বিবিসির সর্বশেষ প্যানোরামা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, ‘ইহুদিবিদ্বেষ: ব্রিটিশ ইহুদিরা কেন ভীত’, ২০ এপ্রিল সম্প্রচারিত হয়েছিল।
এই ধরনের পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত যে প্রয়োজনীয়, তা নিয়ে খুব কম লোকই দ্বিমত পোষণ করবেন, কারণ ইহুদিবিদ্বেষ একটি বাস্তব ও অবিরাম সমস্যা এবং এর জন্য কঠোর সাংবাদিকতার প্রয়োজন। কিন্তু এর পরের প্রশ্নটি উপেক্ষা করা আরও কঠিন: ইসলামবিদ্বেষের ওপর কেন সমতুল্য প্রাতিষ্ঠানিক মনোযোগ নেই?
এটি কেবল অনুষ্ঠানসূচির ভারসাম্যের প্রশ্ন নয়। এটি আরও গভীর কিছুর দিকে ইঙ্গিত করে—একটি ধারাবাহিক প্রবণতা, যেখানে বর্ণবাদের কিছু রূপকে সামনে তুলে ধরা হয়, আর অন্যগুলোকে প্রান্তিক, শর্তসাপেক্ষ বা চাপা দেওয়া হয়। এই প্রমাণ কোনো একটি নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি প্রচারের সিদ্ধান্ত, ভাষার ব্যবহার এবং সম্পাদকীয় বিচার-বিবেচনার সর্বত্রই ফুটে ওঠে—এবং এর পরিমাণ বেড়েই চলেছে।
ইহুদি-বিদ্বেষ এবং ইসলাম-বিদ্বেষ নিয়ে বিবিসির প্রতিবেদনের তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়। প্যানোরামা অনুষ্ঠানের প্রচারমূলক অনলাইন প্রতিবেদনে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বিদ্বেষমূলক অপরাধের পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছিল যে, পরম সংখ্যার হিসাবে মুসলমানরাই সবচেয়ে বেশি লক্ষ্যবস্তু হওয়া ধর্মীয় গোষ্ঠী—৪,৪৭৮টি নথিভুক্ত ঘটনা। এই তথ্যটি প্রবন্ধের মাঝখানে অল্প সময়ের জন্য উল্লেখ করা হয়েছিল, এরপরই বিবরণের মোড় ঘুরে যায়। সবচেয়ে বড় সংখ্যাটি একটি পাদটীকায় পরিণত হয়।
একই প্রতিবেদনে, বিবিসি জনসংখ্যা-সমন্বিত একটি পরিসংখ্যানকে সামনে এনেছিল: যে ইহুদি-বিদ্বেষী ঘটনা পরম সংখ্যায় কম হলেও, ব্রিটিশ ইহুদি সম্প্রদায়ের আকারের তুলনায় আনুপাতিকভাবে বেশি ছিল। এটি একটি বৈধ বিশ্লেষণাত্মক কাঠামো, কিন্তু এটি বেছে বেছে প্রয়োগ করা হয়েছিল।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলের ওপর হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলার পর, ক্যাম্পাসে ইসলামবিদ্বেষী ঘটনা দশগুণেরও বেশি বেড়ে তিনটি থেকে ৩১টি ঘটনায় দাঁড়িয়েছে। ইহুদিবিদ্বেষী ঘটনা ১২টি থেকে বেড়ে ৬৭টি হয়েছে। উভয়ই তাৎপর্যপূর্ণ। ইসলামবিদ্বেষ আনুপাতিকভাবে তীব্রভাবে বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও, এটি প্রচারের খুব সামান্য অংশই পেয়েছে এবং নিবন্ধটিতে কেবল ইহুদি শিক্ষার্থীদের উদ্বেগের কথাই শিরোনামে তুলে ধরা হয়েছিল।
আনুপাতিক দৃষ্টিভঙ্গিটি তখন প্রয়োগ করা হতো, যখন তা ইহুদি-বিদ্বেষকে তুলে ধরার যুক্তিকে শক্তিশালী করত এবং যখন তা ভিন্ন দিকে ইঙ্গিত করত তখন তা সরিয়ে রাখা হতো।
এই বিষয়ে নিউজনাইটের সম্প্রচারে ইহুদি-বিদ্বেষের জন্য প্রায় সাড়ে তিন মিনিট সময় বরাদ্দ করা হয়েছিল, যেখানে গভীর সাক্ষাৎকার ও বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়; অন্যদিকে ইসলাম-বিদ্বেষের অনুরূপ আলোচনার জন্য এক মিনিটেরও কম সময় দেওয়া হয়েছিল। এই অসামঞ্জস্যটি কেবল পরিমাণগতই ছিল না, বরং কাঠামোগতও ছিল—একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল, অন্যটি কেবল স্বীকার করা হয়েছিল।
২০২৪ সালে, বিবিসি নিউজ ইহুদি ও মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা তহবিলের বৈষম্যকে “প্রতিটি সম্প্রদায়ের আকারের সমানুপাতিক” বলে বর্ণনা করেছিল, কিন্তু সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং-এর একটি আপত্তি এটিকে মিথ্যা প্রমাণ করে। প্রকৃত সমতা অর্জনের জন্য মুসলিম প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় ১৩.৫ গুণ বেশি তহবিলের প্রয়োজন হবে।
