় প্রবেশ করতে সক্ষম হয়েছিল। সাধারণত এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কোনো ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে অর্থ স্থানান্তরের নির্দেশ অনুমোদন করা হয়। অপরাধীরা সেই নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে ওয়ালেটগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ সম্পদ সরিয়ে নেয়।
সহজভাবে বললে, তারা হয়তো অর্থ রাখার ভান্ডারের চাবি চুরি করেনি, বরং ভান্ডার থেকে অর্থ বের করার নির্দেশ দেওয়ার ব্যবস্থাটিই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল। ফলে প্রকৃত অনুমোদন ছাড়াই বিপুল সম্পদ অন্য ঠিকানায় পাঠানো সম্ভব হয়। হংকংভিত্তিক আইনজীবী জশুয়া চুর ব্যাখ্যায় বিষয়টি এভাবেই তুলে ধরেছেন।
হামলার পর বিন্যান্স জানিয়েছে, তদন্তে প্রথমে একটি কম্পিউটারের নিরাপত্তা ভাঙার বিষয়টি সামনে এলেও পরে একাধিক জায়গায় অনুপ্রবেশের প্রমাণ পাওয়া গেছে। গ্রাহকদের অর্থ সুরক্ষিত রাখার পাশাপাশি ক্ষতির পুরো দায় প্রতিষ্ঠানটি বহন করবে বলেও জানিয়েছে।
কারা জড়িত, সন্দেহ উত্তর কোরিয়ার দিকে
এত বড় অঙ্কের ডিজিটাল সম্পদ চুরির পেছনে কারা রয়েছে, তা নিয়ে তদন্ত চলছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান হামলার ধরন ও অর্থ স্থানান্তরের কৌশলের সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার অতীত সাইবার হামলার মিল পেয়েছে।
টিআরএম ল্যাবসের দাবি, উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রসমর্থিত হ্যাকার গোষ্ঠী ট্রেডারট্রেইটর এ ঘটনার পেছনে রয়েছে বলে তাদের উচ্চমাত্রার আস্থা আছে। প্রতিষ্ঠানটি আগের কয়েকটি বড় ডিজিটাল মুদ্রা চুরির ঘটনার সঙ্গেও এই গোষ্ঠীর যোগসূত্র পেয়েছে।
বিন্যান্সের সহপ্রধান নির্বাহী রিচার্ড টেং অবশ্য জানিয়েছেন, তাদের নিজস্ব তদন্তে এখনো অপরাধীদের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। উত্তর কোরিয়া অতীতেও বিভিন্ন সাইবার হামলা ও ডিজিটাল সম্পদ চুরির অভিযোগ অস্বীকার করেছে। এ ঘটনায় দেশটির সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান বাইবিটে বড় ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছিল। সে ঘটনায় প্রায় ১৫০ কোটি ডলারের সম্পদ চুরি হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই ওই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের দায়ী করেছিল। টিআরএম ল্যাবসের মতে, বিন্যান্সের সাম্প্রতিক হামলার সঙ্গে আগের ঘটনার কৌশলগত মিল রয়েছে।
কোথায় গেল চুরি হওয়া অর্থ
চুরি হওয়া অর্থের প্রায় অর্ধেক ছিল এমন কিছু ডিজিটাল মুদ্রা, যেগুলোর নিয়ন্ত্রণ নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টেথার, সার্কেল, রিপল এবং মার্কিন প্রেসিডেন্টের পরিবারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল রয়েছে। তারা সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কিছু সম্পদ আটকে দিয়েছে।
এ ধরনের ডিজিটাল মুদ্রার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, প্রয়োজন হলে এর নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান দূর থেকেই নির্দিষ্ট লেনদেন বা সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ বন্ধ করতে পারে। ফলে অপরাধীদের হাতে চলে যাওয়া অর্থের একটি বড় অংশ দ্রুত আটকে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
