রাষ্ট্রের বার্ষিক বাজেট কেবল আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক দর্শন, উন্নয়ন কৌশল এবং ভবিষ্যৎ অগ্রযাত্রার রূপরেখা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং বিনিয়োগ—প্রায় প্রতিটি খাতের দিকনির্দেশনা নির্ধারিত হয় জাতীয় বাজেটের মাধ্যমে।
কিন্তু বাজেটের আকার যত বড় হয়, তার অর্থায়নের প্রশ্নও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ একটি উচ্চাভিলাষী বাজেট তখনই কার্যকর হয়, যখন তার অর্থের উৎস বাস্তবসম্মত, টেকসই এবং অর্থনীতির জন্য সহনীয় হয়।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক অর্থনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলেছে, যেখানে মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, রাজস্ব আদায়ের সীমাবদ্ধতা, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে নীতিনির্ধারকদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। একদিকে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে সরকারের ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে, অন্যদিকে সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ফলে আসন্ন জাতীয় বাজেটকে ঘিরে সবচেয়ে আলোচিত প্রশ্ন হয়ে উঠেছে—এই বিশাল ব্যয়ের অর্থ জোগান আসবে কোথা থেকে?
অর্থনীতির সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশের বাজেটে আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান থাকলে সেই ঘাটতি ঋণ, অনুদান বা অন্যান্য বৈধ অর্থায়ন উৎসের মাধ্যমে পূরণ করা হয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে ঘাটতির পরিমাণ যত বাড়ে, অর্থায়নের কৌশলও তত বেশি গুরুত্ব পায়। কারণ অর্থের উৎস সঠিকভাবে নির্বাচন করা না গেলে মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, সুদের হার এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে।
প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। বিপুল এই বাজেট বাস্তবায়নের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান বা বাজেট ঘাটতি। প্রস্তাবিত এই বিশাল বাজেটের বিপরীতে সরকারের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। তবে এই আয় দিয়ে পুরো ব্যয় নির্বাহ সম্ভব না হওয়ায় অবশিষ্ট অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে সরকারকে ঋণ ও অন্যান্য অর্থায়ন উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ ঘাটতির পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সরকারের নিজস্ব রাজস্ব ও অন্যান্য নিয়মিত আয় দিয়ে পুরো বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। ফলে অতিরিক্ত অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে বিকল্প উৎসের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এবারের বাজেটে ঘাটতি পূরণের ক্ষেত্রে সরকার সরাসরি নতুন মুদ্রা সৃষ্টির পথ বেছে নেয়নি। বরং অর্থায়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে রাখা হয়েছে অভ্যন্তরীণ ঋণ এবং বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তাকে। এর মাধ্যমে সরকার একদিকে উন্নয়ন কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে চায়, অন্যদিকে বাজারে অতিরিক্ত মুদ্রা সরবরাহের ফলে মূল্যস্ফীতি আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি এড়ানোর চেষ্টা করছে।
বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সরকার একাধিক অর্থায়ন উৎসকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ আসবে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ঋণের মাধ্যমে। বাজেটে ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের যুক্তি, উন্নয়ন প্রকল্প, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং চলমান সরকারি ব্যয় নির্বাহে এই অর্থায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
বৈদেশিক ঋণ, অনুদান এবং উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তাএকই সঙ্গে নিট বৈদেশিক ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৯ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা এবং এর বাইরে অনুদান বাবদ সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ৬ হাজার ১৫০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বহুপাক্ষিক ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় অংশীদারের কাছ থেকে এই অর্থ সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের ধারণা, তুলনামূলক কম সুদে এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিশোধ সুবিধাসহ বৈদেশিক অর্থায়ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়ক হবে।
