ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের ক্রমাগত পরিবর্তনশীল উদ্দেশ্যগুলো—যার মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন উস্কে দেওয়া, ইরানের বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেওয়া, এর ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা নির্মূল করা এবং নিঃশর্তে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া—বিবেচনা করলে এটা স্পষ্ট যে এর কোনোটিই অর্জিত হয়নি। বরং, এই অভিযানটি বহুলাংশে ব্যর্থ হয়েছে।
ব্যাপক বেসামরিক হতাহতের ঘটনা এবং প্রথম ও দ্বিতীয় সারির নেতৃত্বের গুপ্তহত্যা সত্ত্বেও ইরান তার শাসন কর্তৃত্ব বজায় রাখতে এবং এমনকি আরো শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছিল।
এটি একটি ধারাবাহিক ও ক্রমান্বয়ে তীব্রতর হতে থাকা অসম যুদ্ধ পরিচালনা করেছে, বৃহত্তর অঞ্চলকে চাপের মধ্যে ফেলেছে এবং হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত করার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে। যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সাথে কোনো দৃশ্যমান পূর্ব আলোচনা ছাড়াই যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে, তাই এই বিষয়গুলোকে ইরানের বিজয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কীভাবে এই ফলাফলকে বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন, তা বোঝা কঠিন।
তার কর্মকাণ্ডগুলো অন্তঃসারশূন্য হুমকি, কৌশল পরিবর্তন, উস্কানিমূলক ভাষা এবং চরমপন্থী বাগাড়ম্বরের এক বৃহত্তর ধারারই অংশ, যার মধ্যে ইরানি সভ্যতা নিশ্চিহ্ন করার প্রসঙ্গও রয়েছে। বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মূলত একদল অনভিজ্ঞ ও অতি-পুরুষালি ব্যক্তিত্বের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, যারা তাদের ক্রমহ্রাসমান বৈশ্বিক অবস্থানকে টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। এমনটা করতে গিয়ে তারা একদিকে যেমন নিজেদের অবস্থানকে আরও দুর্বল করার ঝুঁকি নিচ্ছে, তেমনই অন্যদিকে নিজেদের ঘোষিত প্রতিপক্ষদের অজান্তেই শক্তিশালী করে তুলছে।
এর মানে এই নয় যে ট্রাম্প বুদ্ধিহীন অথবা নিজের কার্যকলাপ সম্পর্কে অসচেতন। বরং, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে একটি ক্ষয়িষ্ণু শক্তি হিসেবে সঠিকভাবে উপলব্ধি করেন বলেই মনে হয়, যা বিশেষত চীনের কাছ থেকে ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার সম্মুখীন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি থেকে- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি আগ্রাসী, হস্তক্ষেপকারী বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে কাজ করে আসছে এবং প্রায়শই আন্তর্জাতিক আইনকে উপেক্ষা করে তার প্রভাব বিস্তারের জন্য প্রকাশ্য ও গোপন উপায় অবলম্বন করে। আজ আমরা যা দেখছি তা নতুন নয়; কয়েক দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে একই ধরনের প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়ে আসছে।
কেবল সম্প্রতিই, যেমন গ্রিনল্যান্ডের প্রসঙ্গে, ইউরোপের দিকে চাপ বাড়ার ফলেই ইউরোপীয়রা এই গতিপ্রকৃতিগুলোকে হুমকিস্বরূপ হিসেবে চিনতে শুরু করেছে, অথচ অন্যত্র প্রয়োগের ক্ষেত্রে এগুলো দীর্ঘদিন ধরে সহ্য করা হয়েছিল।
ধারণার পরিবর্তন
এই প্রেক্ষাপটে, বিশ্বব্যাপী আধিপত্য বজায় রাখার জন্য ট্রাম্পের বৃহত্তর কর্মসূচির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত বলে মনে হচ্ছে উচ্চ-প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পকে দেশে ফিরিয়ে আনা ও নিয়ন্ত্রণ করা, জ্বালানি এবং দুর্লভ খনিজ সম্পদে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় রপ্তানিকারক এবং তেল ও গ্যাস প্রবাহের মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যা প্রধান জাহাজ চলাচল ও বাণিজ্য পথগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করবে, ইউরোপের প্রতি দায়বদ্ধতা হ্রাস করা, রাশিয়াকে চীনের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি আনা এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় কমাতে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলকে আরো বেশি নিয়ন্ত্রণ প্রদান করা।