তবে সব ডিজিটাল মুদ্রার ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা নেই। বিটকয়েন ও ইথারের মতো মুদ্রার কোনো একক কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে সেগুলো সরাসরি জব্দ করা অনেক বেশি কঠিন। টিআরএম ল্যাবসের হিসাব অনুযায়ী, চুরি হওয়া প্রায় ২৪০ কোটি ডলারের বিটকয়েন ও ইথার অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে নেওয়া এখনই সম্ভব হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধীরা চুরি করা অর্থ বিভিন্ন ওয়ালেটে ভাগ করে পাঠাতে পারে। পাশাপাশি কম পরিচিত ডিজিটাল মুদ্রা ও লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থের উৎস আড়াল করার চেষ্টা করতে পারে। এভাবে একাধিকবার লেনদেন করলে অর্থের প্রকৃত গতিপথ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে যায়।
ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান চেইনঅ্যানালাইসিস জানিয়েছে, চুরি হওয়া অর্থ গোপন করতে এমন কিছু লেনদেনের ধরন দেখা যাচ্ছে, যা তারা আগে খুব একটা দেখেনি। অল্প সময়ের মধ্যে হাজার হাজার লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ বিভিন্ন ঠিকানায় ঘোরানো হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে আগে ব্যবহৃত ঠিকানাতেই আবার অর্থ পাঠানো হচ্ছে, যাতে অনুসন্ধানকারীরা প্রকৃত গন্তব্য শনাক্ত করতে সমস্যায় পড়েন।
গ্রাহকদের ক্ষতি পূরণের ঘোষণা বিন্যান্সের
এ ঘটনার পর গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হলেও বিন্যান্স জানিয়েছে, গ্রাহকদের সম্পদ সুরক্ষিত রয়েছে এবং চুরির কারণে সৃষ্ট আর্থিক ক্ষতি প্রতিষ্ঠানটি নিজস্ব তহবিল ও সুরক্ষা তহবিল থেকে পূরণ করবে। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তার জন্য এক বিলিয়ন ডলারের বিটকয়েন সংরক্ষিত তহবিলের কথা উল্লেখ রয়েছে।
সর্বশেষ ২ নভেম্বর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষতি পূরণের জন্য বিন্যান্স নিজেদের কোষাগার, বিমা তহবিল ও নিরাপত্তা তহবিল মিলিয়ে প্রায় ৬০০ কোটি ডলার প্রস্তুত করেছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সব ধরনের লেনদেন স্বাভাবিক করার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
আংশিকভাবে অর্থ উত্তোলনের সুযোগ চালু হওয়ার পর রোববার মাত্র সাড়ে নয় ঘণ্টায় গ্রাহকেরা বিন্যান্স থেকে নিট ৩৬৪ কোটি ডলার তুলে নেন। তবে প্রতিষ্ঠানটির মোট সম্পদের তুলনায় এই অর্থের পরিমাণ ২ দশমিক ১ শতাংশ। বিন্যান্স জানিয়েছে, প্রথম দিকে অর্থ উত্তোলনের চাপ বাড়লেও পরে তা কমে এসেছে এবং পরিস্থিতি স্থিতিশীল হচ্ছে।
ডিজিটাল মুদ্রার বাজারে আস্থার সংকট
এত বড় চুরির ঘটনায় পুরো ডিজিটাল মুদ্রার বাজারে নতুন করে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর শুক্রবার বিভিন্ন ডিজিটাল মুদ্রার দাম কমে যায়। একই সময়ে স্থিতিশীল ডিজিটাল মুদ্রার মোট বাজারমূল্যও কমেছে, যা থেকে ধারণা করা হচ্ছে কিছু বিনিয়োগকারী ঝুঁকি কমাতে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ঘটনা বড় বিনিয়োগকারী ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সতর্কতা বাড়াবে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান গ্রাহকদের অর্থ অন্যের হয়ে পরিচালনা করে, তাদের জন্য নিরাপত্তার ঝুঁকি এখন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
টিআরএম ল্যাবসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠানে এমন হামলা ইন্টারনেটের গতিতে ব্যাংক ডাকাতির মতো। এতে অন্যের অর্থের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।
টিআরএম ল্যাবসের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১৫০টি পৃথক ঘটনায় মোট ২৯০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরি হয়েছিল। বিন্যান্সের সাম্প্রতিক ঘটনাটি সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন চুরি হওয়া অর্থের কতটা উদ্ধার করা সম্ভব হয় এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা ঠেকাতে প্রতিষ্ঠানগুলো কী ব্যবস্থা নেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে ডিজিটাল মুদ্রার বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা।