বিবিসি একটি সংশোধনী জারি করেছিল, কিন্তু তা কয়েক মাস পরে এবং প্রায় প্রচার ছাড়াই, জুলাই মাসের সাধারণ নির্বাচনের রাতে। প্রকৃত তহবিল ঘাটতির কোনো স্বীকৃতি ছাড়াই আনুপাতিকতার দাবিটি মুছে ফেলা হয়েছিল।
এগুলো বিচ্ছিন্ন সম্পাদকীয় খামখেয়ালি নয়। এগুলো একটি স্তরবিন্যাসের প্রমাণ—একটি ধারাবাহিক ধারা, যা একের পর এক ঘটনায় পুনরাবৃত্ত হয়, যেখানে ইহুদি-বিদ্বেষের তুলনায় ইসলামোফোবিয়াকে কম জরুরি ও কম সংবাদযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
দুটি অগ্নিসংযোগের ঘটনা, দুটি মানদণ্ড
একই সময়ে ঘটা দুটি অগ্নিসংযোগের ঘটনা বিশ্লেষণ করলে এই বৈষম্যটি সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। যখন গোল্ডার্স গ্রিনে হাতজোলা অ্যাম্বুলেন্সগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তখন সেই ঘটনাটি নিয়ে বিবিসির একাধিক জাতীয় প্রতিবেদন, একটি লাইভ ব্লগ, প্রধানমন্ত্রী ও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বিবৃতি, সাতটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও এবং গণমাধ্যম জুড়ে ৩০০-রও বেশি অনলাইন উল্লেখ হয়েছিল।
একই সময়ে, সাসেক্সের পিসহেভেন মসজিদে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এই হামলায় দুজন মুখোশধারী ব্যক্তি মসজিদের প্রবেশপথে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়, যখন ভেতরে মুসল্লিরা উপস্থিত ছিলেন।
ঘটনাটি নিয়ে বিবিসির একটিমাত্র স্থানীয় প্রতিবেদন এবং বৃহত্তর গণমাধ্যমে ৬৪ বার উল্লেখ করা হয়েছিল। অপরাধের ধরণ একই হলেও, সম্পাদকীয় গুরুত্ব ছিল আকাশ-পাতাল ভিন্ন।
২০২৫ সালের আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে পর্যবেক্ষণকারী গোষ্ঠীগুলো যুক্তরাজ্য জুড়ে মসজিদের ওপর ২৭টি হামলা নথিভুক্ত করেছে, যা পূর্ববর্তী ছয় মাসের মোট হামলার চেয়েও বেশি।
ঘটনাগুলোর মধ্যে ছিল জীবনহানির গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টিকারী অগ্নিসংযোগ, নিক্ষিপ্ত বস্তু দিয়ে হামলা এবং ভীতি প্রদর্শনের জন্য পতাকা ও ধর্মীয় প্রতীকের সমন্বিত ব্যবহার। এ বিষয়ে বিবিসি প্যানোরামার কোনো প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
সম্প্রতি বহুল প্রচারিত এক আলোচনায়, বিবিসি নিউজনাইটের উপস্থাপিকা ভিক্টোরিয়া ডার্বিশায়ার মার্কিন ডানপন্থী সম্প্রচারক টাকার কার্লসনের সাক্ষাৎকার নেন, যিনি ইসরায়েলি সরকারের ক্রমবর্ধমান সমালোচক হয়ে উঠেছেন।
কার্লসনের দাবিগুলো খণ্ডন করতে ডার্বিশায়ার ফ্লোরিডার রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান র্যান্ডি ফাইনকে নিয়ে আসেন, যার চরম বর্ণবাদী ও মুসলিম-বিরোধী দৃষ্টিভঙ্গির নথিভুক্ত রেকর্ড রয়েছে। যদি উদ্দেশ্য কথিত গোঁড়ামিকে চ্যালেঞ্জ করাই হয়ে থাকে, তবে অন্য ধরনের বৈষম্যের সঙ্গে যুক্ত একজন ব্যক্তিকে মঞ্চে আনা পরোক্ষভাবে এই ইঙ্গিত দেয় যে, কিছু কুসংস্কার অন্যগুলোর চেয়ে বেশি অযোগ্যতার কারণ।
অভিযোগের জবাবে বিবিসির প্রতিক্রিয়াটি শিক্ষণীয়: তারা যুক্তি দিয়েছে যে উপস্থাপক “আমাদের দর্শকের প্রত্যাশা অনুযায়ীই ন্যায্য, যথাযথভাবে নিরপেক্ষ এবং পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে এই সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন”।
মুসলিম-বিদ্বেষ থেকে সৃষ্ট অপরাধের সবচেয়ে সুস্পষ্ট উদাহরণগুলোও বিবিসিকে ইসলামোফোবিয়াকে অগ্রাধিকার দিতে প্ররোচিত করতে পারেনি; যেমন ৩২ বছর বয়সী জন অ্যাশবির ভয়াবহ ঘটনাটি, যাকে একজন শিখ নারীকে ধর্ষণের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। অ্যাশবি তাকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিলেন, কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন যে নারীটি মুসলিম।
