বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার বিস্তার গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ইন্টারনেট ব্যাংকিং এবং ই-কমার্সের প্রসারের ফলে নগদ টাকার পাশাপাশি ডিজিটাল লেনদেনও মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠছে। এই ধারাবাহিকতায় জাতীয় পর্যায়ে একীভূত কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
গত ১ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক ‘বাংলা কিউআর’ চালু করে, যা দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই ব্যবস্থার লক্ষ্য হলো ব্যাংক ও মোবাইল আর্থিক সেবার মধ্যে সমন্বিত একটি পেমেন্ট প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা, যাতে একই কিউআর কোড ব্যবহার করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গ্রাহক সহজেই অর্থ পরিশোধ করতে পারেন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ বাংলা কিউআর:
কিউআর (Quick Response) কোড প্রযুক্তির যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৪ সালে জাপানের প্রতিষ্ঠান ডেনসো ওয়েভের মাধ্যমে। মূলত এটি ছিল একটি দ্বিমাত্রিক বারকোড প্রযুক্তি, যা পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে দ্রুত ও নিরাপদ ডিজিটাল লেনদেনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে বাংলা কিউআর চালুর আগে বিভিন্ন ব্যাংক ও এমএফএস প্রতিষ্ঠান নিজেদের পৃথক কিউআর কোড ব্যবহার করত। ফলে একজন ব্যবসায়ীকে একাধিক কিউআর কোড প্রদর্শন করতে হতো এবং গ্রাহককেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধ করতে হতো। এতে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধা সীমিত ছিল এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে আন্তঃপরিচালনযোগ্যতার অভাব স্পষ্ট ছিল।
নতুন ব্যবস্থায় সেই সীমাবদ্ধতা দূর হয়েছে। এখন অংশগ্রহণকারী যেকোনো ব্যাংক বা এমএফএসের গ্রাহক একই কিউআর কোড স্ক্যান করে মূল্য পরিশোধ করতে পারবেন। এতে ব্যবসায়ী ও গ্রাহক—উভয়ের জন্যই লেনদেন আরও সহজ হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলছে:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে একীভূত কিউআরভিত্তিক পেমেন্ট ব্যবস্থায় সফলতা পেয়েছে। ভারতের ইউপিআই কিউআর, থাইল্যান্ডের প্রম্পটপে, মালয়েশিয়ার ডুইটনাউ কিউআর এবং সিঙ্গাপুরের এসজিকিউআর এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ।
এসব দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, জাতীয় কিউআর ব্যবস্থা চালুর ফলে ডিজিটাল লেনদেনের পরিমাণ বেড়েছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের আর্থিক ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে এবং খুচরা অর্থনীতিতে নগদের ওপর নির্ভরতা কমেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কেবল প্রযুক্তি চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। শক্তিশালী ডিজিটাল অবকাঠামো, নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট, স্মার্টফোনের ব্যাপক ব্যবহার, ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ এবং জনগণের আস্থা—এসব বিষয় একসঙ্গে নিশ্চিত হলেই এমন উদ্যোগ সফল হয়।
বাংলাদেশের জন্য কেন সম্ভাবনাময়:
বাংলাদেশে স্মার্টফোন ব্যবহার এবং মোবাইল আর্থিক সেবার বিস্তার বাংলা কিউআরের জন্য ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করেছে। তবুও মুদি দোকান, কাঁচাবাজার, পরিবহন, ছোট ব্যবসা এবং দৈনন্দিন অধিকাংশ খুচরা লেনদেনে এখনো নগদ অর্থের ব্যবহারই বেশি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ২০২২ সালের খানা আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, একটি পরিবারের মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে ব্যয় হয়। অর্থাৎ দেশের সবচেয়ে বেশি খুচরা লেনদেন এই খাতেই সংঘটিত হয়, যেখানে ডিজিটাল পেমেন্টের বিস্তারের সুযোগও সবচেয়ে বেশি।
এছাড়া আবাসন, পোশাক, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবহন এবং অন্যান্য ভোক্তা ব্যয়েও ডিজিটাল লেনদেন ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফলে সামগ্রিকভাবে দেশের ভোক্তা অর্থনীতিকে আরও বেশি ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
একক কিউআরের বড় সুবিধা:
বাংলা কিউআরের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো আন্তঃপরিচালনযোগ্যতা। একটি কিউআর কোডের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী সব ব্যাংক ও এমএফএসের গ্রাহক অর্থ পরিশোধ করতে পারবেন। এর ফলে ব্যবসায়ীদের একাধিক কিউআর প্রদর্শনের প্রয়োজন থাকবে না। একই সঙ্গে গ্রাহকের জন্যও লেনদেন সহজ হবে। প্রতিটি লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড সংরক্ষিত হওয়ায় ব্যবসার হিসাব-নিকাশ আরও স্বচ্ছ হবে। ভবিষ্যতে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ গ্রহণ বা অন্যান্য আর্থিক সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রেও এই তথ্য সহায়ক হতে পারে।
যেসব চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে:
সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। ব্যবসায়ীদের জন্য মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট (এমডিআর) বেশি হলে তারা ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে অনাগ্রহী হতে পারেন। আবার উৎপাদন থেকে খুচরা বিক্রি পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে ডিজিটাল লেনদেন নিশ্চিত না হলে নগদ অর্থের ব্যবহার আগের মতোই থেকে যেতে পারে।
এ ছাড়া দীর্ঘদিনের নগদনির্ভর লেনদেনের অভ্যাস পরিবর্তন করতে জনসচেতনতা বাড়ানো, নিরাপদ লেনদেন নিশ্চিত করা এবং ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা তৈরি করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সফল বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন:
বাংলা কিউআরের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সরকার, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাণিজ্যিক ব্যাংক, মোবাইল আর্থিক সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যবসায়ীদের জন্য যৌক্তিক এমডিআর নির্ধারণ, নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলা, প্রয়োজনীয় প্রণোদনা প্রদান এবং সরকারি বিভিন্ন সেবায় বাংলা কিউআরের ব্যবহার বাড়ানো হলে এর গ্রহণযোগ্যতা দ্রুত বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে শহরের পাশাপাশি গ্রামীণ এলাকায়ও এই সেবা সহজলভ্য করতে পারলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি আরও শক্তিশালী হবে এবং ডিজিটাল অর্থনীতির সুফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছেও পৌঁছে যাবে।
নতুন যুগের পথে বাংলাদেশ:
২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকে কিউআর কোড ব্যবহারের প্রসারে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে কার্যকর বাস্তবায়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নীতিগত সহায়তা এবং সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণের ওপর। এসব বিষয় নিশ্চিত করা গেলে বাংলা কিউআর শুধু একটি পেমেন্ট ব্যবস্থা হিসেবেই নয়, বরং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
- শেখ আব্দুল বাকির: ব্যাংকার ও লেখক

