১৯৭১ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থা নিয়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশের অর্থমন্ত্রী যখন গভীর উদ্বেগের মধ্যে ছিলেন, তখন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী জন কনেলি তাঁদের উদ্দেশে একটি মন্তব্য করেছিলেন, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত হয়। তিনি বলেছিলেন, ডলার যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা, কিন্তু এর সমস্যার ভার বহন করতে হয় অন্য দেশগুলোকে।
এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে মার্কিন ডলারের প্রভাব কতটা গভীর, তা স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও সেই বাস্তবতার খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি। বিশ্ব বাণিজ্য, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ, বৈদেশিক মুদ্রার মজুত এবং আর্থিক লেনদেনের বড় একটি অংশ এখনো ডলারনির্ভর। তবে এই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার জন্য এবার দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি নিচ্ছে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন।
বেইজিংয়ের লক্ষ্য রাতারাতি ডলারকে সরিয়ে দেওয়া নয়। বরং এমন একটি আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে চীনের নিজস্ব মুদ্রা রেনমিনবি আরও বেশি ব্যবহৃত হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীলতা কমবে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক চাপ কিংবা আর্থিক অবরোধের মুখে যাতে চীনের অর্থনীতি সহজে বিপর্যস্ত না হয়, সেই প্রস্তুতিই এখন দেশটির কৌশলের কেন্দ্রে রয়েছে।
ডলারের আধিপত্যের সূচনা যেভাবে
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে ১৯৪৪ সালে ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থায় মার্কিন ডলার বিশেষ অবস্থান লাভ করে। সে সময় ডলারকে সোনার সঙ্গে নির্দিষ্ট বিনিময়মূল্যে যুক্ত করা হয়েছিল। অন্যদিকে বিভিন্ন দেশের মুদ্রার বিনিময়মূল্য ডলারের সঙ্গে সম্পর্কিত থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়।
পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডলারের সঙ্গে সোনার সরাসরি বিনিময়যোগ্যতা বন্ধ করে দেয়। এর ফলে ব্রেটন উডস ব্যবস্থার অবসান ঘটে এবং বিশ্বের অনেক দেশ নিজেদের মুদ্রার বিনিময়মূল্য বাজারের চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে শুরু করে।
কিন্তু সেই পরিবর্তনের পরও ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল হয়নি। বরং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ব্যাংকিং, ঋণ, বিনিয়োগ ও বৈদেশিক মুদ্রার মজুতের ক্ষেত্রে ডলার তার প্রভাব ধরে রাখে।
বর্তমানে ডলারের শক্তির পেছনে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা নয়, বরং একটি বিস্তৃত আর্থিক অবকাঠামোও কাজ করছে। আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেন থেকে শুরু করে পণ্য কেনাবেচা, ঋণের চুক্তি এবং বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত—সব ক্ষেত্রেই ডলারের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে।
এই ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীলতা চীনের মতো বৃহৎ অর্থনীতির জন্যও একটি কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করেছে। কারণ আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থাকায় প্রয়োজনে ওয়াশিংটন নিষেধাজ্ঞা কিংবা আর্থিক বিধিনিষেধের মাধ্যমে অন্য দেশের অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
চীনের কাছে কেন রেনমিনবি এত গুরুত্বপূর্ণ
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দেওয়া এক ভাষণে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং দেশটিকে একটি শীর্ষস্থানীয় আর্থিক শক্তিতে পরিণত করার প্রচেষ্টা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেন। তাঁর বক্তব্যে একটি শক্তিশালী জাতীয় মুদ্রাকে আর্থিক শক্তি অর্জনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
