বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরকে কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক সফর হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সফর বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতি, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করছে।
গত ২২ থেকে ২৪ জুন অনুষ্ঠিত সফরে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্পায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিস্তৃত আলোচনা হয়। এ সময় একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হলেও সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের বৈঠক।
বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেই নতুন কূটনৈতিক বার্তা:
বিশ্ব রাজনীতি এখন এক অস্থির সময় পার করছে। ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, ইরান-ইসরায়েল সংকট এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে শক্তির ভারসাম্যের প্রশ্নও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এমন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের সাম্প্রতিক অগ্রগতি স্বাভাবিকভাবেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ আগ্রহের বিষয় হয়ে উঠেছে।
আলোচনায় যেসব প্রকল্প:
সফরে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হলেও আগে আলোচিত সব কৌশলগত প্রকল্পের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। তবুও বিভিন্ন পর্যবেক্ষকের ধারণা, কিছু বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে নীতিগত সমঝোতা হয়েছে, যা ভবিষ্যতে বাস্তবায়নের দিকে এগোতে পারে। সম্ভাব্য উদ্যোগগুলোর মধ্যে রয়েছে মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, সেখানে চীনা বিনিয়োগ, নতুন শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা এবং বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়ানো।
আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নতুন অর্থনৈতিক করিডর:
সফরের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে চীনের প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর নিয়ে। এটি বাস্তবায়িত হলে তিন দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহন ও বাণিজ্যের নতুন পথ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক সংযোগেও গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসতে পারে। এ ধরনের করিডর বাংলাদেশের ভৌগোলিক সুবিধাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের সম্ভাব্য লাভ কোথায়?
করিডর বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দর, চট্টগ্রাম বন্দর, বে টার্মিনাল, মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর এবং সম্ভাব্য অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো আঞ্চলিক সরবরাহব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যবর্তী অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রাকৃতিক সংযোগসেতু হিসেবে বিবেচিত। সেই সুবিধাকে কাজে লাগানো গেলে দেশটি শুধু ট্রানজিট সুবিধা প্রদানকারী নয়, বরং আঞ্চলিক উৎপাদন ও সরবরাহ শৃঙ্খলের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রেও পরিণত হতে পারে। এর ফলে শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনাও তৈরি হবে।
এই করিডরের ধারণা পুরোপুরি নতুন নয়। ১৯৯০-এর দশকে কুনমিং ইনিশিয়েটিভের মাধ্যমে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডরের পরিকল্পনা সামনে আসে। সে সময় কলকাতা, ঢাকা, চট্টগ্রাম, মান্দালয় এবং কুনমিংকে একটি পরিবহন ও বাণিজ্য নেটওয়ার্কে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণে বিশেষ করে ভারতের অনীহার ফলে বিসিআইএম প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
বর্তমান প্রস্তাবকে অনেক বিশ্লেষক সেই ধারণার পরিবর্তিত রূপ হিসেবে দেখছেন। পার্থক্য হলো, এবার সম্ভাব্য কাঠামোয় ভারত নেই; বরং বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনকে নিয়ে একটি ত্রিপক্ষীয় করিডরের আলোচনা চলছে। যদিও আনুষ্ঠানিক রুট এখনো প্রকাশ করা হয়নি, বিভিন্ন বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে এটি বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে রাখাইন ও মান্দালয় হয়ে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
ভারতের উদ্বেগ কতটা বাস্তব?
প্রস্তাবিত করিডর নিয়ে ভারতের কৌশলগত মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এটি বাস্তবায়িত হলে বঙ্গোপসাগরে চীনের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত উপস্থিতি আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং ভারতের নিরাপত্তা হিসাবেও নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
তবে অন্য একটি মত বলছে, বিষয়টিকে শুধুমাত্র ভারতকে ঘিরে চীনের কৌশল হিসেবে দেখলে বাস্তবতার পুরো চিত্র উঠে আসে না। কারণ, চীন ইতোমধ্যেই মিয়ানমারের কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর, তেল-গ্যাস পাইপলাইন এবং চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেছে। ফলে বাংলাদেশ হয়ে নতুন করিডর গড়ে তোলার উদ্যোগকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করার অর্থনৈতিক প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
চীন যেমন আঞ্চলিক যোগাযোগ সম্প্রসারণে কাজ করছে, ভারতও একই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে। ‘অ্যাক্ট ইস্ট’ নীতির আওতায় ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড মহাসড়ক, কালাদান মাল্টিমোডাল ট্রানজিট প্রকল্প এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার যোগাযোগ বাড়ানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এ কারণে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের প্রকল্পকে কেবল ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিতে না দেখে এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নিরাপত্তা ও রোহিঙ্গা সংকট বড় চ্যালেঞ্জ:
সম্ভাব্য করিডরের একটি অংশ রাখাইন অঞ্চল দিয়ে যেতে পারে। বর্তমানে ওই অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি জটিল এবং সেখানে আরাকান আর্মির উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে চলমান রোহিঙ্গা সংকটও বড় একটি বাস্তবতা।
তাই যেকোনো বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মিয়ানমারের সামরিক সরকার এবং দেশটির বিভিন্ন প্রভাবশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীর ওপর চীনের উল্লেখযোগ্য প্রভাব রয়েছে। ফলে রাখাইনে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে বেইজিং ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই)-এর আওতায় বাস্তবায়িত কিছু প্রকল্প নিয়ে ঋণের চাপ, ব্যয় বৃদ্ধি, স্বচ্ছতার ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সে কারণে বাংলাদেশকেও সম্ভাব্য যেকোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে অর্থনৈতিক কার্যকারিতা, ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা, পরিবেশগত প্রভাব, স্থানীয় জনগণের স্বার্থ এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করতে হবে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ভারসাম্য বজায় রাখা। চীন দেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হলেও ভারত বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী এবং নিরাপত্তা ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সঙ্গেও বাংলাদেশের সম্পর্ক ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে।
এ অবস্থায় কোনো একক শক্তির প্রতিযোগিতার অংশ না হয়ে জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে বহুমুখী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করাই বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
- ● এম সাখাওয়াত হোসেন: সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা

