বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি এবং দীর্ঘসূত্রতায় আটকে থাকা মামলা। আদালতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে থাকার কারণে যেমন ঋণ আদায় ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি আর্থিক খাতে শৃঙ্খলাও দুর্বল হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতায় ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে দ্রুত, কার্যকর ও ফলপ্রসূ করতে ব্যাংকের আইন বিভাগকে শক্তিশালী করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।
বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট জারিকৃত বিআরপিডি সার্কুলার নং–১৪ এর মাধ্যমে ব্যাংকসমূহকে আইন বিভাগ শক্তিশালী করার বিষয়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে। এ নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হলো—মামলা ব্যবস্থাপনা আধুনিক করা, তামাদি প্রতিরোধ করা, ঋণ পুনরুদ্ধার বাড়ানো এবং আইনগত ঝুঁকি কমানো।
আইন বিভাগ কেবল মামলা পরিচালনার দপ্তর নয়
অনেকের ধারণা, ব্যাংকের আইন বিভাগ শুধু আদালতে মামলা পরিচালনার কাজ করে। বাস্তবে বিষয়টি এর চেয়ে অনেক বিস্তৃত। একটি দক্ষ আইন বিভাগ হলো ব্যাংকের ঋণ পুনরুদ্ধারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
একটি শক্তিশালী আইন বিভাগ—
- খেলাপি ঋণ আদায়ে গতি আনে,
- মামলা দায়েরে বিলম্ব কমায়,
- তামাদি প্রতিরোধ করে,
- দুর্বল ঋণ নথিপত্র শনাক্ত করে,
- এবং ব্যাংকের আইনগত ঝুঁকি হ্রাস করে।
অর্থাৎ, আইন বিভাগ শুধু প্রতিক্রিয়াশীল নয়; বরং এটি একটি প্রতিরোধমূলক ও কৌশলগত বিভাগ। ব্যাংকের বিভিন্ন প্রকার আইনগত বিষয়াদি সহ লিগ্যাল ডিপার্টমেন্টের প্রধানকে চিফ লিগ্যাল অফিসার (সিএলও) হিসেবে উপরোক্ত সার্কুলারে সম্বোধন করা হয়েছে।
চিফ লিগ্যাল অফিসার (সিএলও)-এর ভূমিকা
একজন চিফ লিগ্যাল অফিসার (সিএলও)-এর দায়িত্ব কেবল আইন জানা নয়; বরং ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনা, ঋণ কার্যক্রম, দলিলপত্র, ঝুঁকি বিশ্লেষণ এবং পুনরুদ্ধার কৌশল সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকা অত্যন্ত জরুরি।
কারণ, ব্যাংকিং কার্যক্রম না বুঝে শুধুমাত্র আইনগত জ্ঞান দিয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ সম্ভব নয়। একজন দক্ষ চিফ লিগ্যাল অফিসার (সিএলও) আগেই সম্ভাব্য ঝুঁকি শনাক্ত করতে পারেন এবং ভবিষ্যতের জটিলতা প্রতিরোধে কার্যকর পরামর্শ দিতে পারেন।
তিনি আইন বিভাগের কাঠামো তৈরি করবেন, মামলা পর্যবেক্ষণ ইউনিট গঠন করবেন, মামলা তামাদি প্রতিরোধ কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, আদালতভিত্তিক মামলাগুলোর তদারকি করবেন, তদন্ত সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করবেন এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য কৌশলগত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন। এ সকল কিছুই প্রতি মাসে বোর্ডকে অবহিত করবেন।
তামাদি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন
ব্যাংকিং খাতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়গুলোর একটি হলো মামলা দায়েরে বিলম্বের কারণে ঋণ তামাদিতে পরিণত হওয়া।
প্রতিমাসে যেসব ঋণ মামলা দায়েরযোগ্য অবস্থায় পৌঁছেছে কিংবা তামাদির ঝুঁকিতে রয়েছে, সেসব হিসাবের তালিকা পরিচালনা পর্ষদ ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করা চিফ লিগ্যাল অফিসার (সিএলও)-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩–এর ৪৬ ধারায় যথাসময়ে মামলা দায়ের না হলে আদালত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট ব্যাখ্যা চাইতে পারে। এমনকি দায়িত্বে অবহেলার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও গ্রহণ করতঃ ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে আদালতকে অবহিত করতে হবে মর্মে আইন করা হয়েছে। তাই তামাদি প্রতিরোধে কঠোর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন অত্যন্ত জরুরি- যা ব্যাংকের সিএলও তদারকি করবেন।
দুর্বল নথিপত্র দ্রুত শনাক্ত করা