চীনের এই উদ্যোগের পেছনে ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ধরনের বিবেচনা রয়েছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর পশ্চিমা দেশগুলো রাশিয়ার ওপর ব্যাপক আর্থিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় রাশিয়ার প্রবেশাধিকার সীমিত করা এবং দেশটির বৈদেশিক সম্পদের একটি অংশ জব্দ করার ঘটনা অন্যান্য দেশের কাছেও নতুন উদ্বেগ তৈরি করে।
চীনের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হলে একই ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়তে পারে বেইজিং।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণাধীন আর্থিক নেটওয়ার্ক থেকে চীনকে ব্যাপকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হলে দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, ব্যাংকিং ব্যবস্থা এবং রপ্তানি খাত বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। কারণ চীনের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশের সঙ্গে রপ্তানি খাতের সম্পর্ক রয়েছে।
এ অবস্থায় রেনমিনবির আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়ানোকে চীন একধরনের আর্থিক সুরক্ষা হিসেবে দেখছে। দেশটির উদ্দেশ্য হলো, এমন বিকল্প ব্যবস্থা তৈরি করা, যার মাধ্যমে ডলারের ওপর নির্ভরতা কমিয়েও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।
অর্থনীতিবিদদের আলোচনায় এ ধরনের সক্ষমতাকে দ্বিতীয় পর্যায়ের আর্থিক প্রতিরোধক্ষমতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র যদি ডলারকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাহলে চীনের হাতে যেন বিকল্প লেনদেন ও অর্থায়নের ব্যবস্থা থাকে।
ডলারকে সরিয়ে দেওয়াই কি চীনের লক্ষ্য?
চীনের কৌশল বুঝতে হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখতে হবে। বেইজিং যে সরাসরি ডলারের জায়গায় রেনমিনবিকে বসাতে চায়, বিষয়টি এমন নয়। বরং আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থায় ডলারের একক আধিপত্য কমিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মুদ্রার সহাবস্থান তৈরি করাই তাদের কাছে বেশি বাস্তবসম্মত লক্ষ্য।
বিশ্ব অর্থনীতিতে ডলারের আধিপত্য চীনকেও অনেক সুবিধা দেয়। দেশটির উৎপাদিত পণ্য বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে সহজে পৌঁছায়, কারণ অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত। পণ্যের মূল্য নির্ধারণ, অর্থায়ন ও লেনদেন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে এই পরিচিত ব্যবস্থা চীনা রপ্তানিকারকদের জন্য সুবিধা তৈরি করে।
তবে ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থান ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রকেও কিছু অর্থনৈতিক দায়িত্ব পালন করতে হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের হাতে বিপুল পরিমাণ ডলার জমা থাকে। এসব ডলার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতিতে প্রবাহিত হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আর্থিক সংকটের সময় যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজারে তারল্য বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ নিতে হয়।
চীন এমন একটি বৈশ্বিক মুদ্রাব্যবস্থা পরিচালনার জন্য নিজেদের অর্থনীতি পুরোপুরি উন্মুক্ত করতে আগ্রহী নয়। কারণ রেনমিনবিকে যদি ডলারের সমপর্যায়ের আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য চীনের আর্থিক বাজারে প্রবেশ, বিনিয়োগ এবং অর্থ প্রত্যাহারের সুযোগ আরও ব্যাপকভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
এতে চীনের রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত অর্থনৈতিক কাঠামোর ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, চীনের ধনী নাগরিক ও রাজনৈতিক অভিজাতদের একটি অংশ নিজেদের সম্পদের নিরাপত্তার জন্য বিদেশি ব্যাংক হিসাব, ডলারভিত্তিক সম্পদ এবং আন্তর্জাতিক করপোরেট কাঠামোর ওপর নির্ভর করেন। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁরা বিভিন্ন দেশের মুদ্রা ও বিচারব্যবস্থায় সম্পদ ছড়িয়ে রাখার সুযোগ পান।
ফলে ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থান দুর্বল করার পাশাপাশি নিজেদের আর্থিক বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণও ধরে রাখতে চায় বেইজিং। এই দুই লক্ষ্য একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা চীনের জন্য একটি বড় নীতিগত চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক লেনদেনে রেনমিনবির বিস্তার
রেনমিনবিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চীন ইতিমধ্যে প্রয়োজনীয় আর্থিক অবকাঠামো তৈরির কাজ শুরু করেছে।
২০০৫ সালে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৎকালীন গভর্নর জৌ জিয়াওচুয়ান দেশটির বাণিজ্যিক অংশীদারদের মধ্যে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেনের ব্যবহার বাড়ানোর পক্ষে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন।
এরপর ২০০৯ সালে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সীমান্তপারের বাণিজ্যিক লেনদেন রেনমিনবিতে নিষ্পত্তির জন্য পরীক্ষামূলক কার্যক্রম শুরু করে।
এই উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ২০১৫ সালে চালু হয় সীমান্তপারের আন্তব্যাংক লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক রেনমিনবি লেনদেনের ক্ষেত্রে এটি বর্তমানে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
এর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য রেনমিনবিতে অর্থ পাঠানো, গ্রহণ করা এবং বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তি করা সহজ হয়েছে।
শতাধিক দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রেনমিনবিভিত্তিক লেনদেনের সুযোগ তৈরি করতে চীন কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে শুধু কয়েকটি বড় আর্থিক কেন্দ্রের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিস্তৃত নেটওয়ার্ক তৈরি করাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রার শক্তি শুধু অর্থ পাঠানো কিংবা গ্রহণ করার সুবিধার ওপর নির্ভর করে না। একটি মুদ্রাকে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে পুরো বাণিজ্যিক ও আর্থিক প্রক্রিয়ায় তার গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হয়।
এই প্রক্রিয়ার পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রয়েছে। প্রথমত, পণ্যের মূল্য নির্ধারণ। দ্বিতীয়ত, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের অর্থায়ন। তৃতীয়ত, আর্থিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা। চতুর্থত, অর্থ পরিশোধ ও লেনদেন নিষ্পত্তি। পঞ্চমত, অর্জিত অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করা।
ডলার বর্তমানে এই পাঁচটি ক্ষেত্রেই শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে। ফলে রেনমিনবিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করতে হলে চীনকে প্রতিটি ক্ষেত্রেই কার্যকর বিকল্প তৈরি করতে হবে।
পণ্যের মূল্য নির্ধারণে চীনের নতুন পরিকল্পনা
চীনের নতুন আর্থিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব বাড়ানো।
দীর্ঘদিন ধরে চীন তাদের আমদানি ও রপ্তানির বড় অংশের মূল্য ডলারে নির্ধারণ করে এসেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চীনের মোট রপ্তানি পণ্যের মাত্র ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মূল্য রেনমিনবিতে নির্ধারণ করা হয়েছিল। অন্যদিকে চীনের সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ পণ্য বাণিজ্যের লেনদেন রেনমিনবিতে নিষ্পত্তি হয়।
এই ব্যবধান থেকেই বোঝা যায়, লেনদেনের অর্থ পরিশোধে রেনমিনবির ব্যবহার বাড়লেও পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য নির্ধারণে ডলারের প্রভাব এখনো অনেক বেশি।
এই পরিস্থিতি বদলাতে চীন তথাকথিত ‘চীনা মূল্য’ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশটি গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল ও শিল্পের প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিজেদের বাজারে রেনমিনবিতে নির্ধারণের সুযোগ তৈরি করতে চায়।
