প্রতি রবিবার হেঁটে হেঁটে হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সামনে যাই। ওখান থেকে ট্রেন ধরি। চার্লস নদীর কাছে যাই। আজও হাঁটা দিলাম। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সামনে বেঞ্চে বসলাম। ফেসবুকে ঢুকে দেখি ঢাকার বিখ্যাত ট্রায়াল আইনজীবী অ্যাডভোকেট আমিনুল গনি টিটো স্যার মারা গেছেন।
ঢাকা বারে আমার ইনটিমেশন সিনিয়র এহসানুল হক সমাজী স্যার। কিন্তু ট্রায়াল শিখছি টিটো স্যারের কাছে। তখন ২০১৫ সাল। এলএলবি শেষ। বন্ধুদের অধিকাংশ তখন জাজ অথবা বিসিএস ক্যাডার। আমি চাইলাম ট্রায়াল ল’য়ার হইতে। কাছের বড় ভাই প্রকাশ বিশ্বাস দা আমাকে টিটো স্যারের কাছে নিয়ে গেল।
স্যারের প্রথম প্রশ্ন—‘আইন পেশায় আমি আটাশ বছর। এখনো প্রত্যেকটা খুনের মামলার জেরার আগে আমি ৩০২ ধারা পড়ি। কেন?’ আমি উত্তর দিতে পারলাম না। স্যার একটা কবিতা পড়ল। নিজের লেখা। তারপর কইল—সিআরপিসি আর পেনাল কোড সাহিত্য আর ধর্মগ্রন্থের মতো। যতবার পড়বা ততবার নতুন মিনিং বের হবে। নতুন মিনিং মানে আইনজীবীর হাতে নতুন অস্ত্র। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার অস্ত্র।
ঐ প্রথম দেখা। প্রথম কথা। তারপর বহু বছর স্যারের সাথে ছিলাম। আমার আলাদা একটা ডায়রি ছিল। শুধু স্যারের জেরা টুকে রাখার জন্য। একদিন স্যার একটা ফাইল ধরায়ে দিল। কইল —মহানগর কোর্টে গিয়ে বলবা সিনিয়র অন্য কোর্টে। না শুনলে কোর্টের অনুমতি নিয়ে জেরা শুরু করবা। আমি ইতস্তত করলাম। স্যার মোবাইল বের করল। একটা কবিতা পড়ল। নিজের লেখা। তারপর কইল —‘জ্ঞান না, মানুষকে চালায় সাহস। তুমি অনেক আইন জানো। সাহস নাই। ঐ আইন জেনে লাভ নাই।’
দুরুদুরু বুকে কোর্টে গেলাম। মামলা ডাকার পর বললাম, সিনিয়র টিটো স্যার অন্য কোর্টে। জজসাব নথি পাশে রেখে দিলেন। আলাদা করে। ঢাকা কোর্টের অনেক জজসাব টিটো স্যারের জেরার জন্য অপেক্ষা করত। শিখত— আর্ট অব ক্রস-এক্সামিনেশন কি জিনিস। একজন আইনজীবীর দুই ধরনের সন্তান থাকে। বায়োলজিক্যাল—নিজের সন্তান। নন-বায়োলজিক্যাল—জুনিয়র। নিজের সন্তান শরীরের জিন বয়ে বেড়ায়। জুনিয়র বয়ে বেড়ায় নাম আর অর্জন। এই জন্যই এইটা লিগাসি। এইটা এখনো গুরুবিদ্যা-নির্ভর।
মাহমুদুল ইসলাম স্যার মারা গেছেন কিন্তু এখনো বেঁচে আছেন। আমাদের কাছে। আদালতের প্রত্যেকটা শুনানিতে। কারণ তার জুনিয়র প্রবীর নিয়োগী স্যার আছেন। পরশু হয়তো প্রবীর নিয়োগী স্যার মারা যাবেন। তারপরও মাহমুদুল ইসলাম স্যার থাকবেন। কারণ ঐ চেম্বারে হয়তো আরেকজন প্রবীর নিয়োগী তৈরি হচ্ছে।
এইটাই লিগাসি। কোটি কোটি টাকা না। মন্ত্রিত্ব না। এমনকি রাষ্ট্রপতিত্বও না। একজন আইনজীবীর সবচেয়ে বড় অর্জন—যোগ্য জুনিয়র তৈরি করা। এতক্ষণে হয়তো টিটো স্যারের জানাজা শুরু হয়ে গেছে। ঢাকা মহানগর দায়রা জজ কোর্ট চত্বরে। বটগাছের নিচে। যেখানে আমাদের প্রথম দেখা। আমি বসে আছি বস্টনে। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের সামনে। কাঠের বেঞ্চে। রোদ নাই। আকাশ ভারী। মেঘ জমছে।
এইখান থেকে প্রতি রবিবার আটটার ট্রেনে উঠি। চার্লস নদীর কাছে যাই। আজ চার্লস নদী যাব না। রিভারওয়ে স্ট্রিট যাব না। আমার প্রিয় ব্রিগহাম গ্রেভইয়ার্ড যাব না। আজ কোথাও যাব না। বসে থাকব। এইখানে। ওক গাছের নিচে। মাথার উপর কালো মেঘ নিয়ে। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টির ভেতর। দেখব, কীভাবে আমার প্রিয় ট্রেন আমাকে রেখে চলে যায়। যেভাবে আজ ঢাকা জজ কোর্টের বটগাছ দেখবে প্রিয় টিটো স্যারের চলে যাওয়া।
- লেখক: ফেরদৌস হোসেন, বস্টন, যুক্তরাষ্ট্র।

