ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনা (ডিআইপি), যদিও ব্রিটেনের সম্মুখীন অভূতপূর্ব নিরাপত্তা হুমকির একটি জরুরি প্রতিক্রিয়া হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনের চেয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অপরিহার্যতার কথাই বেশি বলে।
এই বিপুল সামরিক ব্যয়ের ঘোষণাগুলো বরাবরই, অনেকাংশে, প্রকৃত প্রতিরক্ষার চেয়ে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্যই পরিকল্পিত হয়েছে, কিন্তু ডিআইপি সুস্পষ্টভাবেই রাজনৈতিক কূটকৌশলের ফল।
তীব্র তদবির এবং গণমাধ্যমে সপ্তাহব্যাপী সমন্বিত প্রচারণার পর ৩০শে জুন ব্যাপক ঢাকঢোল পিটিয়ে উন্মোচিত হওয়া এই পরিকল্পনাটিতে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের (এমওডি) বিশাল গহ্বরে আরও ১৫ বিলিয়ন পাউন্ড (২০ বিলিয়ন ডলার) ঢেলে দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে; এটি তাদের চাওয়া ২৮ বিলিয়ন পাউন্ডের (প্রায় ৩৭ বিলিয়ন ডলার) চেয়ে কম, কিন্তু অন্যান্য সরকারি দপ্তরের খরচে এমওডি যতই পাক না কেন, তা কখনোই যথেষ্ট বলে মনে হয় না।
সুতরাং, এটা সম্পূর্ণ অনুমেয় ছিল যে যুদ্ধবাজ সমালোচকরা অবিলম্বে এই বলে জবাব দেবেন যে নতুন এই নিষ্পত্তি অপর্যাপ্ত এবং আরও অর্থ ব্যয় করা উচিত, এবং বাস্তবে তারা তা করেছিলেনও।
তবে, অস্ত্র খাতে উচ্চতর ব্যয়ের চাহিদার কোনো সুস্পষ্ট ঊর্ধ্বসীমা নেই, যদিও এখন পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে যে ২০৩০ সালের মধ্যে এটি বার্ষিক ৮০ বিলিয়ন পাউন্ড (১০৭ বিলিয়ন ডলার)-এ পৌঁছাবে।
একটি শক্তিশালী এজেন্ডা নির্ধারণ ক্ষমতা
গত মাসে প্রতিরক্ষা সচিব জন হিলি এবং সশস্ত্র বাহিনী মন্ত্রী আল কার্নস তাঁদের পদ থেকে পদত্যাগ করেন ; যেহেতু তাঁরা জানতেন যে প্রধানমন্ত্রী ও লেবার নেতা হিসেবে স্টারমারের দিন ফুরিয়ে এসেছে, তাই এটি ছিল তাঁর উত্তরসূরি অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে উচ্চতর সামরিক ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করার উদ্দেশ্যে একটি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ।
বার্নহ্যাম বাধ্য হয়েই ফাঁদে পা দেন এবং নিশ্চিত করেন যে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাজেট বাড়াতে তিনি জনকল্যাণমূলক ব্যয় কমাতে সত্যিই প্রস্তুত থাকবেন।
ডাউনিং স্ট্রিটে যেই থাকুক না কেন, সামরিকবাদীরা সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দেখিয়ে দিয়েছে যে এজেন্ডা নির্ধারণে তাদের শক্তিশালী ক্ষমতা এখনও রয়েছে।
সমমনা রাজনীতিবিদ, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক নেতা এবং সহানুভূতিশীল সাংবাদিকদের ধারাবাহিক গণমাধ্যম প্রচারণার ফলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির এই প্রস্তাব—নির্দিষ্টভাবে এর প্রয়োজন কী হতে পারে এবং এটি প্রকৃত কোন প্রতিরক্ষা উদ্দেশ্য পূরণ করবে—এইসব প্রশ্ন তোলাও অবৈধ হয়ে পড়ে এবং ভদ্র আলাপচারিতা থেকে বাদ পড়ে যায়।
কিন্তু এই সুস্পষ্ট প্রশ্নগুলো জিজ্ঞাসা করা প্রয়োজন।