বিশেষ করে যেসব খনিজ পদার্থ আধুনিক প্রযুক্তি ও সবুজ জ্বালানি শিল্পের জন্য অপরিহার্য, সেগুলোর বাজারে নিজস্ব মূল্য নির্ধারণের ব্যবস্থা গড়ে তোলাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কারণ চীন শুধু এসব খনিজের বড় ভোক্তা নয়, বরং এগুলো ব্যবহার করে ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিভিন্ন সরঞ্জাম উৎপাদনেও বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে।
বিরল খনিজ ও ব্যাটারি শিল্পে চীনের প্রভাব
বিশ্বের ব্যাটারি উৎপাদনের ৮০ শতাংশের বেশি চীনে হয়ে থাকে। পাশাপাশি বিশ্বে ব্যবহৃত লিথিয়ামের ৭৫ শতাংশের বেশি, কোবাল্টের ৭০ শতাংশ এবং নিকেলের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করে দেশটি।
বৈদ্যুতিক গাড়ি, বিদ্যুৎ সংরক্ষণব্যবস্থা, সৌরবিদ্যুৎ এবং অন্যান্য আধুনিক প্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে এসব খনিজের গুরুত্ব আরও বাড়ছে।
কিন্তু এসব খনিজের উৎপাদন ও ব্যবহারে চীনের ব্যাপক প্রভাব থাকলেও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশটির অবস্থান এখনো পুরোপুরি সেই সক্ষমতার প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি।
উদাহরণ হিসেবে নিকেল ও কোবাল্টের কথা বলা যায়। চীন এসব খনিজের অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্য নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড এখনো লন্ডন ও শিকাগোভিত্তিক ডলারনির্ভর বাজারের সঙ্গে যুক্ত।
এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য চীন নিজস্ব পণ্যবাজার ও মূল্য নির্ধারণের কাঠামো শক্তিশালী করতে চায়।
এখানে বেইজিংয়ের হিসাব বেশ সরল। কোনো পণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি দেশ যদি বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে সেই পণ্যের আন্তর্জাতিক মূল্য নির্ধারণেও তার প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়।
এর মাধ্যমে চীন শুধু পণ্য উৎপাদনের সুবিধা নয়, বরং পণ্যের বাজার ও সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের ওপরও প্রভাব বিস্তার করতে চায়।
বিদেশে রেনমিনবিতে ঋণ ও অর্থায়ন বাড়াচ্ছে বেইজিং
রেনমিনবির আন্তর্জাতিক ব্যবহার বাড়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হলো বিদেশে ঋণ ও বিনিয়োগের অর্থায়ন।
২০২৩ সালে চীনা সরকার দেশটির আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিদেশে রেনমিনবিভিত্তিক অর্থায়ন বাড়ানোর নির্দেশ দেয়।
এরপর চীনের রপ্তানি-আমদানি ব্যাংকের মতো রাষ্ট্রসমর্থিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক ও অবকাঠামো প্রকল্পে রেনমিনবিতে ঋণ দেওয়ার কার্যক্রম বাড়িয়েছে।
পাশাপাশি দেশটির বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের অর্থায়নে রেনমিনবি ব্যবহার বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
শুধু ঋণ নয়, বিমা ও পুনর্বিমা খাতেও রেনমিনবির ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। কারণ আন্তর্জাতিক ব্যবসায় পণ্যের মূল্য পরিশোধের পাশাপাশি পরিবহন, বীমা, বিনিয়োগ এবং সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।
এসব ক্ষেত্রেও রেনমিনবির ব্যবহার বাড়লে আন্তর্জাতিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ডলারের বাইরে বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সহজ হবে।
তবে শুধু ঋণ দেওয়া বা অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করলেই একটি মুদ্রা শক্তিশালী হয়ে ওঠে না। বিদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ হিসেবে রেনমিনবি গ্রহণ করার পর সেই অর্থ কোথায় বিনিয়োগ করবে এবং কীভাবে ব্যবহার করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় বাধা পুনর্বিনিয়োগের ক্ষেত্রে
আন্তর্জাতিক মুদ্রার দীর্ঘমেয়াদি গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে সেই মুদ্রায় অর্জিত অর্থ পুনরায় বিনিয়োগ করার সুযোগের ওপর।
ধরা যাক, কোনো দেশ চীনের কাছে পণ্য রপ্তানি করে রেনমিনবি আয় করল। এখন সেই অর্থ দিয়ে দেশটি কী করবে? চীনা পণ্য কিনবে, ব্যাংকে জমা রাখবে, চীনের আর্থিক বাজারে বিনিয়োগ করবে, নাকি অন্য কোনো মুদ্রায় রূপান্তর করবে?