বাজেট ঘোষণার সময় প্রায়ই একটি প্রশ্ন সামনে আসে—সরকার কি নতুন টাকা ছাপিয়ে বাজেটের ঘাটতি পূরণ করবে?এবারের বাজেটে এমন কোনো ঘোষণা নেই। অর্থাৎ সরাসরি নতুন মুদ্রা সৃষ্টি করে ব্যয় নির্বাহের পরিকল্পনা সরকার গ্রহণ করেনি। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকার যখন ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে, তখন তার প্রভাব অর্থের সরবরাহ, ব্যাংকগুলোর তারল্য এবং সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার ওপর পড়তে পারে। বিশেষ করে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্যের চাপ দেখা দিলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সহায়তার মাধ্যমে অর্থপ্রবাহে পরিবর্তন আসতে পারে। যদিও এটি সরাসরি নতুন টাকা ছাপানোর সমার্থক নয়। তবু অতিরিক্ত অর্থপ্রবাহ মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
এ কারণেই বাজেট অর্থায়নের ক্ষেত্রে শুধু কত টাকা সংগ্রহ করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং কীভাবে সেই অর্থ সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং তার অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব কী—সেটিও সমানভাবে বিবেচ্য। উন্নয়ন ব্যয় অব্যাহত রাখা যেমন জরুরি, তেমনি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করা এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখাও সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণ গ্রহণ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই প্রচলিত একটি অর্থনৈতিক পদ্ধতি। তবে ঋণের পরিমাণ, অর্থের ব্যবহার এবং তা পরিশোধের সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে এর ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব। ঋণ যদি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ হয়, তবে তা ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান বাড়িয়ে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকলে এবং তার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে তা অর্থনীতির জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করে।
বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বাজেট ঘাটতির বড় অংশ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও বৈদেশিক ঋণের মাধ্যমে পূরণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে স্বল্পমেয়াদে সরকারের অর্থায়নের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব হলেও অর্থনীতির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে এর প্রভাব পড়তে পারে।
সরকার যখন ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে, তখন একই ব্যাংক থেকে বেসরকারি উদ্যোক্তা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ঋণ পাওয়ার সুযোগ তুলনামূলকভাবে কমে যেতে পারে। অর্থনীতিতে এই পরিস্থিতিকে ‘ক্রাউডিং আউট’ (Crowding-out Effect) বলা হয়।
এর ফলে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, ব্যবসা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। বেসরকারি বিনিয়োগের গতি কমে গেলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্প্রসারণও ধীর হয়ে যেতে পারে। তাই বাজেট অর্থায়নের ক্ষেত্রে ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়।
মূল্যস্ফীতি বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম বড় উদ্বেগের বিষয়। এমন অবস্থায় বাজেট অর্থায়নের ধরনও মূল্যস্ফীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনীতিতে ঋণ ও অর্থপ্রবাহ বেড়ে গেলে মানুষের হাতে ব্যয়যোগ্য অর্থের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়। কিন্তু একই সময়ে যদি উৎপাদন ও পণ্যের সরবরাহ সেই হারে না বাড়ে, তাহলে অতিরিক্ত চাহিদার কারণে বাজারে পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করে। এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষের ওপর, কারণ তাদের আয়ের তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ব্যয় দ্রুত বেড়ে যায়।
এ কারণেই অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, বাজেট বাস্তবায়নের পাশাপাশি উৎপাদন, সরবরাহব্যবস্থা এবং বাজার ব্যবস্থাপনাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু অর্থের জোগান বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
বাজেট ঘাটতি পূরণে সরাসরি নতুন টাকা ছাপানোর পরিকল্পনা না থাকলেও বিষয়টি অর্থনৈতিক আলোচনায় বারবার উঠে আসে। কারণ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ সরবরাহের সুযোগ সৃষ্টি হলে বাজারে তারল্য বেড়ে যেতে পারে।
অর্থনীতির একটি মৌলিক নীতি হলো—শুধু টাকা সৃষ্টি করলেই সম্পদ সৃষ্টি হয় না। প্রকৃত সম্পদ তৈরি হয় উৎপাদন, সেবা, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের মাধ্যমে। যদি উৎপাদন না বাড়িয়ে অর্থের পরিমাণ বাড়ানো হয়, তাহলে একই পরিমাণ পণ্য ও সেবার বিপরীতে বেশি অর্থ বাজারে ঘুরতে থাকে। এর ফল হিসেবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক ভারসাম্যে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই অধিকাংশ দেশই বাজেট ঘাটতি পূরণে সরাসরি নতুন মুদ্রা সৃষ্টির পরিবর্তে রাজস্ব বৃদ্ধি, ঋণ ব্যবস্থাপনা এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে।