‘পশুসুলভ রুশ’ বা অন্য যেই হোক না কেন, তারা নিরীহ ব্রিটিশ শহর ও নগরগুলোতে তাণ্ডব চালাবে— এমন সব আতঙ্ক ছড়ানো এবং বীভৎস কল্পনা সত্ত্বেও , মন্ত্রীরা এখনও সুনির্দিষ্ট প্রতিরক্ষা লক্ষ্য এবং অতিরিক্ত অর্থ কীভাবে তা পূরণ করবে, তা স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করতে হিমশিম খাচ্ছেন।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে নিয়মমাফিক অতিরিক্ত শত শত কোটি টাকা ঢেলে দেওয়া হয়, কিন্তু এর ক্রয় প্রক্রিয়ার অন্তর্নিহিত অগ্রাধিকারগুলো কার্যকর নিরীক্ষা থেকে আড়ালে থেকে যায়।
অস্ত্র খাতে ব্যয় বৃদ্ধির সমর্থকদের পক্ষ থেকে বারবার যে যুক্তিটি দেওয়া হয়, তা হলো এটি দেশীয় উৎপাদন এবং দক্ষতাকে সমর্থন করে ।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, ডিআইপি আবারও মার্কিন কৌশলগত অগ্রাধিকারের কাছে ব্রিটেনের অব্যাহত পরাধীনতাকেই প্রতিফলিত করে: এর থেকে প্রাপ্ত আয়ের একটি বড় অংশ সরাসরি মার্কিন অস্ত্র নির্মাতাদের কাছে যাবে, আর একারণেই ওয়াশিংটন তার ন্যাটো অধীনস্থ দেশগুলোকে সামরিক ব্যয় বাড়ানোর জন্য ক্রমাগত দাবি জানিয়ে আসছে।
উদাহরণস্বরূপ, ডিআইপি-এর অধীনে ব্রিটেন লকহিড মার্টিনের কাছ থেকে আরও ১২টি মার্কিন-নির্মিত এফ-৩৫এ যুদ্ধবিমান ক্রয় করবে। এগুলো এমন সাধারণ বিমান নয় যা ব্রিটেন ঘটনাক্রমে বিদেশ থেকে কিনেছে; বরং এগুলো একটি মার্কিন-কেন্দ্রিক সরবরাহ ও সফটওয়্যার কাঠামোর সঙ্গে অঙ্গীভূত।
এগুলো এমন প্রযুক্তিতে চলে যা কেবল যুক্তরাষ্ট্রই সচল ও হালনাগাদ রাখতে পারে, ফলে প্রাথমিক ক্রয়ের পর কয়েক দশক ধরে আমেরিকানদের ওপর এই নির্ভরশীলতা স্থায়ী হয়ে যায়।
স্টারমারের পরিকল্পনা এটাও নিশ্চিত করে যে ট্রাইডেন্টের জন্য একটি নতুন ‘সার্বভৌম ওয়ারহেড’ তৈরি করা হবে, কিন্তু বাস্তবে এর কী প্রভাব পড়বে তা স্পষ্ট নয়, কারণ এই ব্যবস্থাটি – যদিও আনুষ্ঠানিক ভাবে একে ‘স্বাধীন পারমাণবিক প্রতিরোধক’ বলা হয় – সম্পূর্ণরূপে মার্কিন সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল।
যাই হোক, এটা একেবারেই অকল্পনীয় যে কোনো ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হোয়াইট হাউসে তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে আলোচনা না করে এটি কখনো প্রয়োগ করবেন।
একটি বিদ্বেষপূর্ণ পদক্ষেপ
তাই, ন্যাটোর মহাসচিব হিসেবে মার্ক রুটের উত্তরসূরি হতে কিয়ার স্টারমারের আগ্রহের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো এই ঘোষণাটিকে বেশ ভিন্ন আঙ্গিকে উপস্থাপন করছে।
ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের পরিবর্তে, ডিআইপি-কে স্টারমারের ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের পরবর্তী ধাপের জন্য একটি অডিশন এবং তার ভবিষ্যৎ নিয়োগকর্তাদের প্রভাবিত করার একটি প্রচেষ্টা বলেই বেশি মনে হচ্ছে।
প্রকৃতপক্ষে, সম্মুখ রাজনীতিতে আসার আগে ও সেই সময়ে তাঁর কর্মজীবনের দিকে এক ঝলক তাকালেই স্পষ্ট হয়ে যায় যে, স্টারমার দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন স্বার্থের প্রতি বিশ্বস্ত ও আন্তরিকভাবে অনুগত ছিলেন।