বিচারক তাকে “অত্যন্ত অপ্রীতিকর, বর্ণবাদী এবং ইসলামবিদ্বেষী” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ইসলামবিদ্বেষী উদ্দেশ্যটি আকস্মিক ছিল না; এর ভিত্তিতেই সে তার শিকারকে বেছে নিয়েছিল এবং আক্রমণ করেছিল।
জিবি নিউজসহ ব্রিটিশ সম্প্রচারকারী ও সংবাদপত্রগুলো তাদের শিরোনামে এই তথ্যটিকেই প্রধান করে তুলে ধরেছিল। বিবিসির চারটি প্রতিবেদনে এটিকে কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখানো হয় এবং অভিযোগের পরেই কেবল এটিকে আবার অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বেশিরভাগ পাঠক শিরোনামের পর আর এগোয় না। বিবিসি এটা জানে।
গোল্ডার্স গ্রিন হামলার সংবাদ পরিবেশনেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গিয়েছিল, যেখানে প্রথম শিকার, মুসলিম যুবক ইসমাইল হুসেনের কথা তেমন গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করা হয়নি, বরং বিবিসির শিরোনাম ছিল: “লন্ডনের গোল্ডার্স গ্রিনে দুই ইহুদি ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতের ঘটনায় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।”
কাঠামোবদ্ধকরণ বাস্তবতা নির্মাণ করে
এই প্রতিবেদনটি লেখার সময়েও, একই দিনে ঘটা দুটি ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপিত হয়েছিল। লিভারপুলের একটি মসজিদের দরজার বাইরে থেকে এক ব্যক্তি বর্ণবাদী গালিগালাজ করেছিল—বিবিসি সেই খবরটি উপেক্ষা করে।
যখন দক্ষিণ ইংল্যান্ডে একজন ইহুদি ব্যক্তি ইহুদি-বিদ্বেষী আক্রমণের শিকার হন, তখন বিবিসি ঘটনাটি সংবাদ সংগ্রহের জন্য একজন বিশেষ সংবাদদাতা ও একজন স্থানীয় প্রতিবেদক উভয়কেই নিযুক্ত করেছিল।
এসবের কোনোটিই ইহুদি-বিদ্বেষ নিয়ে প্রতিবেদন করার গুরুত্বকে হ্রাস করে না। মূল বিষয়টি হলো সামঞ্জস্যতা। নিরপেক্ষতায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি সরকারি সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই বর্ণবাদের সকল রূপের ক্ষেত্রে প্রাধান্য, পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই এবং স্বচ্ছতার একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।
প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতিত্বের জন্য ইচ্ছাকৃত অভিপ্রায়ের প্রয়োজন হয় না। এটি পুঞ্জীভূত সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত, পাঠকের আগ্রহ সম্পর্কে অনুমান এবং রাজনৈতিক চাপের প্রতি সংবেদনশীলতার মাধ্যমেও উদ্ভূত হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইহুদি-বিদ্বেষ সঙ্গত কারণেই ধারাবাহিক জনদৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ইসলামোফোবিয়া ব্যাপকভাবে নথিভুক্ত হলেও, এটি রাজনৈতিকভাবে অধিক বিতর্কিত একটি বিষয়—এবং এই বিতর্কই বিবিসিতে এর সম্পাদকীয় গুরুত্ব কমিয়ে দিয়েছে বলে মনে হয়।
এর পরিণতি বাস্তব। গণমাধ্যমের উপস্থাপনা কেবল বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না, বরং তা বাস্তবতাকে নির্মাণ করে। যখন বর্ণবাদের কিছু অভিজ্ঞতাকে ধারাবাহিকভাবে সামনে আনা হয় এবং অন্যগুলোকে নয়, তখন তা জনচেতনার মধ্যে একটি স্তরবিন্যাস গেঁথে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে—যা অনিচ্ছাকৃত হলেও এই ইঙ্গিত দেয় যে, কিছু সম্প্রদায়ের দুর্ভোগ অন্যদের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
দেশের প্রত্যেক লাইসেন্স ফি প্রদানকারীর অর্থে বিবিসি পরিচালিত হয়, যার মধ্যে প্রায় চল্লিশ লক্ষ ব্রিটিশ মুসলিমও রয়েছেন। তাদের সকলের প্রতি বিবিসির একটি দায়িত্ব রয়েছে।
- ফয়সাল হানিফ: সেন্টার ফর মিডিয়া মনিটরিং-এর একজন মিডিয়া বিশ্লেষক এবং তিনি পূর্বে টাইমস ও বিবিসি-তে সংবাদ প্রতিবেদক ও গবেষক হিসেবে কাজ করেছেন। সূত্র: ‘মিডল ইস্ট আই’-এর ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