ঋণ গ্রহণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এর সুদ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা। সরকার যত বেশি ঋণ গ্রহণ করবে, ভবিষ্যতে তত বেশি অর্থ সুদ ও আসল পরিশোধে ব্যয় করতে হবে। এর ফলে জাতীয় বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামো কিংবা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির পরিবর্তে ঋণ-সংশ্লিষ্ট ব্যয়ে চলে যেতে পারে। অর্থনীতিবিদদের মতে, যদি ঋণের অর্থ থেকে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল না আসে, তাহলে ভবিষ্যৎ বাজেটের ওপর এই চাপ আরও বাড়বে।
বাজেট অর্থায়নের সফলতা শুধু ঋণের পরিমাণের ওপর নির্ভর করে না; এটি ব্যাংকিং খাতের সক্ষমতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতার ঘাটতি ব্যাংকিং খাতের কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, ব্যাংকিং খাতকে আরও শক্তিশালী ও জবাবদিহিমূলক করা গেলে সরকার যেমন তুলনামূলক কম ঝুঁকিতে অর্থায়নের সুযোগ পাবে, তেমনি বেসরকারি খাতও প্রয়োজনীয় ঋণ পেয়ে উৎপাদন ও বিনিয়োগ বাড়াতে সক্ষম হবে। ফলে বাজেট অর্থায়নের চাপও অনেকাংশে ভারসাম্যপূর্ণ রাখা সম্ভব হবে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের বাজেট ঘাটতির অন্যতম প্রধান কারণ রাজস্ব আহরণের সীমিত সক্ষমতা। প্রতি বছর বাজেটের আকার বাড়লেও সেই অনুপাতে কর আদায় বাড়ছে না। ফলে উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং অবকাঠামো খাতে সরকারের ব্যয় নির্বাহের জন্য ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কর-জিডিপি অনুপাত কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে উন্নীত না হওয়ায় বাজেট অর্থায়নের চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল করের হার বৃদ্ধি করলেই রাজস্ব বাড়ে না; বরং করজাল সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, কর প্রশাসনের আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলাই রাজস্ব বৃদ্ধির কার্যকর উপায়। একই সঙ্গে অপ্রদর্শিত আয়কে করের আওতায় আনা এবং করদাতাদের জন্য সহজ ও স্বচ্ছ সেবা নিশ্চিত করাও জরুরি।
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় বাজেট প্রণয়ন করাই মূল চ্যালেঞ্জ নয়; বরং সেই বাজেটের অর্থায়ন কতটা বাস্তবসম্মত, টেকসই ও কার্যকর হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। বিশেষ করে মূল্যস্ফীতির চাপ, রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাজেট বাস্তবায়ন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবদ ড. আহসান এইচ. মনসুরের মতে, বর্তমান বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এর আকার নয়; বরং নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং ঘাটতি অর্থায়নের বাস্তব সক্ষমতা। তাঁর মতে, রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও বাস্তবে সেই লক্ষ্য অর্জন সহজ নয়। একই সঙ্গে বৈদেশিক ঋণ ও উন্নয়ন সহায়তার প্রত্যাশিত অর্থ সময়মতো না এলে বাজেট বাস্তবায়নে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের বাজেট অর্থায়নের অন্যতম দুর্বলতা হলো রাজস্ব আহরণের সীমিত সক্ষমতা। প্রতি বছর কর আদায়ে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অনেক সময় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। ফলে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে বাজেট ঘাটতি বেড়ে যায় এবং সেই ঘাটতি পূরণে সরকারকে অতিরিক্ত ঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়।
অর্থনীতিবিদদের পর্যবেক্ষণে, অভ্যন্তরীণ ঋণের বড় অংশ যদি ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে নেওয়া হয়, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের প্রাপ্যতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এতে নতুন শিল্প স্থাপন, ব্যবসা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি শ্লথ হতে পারে। একই সঙ্গে ঋণের চাহিদা বাড়লে সুদের হারের ওপরও চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বৈদেশিক অর্থায়ন নিয়েও বিশেষজ্ঞরা সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, আন্তর্জাতিক ঋণের পরিবর্তিত শর্ত এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের চাপের কারণে প্রত্যাশিত বৈদেশিক ঋণ ও সহায়তা অর্জন সব সময় সহজ হয় না। তাই বৈদেশিক অর্থায়নের ক্ষেত্রে ঋণের ব্যয়, সুদের হার, পরিশোধের সময়সীমা এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিভিন্ন অর্থনীতিবিদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাজেট ঘাটতি পূরণে ঋণ গ্রহণ অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি স্বাভাবিক অংশ। তবে সেই ঋণের অর্থ অবশ্যই উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় করা উচিত। অবকাঠামো, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্পায়ন