ডিআইপি অ্যান্ডি বার্নহামের জন্য স্টারমারের একটি বিদায়ী উপহারও বটে, যা বার্নহাম এবং তিনি যাকে চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দেবেন—মনে হচ্ছে তিনি বর্তমান চ্যান্সেলর র্যাচেল রিভস হবেন না —তাদের জন্য ৪.৭ বিলিয়ন পাউন্ড (প্রায় ৬ বিলিয়ন ডলার) ঘাটতি পূরণের একটি চ্যালেঞ্জ রেখে গেছে, যা সম্ভবত উচ্চতর কর বা ব্যয় হ্রাসের মাধ্যমে মেটাতে হবে।
বার্নহাম সম্পর্কে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি যাই হোক না কেন, এটি একটি বিদ্বেষপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি স্টারমারের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক উচ্চমার্গের বাগাড়ম্বর এবং তাঁর সংকীর্ণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের বাস্তবতার মধ্যকার বিশাল ফারাককেও উন্মোচিত করে, যা লেবার পার্টিতে তাঁর নেতৃত্বের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।
পচতে দেওয়া হয়েছে
সামরিক ব্যয় বৃদ্ধির সাথে কিছু অনিবার্য সীমাবদ্ধতাও জড়িত, যেমন অস্ত্র খাতে ব্যয় বৃদ্ধির অর্থায়নের জন্য পরিবহন অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে কাটছাঁট করা হচ্ছে ।
বছরের পর বছর ধরে ব্যয় সংকোচনের ফলে এনএইচএস (NHS) সহ জনসেবাগুলো সংকট অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে স্থানীয় কর্তৃপক্ষগুলোও তীব্র আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে।
ব্রিটিশ জনসংখ্যার বয়স বাড়ার সাথে সাথে সামাজিক সেবা খাতে তহবিলের দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতি রয়ে গেছে। অপরদিকে, উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা অবহেলায় নষ্ট হতে দেওয়া হচ্ছে।
তা সত্ত্বেও, বর্ধিত অস্ত্র ব্যয়ের জন্য আরও ১৫ বিলিয়ন পাউন্ডের জোগান পাওয়া সম্ভব হয়েছে, অথচ মন্ত্রী, ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা এবং অধিকাংশ গণমাধ্যম সবাই মিলে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে এ বিষয়ে প্রশ্ন তোলাকেও গুরুত্বহীন, এমনকি প্রায় রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে চিত্রিত করা হয়; যা সম্ভবত তাদের যুক্তির অন্তর্নিহিত দুর্বলতা নিয়ে তাদের নিজেদের মধ্যেকার এক ধরনের উদ্বেগেরই ইঙ্গিত দেয়।
এই সবকিছু ব্রিটিশ রাজনীতির এক বৃহত্তর ব্যাধিকে তুলে ধরে। প্রতিরক্ষা নীতি গণতান্ত্রিক বিতর্ক থেকে বিচ্ছিন্ন থেকেছে, এবং ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক বিশেষাধিকার ও অভিজাতদের পেশাগত স্বার্থ দ্বারা চালিত হচ্ছে।
প্রতিরক্ষার প্রকৃত চাহিদা নিয়ে বিতর্কটি যতক্ষণ না প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত প্রতিটি ব্যয় পর্যালোচনা কেবল অস্ত্রের জন্য আরও অর্থের নতুন নতুন দাবিই তৈরি করবে, আর এদিকে দেশের সামাজিক কাঠামোর অবনতিও অব্যাহত থাকবে।
- টম ব্ল্যাকবার্ন: ম্যানচেস্টারের একজন লেখক। ‘নিউ সোশ্যালিস্ট’-এর প্রতিষ্ঠাতা সহ-সম্পাদক হিসেবে তিনি ‘দ্য গার্ডিয়ান’, ‘ট্রিবিউন’ এবং ‘জ্যাকবিন’-এর মতো প্রকাশনায় লিখেছেন। সূত্র: মিডল ইস্টন আই