এই সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে রেনমিনবির আন্তর্জাতিক চাহিদা কতটা স্থায়ী হবে।
যদি বিদেশি প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীরা রেনমিনবি আয় করার পর তা অন্য মুদ্রায় রূপান্তর করতে বাধ্য হয়, তাহলে এই মুদ্রার আন্তর্জাতিক ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে সীমিত থাকবে।
এ কারণে চীনকে এমন একটি আর্থিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা রেনমিনবি ধরে রাখতে এবং সেই অর্থ দিয়ে চীনের বিভিন্ন সম্পদে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হন।
কিন্তু এখানেই বড় সমস্যা রয়েছে। চীনের মূলধন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে ভবিষ্যতে কোনো সময় তাঁদের অর্থ উত্তোলন বা অন্য দেশে স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে কি না, সেই উদ্বেগ রয়েছে।
অর্থাৎ রেনমিনবির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে হলে চীনকে একদিকে আর্থিক বাজারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে হবে, অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য পর্যাপ্ত স্বচ্ছতা ও আস্থার পরিবেশও তৈরি করতে হবে।
সবুজ অর্থনীতিই হতে পারে নতুন আর্থিক শক্তির ভিত্তি
চীনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় সবুজ জ্বালানি ও আধুনিক শিল্পপ্রযুক্তি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। এই খাতগুলোকে কেন্দ্র করেই ভবিষ্যতে রেনমিনবির আন্তর্জাতিক অবস্থান শক্তিশালী করার সম্ভাবনা দেখছে বেইজিং।
বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতি ধীরে ধীরে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং বিদ্যুৎ সংরক্ষণ প্রযুক্তির দিকে এগোচ্ছে। এই পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম, ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক অবকাঠামো এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ।
এসব খাতের সরবরাহ শৃঙ্খলে চীনের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে দেশটি শিল্প উৎপাদন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর বিনিয়োগ করেছে। এর ফলে সৌরবিদ্যুৎ সরঞ্জাম, ব্যাটারি এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে চীন বিশ্ববাজারে বড় অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে।
এই শিল্পভিত্তিক সক্ষমতাকে এবার আর্থিক শক্তিতে রূপান্তর করার চেষ্টা করছে বেইজিং।
ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি তেলের বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। তেল বাণিজ্যের বড় অংশ ডলারে পরিচালিত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতে পেট্রোডলারের ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
চীনের পরিকল্পনায় এর বিকল্প হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, সবুজ জ্বালানি সরঞ্জাম এবং বৈদ্যুতিক অবকাঠামো ভূমিকা রাখতে পারে।
অর্থাৎ ভবিষ্যতে যেসব দেশ সৌরবিদ্যুৎ, ব্যাটারি কিংবা বৈদ্যুতিক গাড়ির শিল্প গড়ে তুলতে চাইবে, তাদের অনেককেই চীনের প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও অর্থায়নের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে।
এই নির্ভরতা বাড়লে রেনমিনবিতে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের চাহিদাও বাড়তে পারে।
সবুজ অর্থায়নে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করার চেষ্টা
চীন এখন শুধু সবুজ প্রযুক্তি উৎপাদনে নেতৃত্ব ধরে রাখতে চায় না, বরং এই খাতে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগের অর্থায়নেও নিজের অবস্থান শক্তিশালী করতে আগ্রহী।
দেশটির অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকারীদের জন্য তৈরি করা সবুজ ঋণের একটি বড় অংশকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে বিনিয়োগযোগ্য আর্থিক সম্পদে রূপান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
এর উদ্দেশ্য হলো, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য এসব সম্পদে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা।
এ ধরনের উদ্যোগ সফল হলে সবুজ জ্বালানি প্রকল্পে চীনের প্রযুক্তি ও সরঞ্জাম ব্যবহারের পাশাপাশি রেনমিনবিভিত্তিক অর্থায়নের সুযোগও বাড়বে।