এবং কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে ঋণের ইতিবাচক অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া সম্ভব। অন্যদিকে, অনুৎপাদনশীল ব্যয় বা অপচয়ে ঋণের অর্থ ব্যবহার করা হলে ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা বাড়লেও প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি পুনরুদ্ধার শুধু বাজেটের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংকিং খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। উৎপাদনশীল বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনতে না পারলে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জনসংখ্যাকে বোঝা নয়, দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা এবং কর্মসংস্থানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পেলে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব আয়ের ভিত্তিও আরও শক্তিশালী হবে।
সার্বিকভাবে অর্থনীতিবিদদের অভিমত হলো, বাজেটের সফলতা কেবল এর আকারের ওপর নির্ভর করে না; বরং অর্থায়নের উৎস কতটা টেকসই, রাজস্ব আহরণ কতটা বাস্তবসম্মত, ঋণের অর্থ কতটা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় কতটা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা যাচ্ছে—তার ওপরই বাজেটের সফলতা নির্ভর করে। এসব ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করা গেলে বাজেট অর্থায়ন আরও স্থিতিশীল হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঋণ কখনোই সমস্যা নয়; সমস্যা হলো ঋণের অদক্ষ ব্যবহার এবং এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা। তাই বাজেট অর্থায়নকে আরও টেকসই করতে কয়েকটি বিষয়ে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রথমত, করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়াতে হবে। কর ফাঁকি কমানো, কর প্রশাসনের ডিজিটাল রূপান্তর এবং করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি করলে সরকারের নিজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
দ্বিতীয়ত, সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, ব্যয় বৃদ্ধি এবং অপচয় কমাতে না পারলে ঋণের চাপ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্প বাছাইয়ের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক লাভ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদনশীলতাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কারকে আরও কার্যকর করতে হবে। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং ঋণ বিতরণে জবাবদিহি বাড়ানো গেলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। এতে সরকার ও বেসরকারি খাত—উভয়ের জন্যই অর্থায়নের পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে।
চতুর্থত, বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। তুলনামূলক কম সুদ, দীর্ঘ পরিশোধকাল এবং উৎপাদনশীল প্রকল্পে ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বৈদেশিক ঋণ অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে ঋণের অর্থ যদি কাঙ্ক্ষিত ফল না দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে সীমিত পরিসরে বাজেট ঘাটতি এবং ঋণনির্ভর অর্থায়ন স্বাভাবিক। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনীতি গড়ে তুলতে হলে রাজস্ব আয়ের ভিত্তি শক্তিশালী করা, উৎপাদন ও রপ্তানি বৃদ্ধি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় দক্ষতা বাড়ানোর বিকল্প নেই।
অর্থনীতির শক্তি কেবল বড় বাজেটের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সেই বাজেট কতটা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং অর্থের প্রতিটি টাকা কতটা উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর।
জাতীয় বাজেটের অর্থায়ন কৌশল স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করছে যে সরকার সরাসরি নতুন মুদ্রা সৃষ্টির পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সমন্বিত পথকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এটি তুলনামূলকভাবে সতর্ক ও বাস্তবসম্মত কৌশল হলেও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে মূল্যস্ফীতির চাপ, ঋণের সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, ব্যাংকিং খাতের ওপর চাপ এবং বেসরকারি বিনিয়োগের সম্ভাব্য সংকোচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি।
জাতীয় বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে ঘাটতির পরিমাণের ওপর নয়; বরং সেই ঘাটতির অর্থায়ন কতটা টেকসই, স্বচ্ছ ও উৎপাদনমুখীভাবে করা হচ্ছে, তার ওপর। টেকসই রাজস্বভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে পারলেই ঋণনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমবে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি আরও স্থিতিশীল ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে সক্ষম হবে।

