মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং তেলের সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে উদ্বেগ তৈরি করলেও, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতি সত্তর দশকের তেল সংকটের পুনরাবৃত্তির মুখে রয়েছে—এমন আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে কম। বিশ্লেষকদের মতে, গত কয়েক দশকে জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে, যা বড় ধরনের ধাক্কার ঝুঁকি অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে।
সত্তর দশকের তেল সংকট থেকে ওপেকভুক্ত দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিয়েছে। সে সময় তেলকে রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হলেও, এর নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত উৎপাদক দেশগুলোকেও বহন করতে হয়েছিল। তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতির গতি কমে যায়, জ্বালানির চাহিদা হ্রাস পায় এবং একপর্যায়ে তেলের দামও নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। এ কারণে বর্তমানে সৌদি আরবসহ বড় উৎপাদক দেশগুলো প্রয়োজন হলে অতিরিক্ত সরবরাহের মাধ্যমে বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করে।
এদিকে গত কয়েক দশকে জ্বালানি খাতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বেড়েছে, নতুন নতুন উৎস থেকে তেল ও গ্যাস উত্তোলন শুরু হয়েছে এবং অনেক দেশ সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় কৌশলগত তেল মজুদ গড়ে তুলেছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রাকৃতিক গ্যাস ও পারমাণবিক শক্তির ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বিশ্ব অর্থনীতি আগের তুলনায় তেলের ওপর অনেক কম নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর বিনিয়োগ ও প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার। উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে এ প্রযুক্তি ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও কিছুটা কমাতে সহায়তা করছে। এর ফলে তেলের দাম বাড়লেও বিশ্ববাজারে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা যায়নি।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, পরিস্থিতি পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। যদি বর্তমান ভূরাজনৈতিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে রূপ নেয় এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়, তাহলে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন করে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দ্বৈত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে।
- নুরিয়েল রুবিনি: নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির স্টার্ন স্কুল অব বিজনেসের ইমেরিটাস অধ্যাপক