অনেক ক্ষেত্রে অসম্পূর্ণ বা দুর্বল দলিলপত্রের কারণে মামলা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফলে ঋণ পুনরুদ্ধার বাধাগ্রস্ত হয়।
একজন দক্ষ চিফ লিগ্যাল অফিসার (সিএলও)-এর দায়িত্ব হবে—
- দুর্বল নথিপত্র দ্রুত শনাক্ত করা,
- পরিচালনা পর্ষদকে বিষয়টি অবহিত করা,
- এবং দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও কীভাবে কৌশলগতভাবে মামলা পরিচালনা করলে ঋণ পুনরুদ্ধার সম্ভব, সেই পথ নির্ধারণ করা।
কারণ, শুধু মামলা দায়ের করাই যথেষ্ট নয়; মামলা জয়ের জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত ও কৌশলগত আইন ব্যবস্থাপনাও জরুরি।
প্রযুক্তিনির্ভর মামলা ব্যবস্থাপনা এখন অপরিহার্য
বর্তমান সময়ে কাগজনির্ভর মামলা ব্যবস্থাপনা আর কার্যকর নয়। প্রতিটি ব্যাংকে ডিজিটাল মামলা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
এর মাধ্যমে—
- কোন মামলা কোন পর্যায়ে রয়েছে,
- কোথায় বিলম্ব হচ্ছে,
- কোন আইনজীবীর কার্যকারিতা কেমন,
- এবং কতটুকু ঋণ পুনরুদ্ধার হয়েছে—
এসব তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে জানা সম্ভব হবে যদি ব্যাংকে ডিজিটাল মামলা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয় ।
এছাড়া অঞ্চলভিত্তিক মামলা পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করলে মাঠ পর্যায়ে জবাবদিহিতা আরও বাড়বে। এজন্য উক্ত সার্কুলারে ঢাকা ও চট্টগ্রামে দুটো আঞ্চলিক ইউনিট গঠনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বাধীন আইনগত মতামত সংগ্রহ
চিফ লিগ্যাল অফিসার যেহেতু ব্যাংকের একজন কর্মচারী, তাই অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্বাধীন আইনগত মতামত দিলেও তা গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু তাই নয় মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে তিনি ব্যাংকের পক্ষে মামলা পরিচালনাও করতে পারেন না । কারণ বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ক্যাননস অব প্রফেশনাল কনডাক্ট এন্ড এটিকেট এর ৪নং চাপ্টারের ৮ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে “একজন আইনজীবী (এডভোকেট) সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী অন্য কোনো পেশা বা ব্যবসায় নিয়োজিত থাকতে পারবেন না; কিংবা এ ধরনের কোনো পেশা বা ব্যবসার সঙ্গে সক্রিয় অংশীদার, বেতনভুক্ত কর্মকর্তা বা কর্মচারী হিসেবেও যুক্ত থাকতে পারবেন না “। [chapter 4 clause 8 of the Canons of Professional Conduct & Etiquette quotes – ‘An Advocate should not as a general rule carry on any other profession or business, or be an active partner in or a salaried official or servant in connection with any such profession or business.]
তাই যে কোন চাকুরি করার আগে আইনজীবিকে অবশ্যই তার লাইসেন্স সারেন্ডার করে আসতে হবে। কারণ আইন মান্য করা আইনজীবীর প্রধান দায়িত্ব। একইসঙ্গে আইন পেশার নৈতিকতা অনুযায়ী চাকরিতে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তির সক্রিয়ভাবে আইন পেশায় যুক্ত থাকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্ট আইন ও পেশাগত নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
একজন চিফ লিগ্যাল অফিসার (সিএলও) মূলত একজন আইন ব্যবস্থাপক, যার প্রধান কাজ হলো ব্যাংকের ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে আরও গতিশীল ও কার্যকর করা।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতকে স্থিতিশীল রাখতে হলে প্রতিটি ব্যাংকে দক্ষ, অভিজ্ঞ ও প্রযুক্তিবান্ধব আইন বিভাগ গড়ে তুলতে হবে। একইসঙ্গে এমন চিফ লিগ্যাল অফিসার (সিএলও) প্রয়োজন, যিনি শুধু আইন জানেন না—ব্যাংকিং কার্যক্রম, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং ঋণ পুনরুদ্ধারের বাস্তব অভিজ্ঞতাও রাখেন।
কারণ, শক্তিশালী আইন বিভাগ মানেই শক্তিশালী ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থা; আর কার্যকর ঋণ পুনরুদ্ধারই একটি সুস্থ ও টেকসই ব্যাংকিং ব্যবস্থার ভিত্তি।
লেখক—কাজী মাহমুদুর রহমান
ইভিপি ও চিফ লিগ্যাল অফিসার, ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি।

