বাংলাদেশে ২০২৫ সালে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। টানা দুই বছর পতনের পর এই প্রবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে শুধু একটি বছরের উন্নত পরিসংখ্যানকে ভিত্তি করে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে এসেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো এখনই ঠিক হবে না। কারণ দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নির্ভর করে স্থিতিশীল নীতি, কার্যকর প্রতিষ্ঠান, শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থা এবং নির্ভরযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশের ওপর।
দুই বছর পর ঘুরে দাঁড়াল বিদেশি বিনিয়োগ:
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (আঙ্কটাড) প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ইনভেস্টমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বেড়েছে ৪৫ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এ সময়ে প্রবৃদ্ধির হার ছিল সর্বোচ্চ।
এই তথ্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে এর সঙ্গে আরও একটি বাস্তবতা জড়িয়ে আছে। বিদেশি বিনিয়োগের এই বৃদ্ধি কি সত্যিই নতুন বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধির প্রতিফলন, নাকি এটি মূলত পুরোনো বিনিয়োগকারীদের কার্যক্রমের ফল—এই প্রশ্নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু প্রবৃদ্ধির হার নয়, সেই প্রবৃদ্ধির উৎসও বিশ্লেষণ করা জরুরি।
পরিসংখ্যানের বাইরে যে বাস্তবতা:
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বর্তমানে অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি এবং জনসংখ্যা ১৭ কোটিরও বেশি। এত বড় বাজার হওয়া সত্ত্বেও ২০২৫ সালে দেশে এসেছে মাত্র ১ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ডলার সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ।
একই সময়ে উগান্ডা, ঘানা কিংবা কঙ্গোর মতো তুলনামূলক ছোট অর্থনীতিও সমপরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। এমনকি অর্থনৈতিক সংকটে থাকা পাকিস্তানও সামান্য ব্যবধানে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে গেছে।
অবশ্য বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো, খাতভিত্তিক বিনিয়োগ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে সরাসরি তুলনা সব ক্ষেত্রে উপযুক্ত নয়। তারপরও একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশকে সম্ভাবনাময় বাজার হিসেবে দেখা হলেও এখনো এটি বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের প্রথম সারির গন্তব্য হয়ে ওঠেনি। সেই কারণে মূল প্রশ্ন এখন বিদেশি বিনিয়োগ কেন বেড়েছে, সেটি নয়; বরং দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতার তুলনায় বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো এত সীমিত কেন।
২০২৫ সালের বিনিয়োগের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রবৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে আগে থেকেই বাংলাদেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা বিদেশি কোম্পানিগুলোর পুনঃবিনিয়োগ থেকে অর্থাৎ তারা অর্জিত মুনাফার একটি অংশ আবার বাংলাদেশেই বিনিয়োগ করেছে।
এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক। কারণ এতে বোঝা যায়, যারা ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ব্যবসা করছে, তারা এখনো এখানকার বাজার ও সম্ভাবনার ওপর আস্থা রাখছে। তবে এটিকে নতুন বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহের প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ নতুন প্রতিষ্ঠান এসে বড় আকারে বিনিয়োগ শুরু করেছে—এমন চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।
বিদেশি বিনিয়োগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয় গ্রিনফিল্ড বিনিয়োগকে। এই ধরনের বিনিয়োগে কোনো প্রতিষ্ঠান অন্য দেশে নতুন করে কারখানা, অফিস বা উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলে। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়, নতুন প্রযুক্তি আসে এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত হয় কিন্তু বাংলাদেশে এই ধরনের বিনিয়োগ এখনো প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়েনি।
বর্তমানে জিডিপির তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগের হার শূন্য দশমিক ৪ শতাংশেরও নিচে। দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতির জন্য এটি অত্যন্ত কম। ফলে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান একদিকে যেমন পুরোনো বিনিয়োগকারীদের আস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে, অন্যদিকে নতুন বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষার বার্তাও দিচ্ছে।
বিনিয়োগকারীরা শুধু বর্তমান নয়, ভবিষ্যৎও বিবেচনা করেন: কোনো বিদেশি কোম্পানি নতুন দেশে বিনিয়োগের আগে শুধু সম্ভাব্য মুনাফা হিসাব করে না। তারা মূল্যায়ন করে—
- আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে নীতিমালার ধারাবাহিকতা থাকবে কি না।
- সরকার পরিবর্তনের পরও চুক্তির সম্মান বজায় থাকবে কি না।
- বিচার ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য।
- ব্যাংকিং ব্যবস্থা কতটা স্থিতিশীল।
- বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে ঝুঁকি কতটা।
- ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় ও সময় কতটা।
আস্থা ফেরার পথে যেসব বাধা: বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর পথে এখনো কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