বিশ্বের অনেক দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে চায়। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, যুদ্ধ এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা তাদের নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি সক্ষমতা তৈরিতে উৎসাহিত করছে।
এ ক্ষেত্রে চীনের উৎপাদন সক্ষমতা ও অর্থায়নের সুযোগ অনেক দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ফলে সবুজ প্রযুক্তি, পণ্য বাণিজ্য এবং অর্থায়নকে কেন্দ্র করে রেনমিনবিভিত্তিক একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
ডলারের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
চীনের এই পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন ধরনের কৌশলগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে খুব দ্রুত ডলারের আন্তর্জাতিক আধিপত্য শেষ হয়ে যাবে।
ডলারের শক্তির পেছনে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল অর্থনীতি, গভীর আর্থিক বাজার, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকিং অবকাঠামো।
অন্যদিকে চীনের অর্থনীতি ও শিল্প উৎপাদনের সক্ষমতা অনেক বেশি হলেও দেশটির আর্থিক বাজারে মূলধনের অবাধ প্রবাহ, নীতিগত স্বচ্ছতা এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থার ক্ষেত্রে এখনো কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
তাই রেনমিনবি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডলারের বিকল্প হয়ে উঠতে পারবে কি না, তা নির্ভর করবে চীনের আর্থিক সংস্কার কতটা এগোয় এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য দেশটি কতটা নির্ভরযোগ্য পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তার ওপর।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থান শুধু চীনের নীতির ওপর নির্ভর করছে না। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতি, ঋণের পরিমাণ, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্কও ভবিষ্যতে ডলারের গ্রহণযোগ্যতা নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে।
ডলারের সিংহাসন কি সত্যিই হারাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র?
সবকিছু বিবেচনায় চীনের বর্তমান উদ্যোগকে ডলার উৎখাতের সরাসরি অভিযান হিসেবে দেখার চেয়ে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় নিজেদের বিকল্প শক্তি তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিসংগত।
বেইজিংয়ের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য হলো, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র যেন ডলারভিত্তিক আর্থিক ব্যবস্থা ব্যবহার করে চীনের ওপর একতরফা চাপ সৃষ্টি করতে না পারে। রেনমিনবির ব্যবহার যত বাড়বে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও অর্থায়নে চীনের বিকল্প ব্যবস্থা তত শক্তিশালী হবে।
তবে ডলারের অবস্থান দুর্বল হলে তার জায়গায় কোন মুদ্রা আসবে, সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থা হয়তো একক কোনো মুদ্রার ওপর নির্ভর না করে একাধিক শক্তিশালী মুদ্রাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠতে পারে।
এ ক্ষেত্রে চীনের সবুজ প্রযুক্তি, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ এবং শিল্প উৎপাদনের সক্ষমতা বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে।
একটি বিষয় স্পষ্ট, ভবিষ্যতের আর্থিক ক্ষমতা শুধু অর্থ ছাপানোর সক্ষমতা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। কোন দেশ গুরুত্বপূর্ণ পণ্য উৎপাদন করতে পারে, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণে কতটা প্রভাব রাখে এবং অন্য দেশগুলোকে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও অর্থায়ন দিতে পারে—এসব বিষয়ও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
ডলারের আধিপত্যের ভবিষ্যৎ তাই শুধু রেনমিনবির উত্থানের ওপর নির্ভর করছে না; বরং যুক্তরাষ্ট্র নিজেই তার আর্থিক নেতৃত্ব কতটা ধরে রাখতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যতের বিশ্ব অর্থনীতিতে হয়তো তেলের ব্যারেলের চেয়ে ব্যাটারি, সৌরবিদ্যুৎ, বিরল খনিজ এবং আধুনিক শিল্পপ্রযুক্তিই মুদ্রাশক্তির নতুন ভিত্তি হয়ে উঠবে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রে থাকতে পারে চীন।