কিন্তু অতিরিক্ত আগ্রাসী ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের কারণে এই কৌশলটি দুর্বল হয়ে পড়েছে, ফলে এটিকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর ফলস্বরূপ, ট্রাম্পের অনেক পদক্ষেপই হিতে বিপরীত হয়েছে, যা তার নিজের অবস্থান এবং বৃহত্তর কৌশলগত উদ্দেশ্য উভয়েরই ব্যাপক ক্ষতি করেছে।
এর গুরুতর মানবিক পরিণতিও ঘটেছে, যা বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা ও প্রাণহানির কারণ হয়েছে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের আরেকটি অভ্যন্তরীণ পরিণতি হলো ডানপন্থী শিবিরে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন, বিশেষ করে মাগা আন্দোলনের সেই অংশগুলোর মধ্যে যারা তার বর্তমান কর্মসূচি এবং ইসরায়েলের সাথে এর ঘনিষ্ঠ আঁতাতের বিরোধিতা করে।
মনে হচ্ছে, দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয়ের দাবির ওপর ভিত্তি করে, যা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি, ট্রাম্প প্রশাসন উপসাগরীয় মিত্রদের বিপরীতমুখী আবেদনকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ইরানের বিরুদ্ধে এই আগ্রাসনে লিপ্ত হতে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও তার সহযোগীদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল।
আমরা এখন যা দেখছি তা কেবল তথাকথিত ‘ইসরায়েল ফার্স্ট’ এজেন্ডা নিয়ে আমেরিকান বামপন্থীদের অসন্তোষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশিষ্ট ডানপন্থী ব্যক্তিত্বরা—বিশেষ করে টাকার কার্লসন—ও এর বিরোধিতা করতে শুরু করেছেন। এই উদীয়মান বিভাজন ধীরে ধীরে ট্রাম্পের সমর্থন ভিত্তি ক্ষুণ্ণ করছে এবং দেশের অভ্যন্তরে তাঁর অবস্থানকে দুর্বল করছে।
সুতরাং, এই যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যে এই যুদ্ধে ইসরায়েলও পরাজিত পক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এবং এর সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো মার্কিন জনগণের সেই সমর্থন, যা আগে নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া হতো।
আরেকটি ক্ষেত্র যেখানে ইসরায়েলকে ব্যর্থ হিসেবে দেখা যেতে পারে, তা হলো লেবাননের আন্দোলন হিজবুল্লাহকে সম্পূর্ণরূপে নিরস্ত্র করতে না পারা। যদিও ইসরায়েল সংগঠনটির নেতৃত্ব এবং কার্যক্ষমতার ওপর উল্লেখযোগ্য ক্ষতিসাধন করেছে, তবুও হিজবুল্লাহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণের পাশাপাশি ইসরায়েলি স্থল আগ্রাসন মোকাবেলা করার ক্ষমতা ধরে রেখেছে বলে মনে হচ্ছে।
মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তায় বিপুল বিনিয়োগ করার ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো এই বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছে যে, ওয়াশিংটনের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে ইসরায়েলি নিরাপত্তা স্বার্থই অগ্রাধিকার পায়।
বরং ইসরায়েলের সবচেয়ে বাস্তব সাফল্য হলো লেবাননের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে আরও গভীর করা এবং এর পাশাপাশি সুস্পষ্ট দুর্বল অবস্থান থেকে ইসরায়েলের সাথে সরাসরি আলোচনার দিকে লেবাননের বর্তমান পদক্ষেপ। এই অর্থে, ইসরায়েল সামরিক উপায়ে যা আদায় করতে পারেনি, লেবানন রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কার্যকরভাবে তা মেনে নিয়েছে।
এই সংঘাতের আপেক্ষিক ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে উপসাগরীয় দেশগুলোকেও গণ্য করা যেতে পারে। মার্কিন নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ওপর বিপুল বিনিয়োগ করার ফলে তারা এই বাস্তবতার সম্মুখীন হয়েছে যে, ওয়াশিংটনের কৌশলগত হিসাব-নিকাশে ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থই অগ্রাধিকার পায়।
এই উত্তেজনা বৃদ্ধি শুধু একটি স্থিতিশীল ও নিরাপদ বিনিয়োগ পরিবেশ হিসেবে উপসাগরীয় অঞ্চলের সযত্নে গড়া ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্ণই করেনি, বরং এর জ্বালানি অবকাঠামোর দুর্বলতাগুলোও উন্মোচিত করেছে।
হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে চলমান অনিশ্চয়তা এবং রপ্তানি সক্ষমতা মেরামত ও পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় সময় অর্থনৈতিক সংকটকে দীর্ঘায়িত করার ঝুঁকি তৈরি করছে—অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র বর্ধিত তেল ও গ্যাস রপ্তানির মাধ্যমে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নিজের অংশ প্রসারিত করার সুযোগ পাচ্ছে।
সুনামের ক্ষতি
এদিকে, হরমুজ প্রণালী এখন কার্যত ইরানের নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে বলে মনে হচ্ছে—এটি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি যা ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভবত আগে থেকে অনুমান করতে ব্যর্থ হয়েছিল, যার ফলে এমন একটি সংকট তৈরি হয়েছে যেখানে আগে কোনো সংকট ছিল না। এটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বাড়াবাড়ির আরও একটি দৃষ্টান্ত, যা প্রণালীটিতে সামুদ্রিক প্রবাহের প্রতি তাদের নিজস্ব বিধিনিষেধমূলক অবস্থানের কারণে আরও জটিল হয়েছে।
এই ভুল হিসাবটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ববর্তী কৌশলগত ভুলগুলোরই প্রতিধ্বনি, যেমন ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ, যা শেষ পর্যন্ত ইরাকের অভ্যন্তরে ইরানের প্রভাবকে শক্তিশালী করেছিল এবং একটি দুর্বল, সাম্প্রদায়িক, খণ্ডিত ও বহিরাগত প্রভাবাধীন রাজনৈতিক ব্যবস্থার উত্থানে ভূমিকা রেখেছিল।
ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই বৈশ্বিক ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও মধ্যপ্রাচ্য এবং গ্লোবাল সাউথের কিছু অংশে এই ধরনের ধারণা দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান ছিল, এখন তা ইউরোপেও ক্রমশ দৃশ্যমান হচ্ছে।
এর ফলে দেশের অভ্যন্তরে রাজনৈতিক ক্ষমতার পতন ঘটবে কিনা, তা এখনও অনিশ্চিত। কিন্তু ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে ইতোমধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠিত শাসনব্যবস্থার রীতিনীতির ওপর যথেষ্ট চাপ সৃষ্টি করেছেন—এবং এই চাপ কতটা সহ্য করা হয়েছে, তা আমেরিকার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থিতিস্থাপকতা ও প্রকৃতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করে।
যা অধিকতর সম্ভাব্য বলে মনে হচ্ছে তা হলো, ইরান সরকার তার অবস্থানে আরও অনড় ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠবে, যা পাকিস্তানে সাম্প্রতিক আলোচনায় ছাড় দিতে অস্বীকৃতি এবং মূল কৌশলগত দাবিগুলোতে অবিচল থাকার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে।
গত এক দশকে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের প্রতারণামূলক ও অসৎ কার্যকলাপের একাধিক দৃষ্টান্ত লক্ষ্য করেছে: ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তি থেকে দেশটির একতরফা প্রত্যাহার, গত জুনে আলোচনা চলাকালীন সামরিক পদক্ষেপ এবং ওমানের মধ্যস্থতায় অনুষ্ঠিত আলোচনা চলাকালে সর্বশেষ হামলা।
এমন পরিস্থিতিতে, ইরান কেন আবার যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করবে তা বোঝা কঠিন। একইভাবে, এই ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে ইউরোপীয় সরকারগুলোর আপাত নিষ্ক্রিয়তা ইরানের দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ইরানের সাথে আন্তর্জাতিক লেনদেনে এই দ্বৈত নীতির ধারাবাহিকতা ভবিষ্যতে গ্রহণযোগ্য হওয়ার সম্ভাবনা কম।
যদি মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ইরান সরকারকে দুর্বল বা অস্থিতিশীল করা হয়ে থাকে, তবে এখন পর্যন্ত এর ফলাফল বিপরীতই হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
এই উদ্যোগের ফলে প্রধানত দুর্বল হয়ে পড়েছে মার্কিন উপসাগরীয় মিত্ররা, যাদের এখন অবকাঠামোগত ক্ষতি মেরামত, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নিজেদের অংশ হারানোর সম্ভাবনা এবং হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও শাসনব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তার বোঝা বহন করতে হচ্ছে।
- হিশাম বুস্তানি: জর্ডানের একজন পুরস্কার বিজয়ী লেখক, ভাষ্যকার এবং সমাজকর্মী। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