১. নীতির ধারাবাহিকতা: বিদেশি বিনিয়োগকারীরা করছাড় বা প্রণোদনার চেয়ে স্থিতিশীল নীতিকে বেশি গুরুত্ব দেন। তারা নিশ্চিত হতে চান, সরকার পরিবর্তন হলেও ব্যবসাবান্ধব নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন হবে না এবং আইনি সুরক্ষা বজায় থাকবে।
২. ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা:
খেলাপি ঋণের উচ্চ হার, সুশাসনের ঘাটতি এবং আর্থিক খাতের অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে দুর্বল করে। একটি শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা শুধু বিদেশি বিনিয়োগ নয়, দেশীয় উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগও বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. ব্যবসার পরিবেশ: বর্তমান বিশ্বে শুধু কম মজুরির শ্রমিক থাকলেই বিনিয়োগ আসে না। প্রয়োজন—
- নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি
- দক্ষ সমুদ্রবন্দর
- উন্নত সড়ক ও পরিবহন
- দ্রুত প্রশাসনিক সেবা
- ডিজিটাল সরকারি ব্যবস্থা
- স্বচ্ছ নিয়ন্ত্রক কাঠামো
৪. জ্বালানি নিরাপত্তা: আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বিনিয়োগকারীদের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি তৈরি করে। বিশ্ববাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়, যা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে।
ঋণ নয়, দীর্ঘমেয়াদে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিদেশি বিনিয়োগ:
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগের তুলনায় বৈদেশিক ঋণ দ্রুত বেড়েছে। ঋণ অবশ্যই উন্নয়নের একটি অর্থায়নের উৎস। তবে ঋণ নির্দিষ্ট সময়ে পরিশোধ করতে হয়।
অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে শুধু অর্থই আসে না, আসে প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা। এই কারণে দীর্ঘমেয়াদে বিদেশি বিনিয়োগ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী ভিত্তি দেয়।
দেশীয় বিনিয়োগই এখনো অর্থনীতির প্রধান চালিকা শক্তি:
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী বিদেশি প্রতিষ্ঠান নয়, বরং দেশের নিজস্ব উদ্যোক্তারা। জিডিপির প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে দেশীয় বেসরকারি বিনিয়োগ থেকে। বিপরীতে বিদেশি বিনিয়োগের অবদান শূন্য দশমিক ৪ শতাংশেরও কম।
এ কারণে দেশীয় উদ্যোক্তাদের আস্থা কমে গেলে তার প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে পড়ে। বর্তমানে বেসরকারি বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি স্থবির এবং বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহও আগের তুলনায় কম। এটি ইঙ্গিত দেয়, অনেক উদ্যোক্তা দীর্ঘমেয়াদি নতুন বিনিয়োগে এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন।
কর্মসংস্থানেও পড়ছে প্রভাব:
বিনিয়োগের গতি কমে গেলে তার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানে। প্রতিবছর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বের হলেও একই হারে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না।
বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণদের বেকারত্ব উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এখন শুধু অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির প্রশ্ন নয়; এটি কর্মসংস্থান ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
আস্থা ফিরিয়ে আনতে কী করতে হবে: বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে এখন কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।
প্রথমত, বিনিয়োগসংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও কার্যকর, দ্রুত এবং স্বচ্ছ করতে হবে। অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং একাধিক দপ্তরে ঘোরাঘুরির সংস্কৃতি কমাতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হবে।
তৃতীয়ত, অবকাঠামো, জ্বালানি, বন্দর, পরিবহন ও ডিজিটাল সরকারি সেবার মান উন্নত করতে হবে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
এলডিসি উত্তরণের আগে বড় সুযোগ:
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা আরও তিন বছর বাড়ানোর আবেদন করেছে সরকার। এই অতিরিক্ত সময়কে শুধু ক্যালেন্ডারের বাড়তি সময় হিসেবে দেখলে চলবে না। যদি এই সময়ে ব্যাংকিং খাত, সরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবসার পরিবেশ এবং বিনিয়োগবান্ধব সংস্কার বাস্তবায়ন করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশের বড় অভ্যন্তরীণ বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান বিদেশি বিনিয়োগের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে কিন্তু সম্ভাবনা থাকলেই বিনিয়োগ আসে না। বিনিয়োগকারীরা এমন পরিবেশ খোঁজেন, যেখানে নীতির ধারাবাহিকতা থাকবে, প্রতিষ্ঠানগুলো দক্ষতার সঙ্গে কাজ করবে এবং ব্যবসা পরিচালনায় অনিশ্চয়তা কম থাকবে।
২০২৫ সালের ইতিবাচক বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি তাই অবশ্যই আশাবাদের বার্তা বহন করে। তবে এটিকে চূড়ান্ত সাফল্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে সঠিক সংস্কার অব্যাহত রাখতে পারলে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে। সবশেষে বলা যায়, টেকসই বিনিয়োগের ভিত্তি গড়ে ওঠে শুধু ভালো অর্থনৈতিক সূচকের ওপর নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি আস্থার ওপর। আর সেই আস্থা অর্জন করাই এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
- লেখক: গোলাম রসুল, অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস, অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি, ঢাকা।

