ফরাসি বিপ্লবের আগের পুরনো শাসকগোষ্ঠীর লোকজন যেমন কল্পনাও করতে পারেননি যে একদিন তাদের বংশগত উপাধি বিলুপ্ত হয়ে যাবে, তেমনি আজকের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় নেতাও এমন একটি পৃথিবীর কথা ভাবতে পারেন না, যেখানে তাদের দেয়া ডিগ্রি কেবল মূল্যহীন কাগজে পরিণত হবে।
গুগল, অ্যাপল ও আইবিএমের মতো টেক জায়ান্টরা এখন কর্মী নিয়োগে ডিগ্রির চেয়ে দক্ষতাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। অর্ধেকেরও বেশি প্রতিষ্ঠান কিছু পদে ডিগ্রির শর্তই তুলে দিয়েছে। নিয়োগদাতারা আর জানতে চান না আবেদনকারী কতটা মুখস্থ করেছে; তারা জানতে চান, অনিশ্চয়তার মধ্যে সে কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় এবং কত দ্রুত নতুন কিছু শিখতে পারে।
ওয়াই কম্বিনেটর তো আরেক কাঠি সরেস। তারা স্ট্যানফোর্ড থেকে ড্রপআউটদের অর্থায়ন করে। কারো গিটহাব প্রোফাইলে গ্রাহকরা তার কলেজের নম্বরপত্রের চেয়ে ওই ব্যক্তির সক্ষমতার অনুসন্ধান করে। তবে ডিগ্রি যে একেবারে অচল মাল হয়ে গেছে ব্যাপারটা এমন নয়। বেশকিছু খাত যেমন আইন ও চিকিৎসা পেশা কিংবা সরকারি চাকরির মতো মর্যাদাকেন্দ্রিক নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকারে সার্টিফিকেট গুরুত্ব রাখে। কিন্তু মনে রাখতে হবে তা দিয়ে কেবল প্রবেশই করা যায় কিন্তু সাফল্য ও সুনাম দক্ষতার।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) রূপান্তরিত পৃথিবীতে প্রকৃত বিভাজনরেখা হবে সক্ষমতা। সত্যি, একটি বিনামূল্যের এআই চ্যাটবট যে কাউকে কোয়ান্টাম মেকানিকস বুঝিয়ে দিতে পারে। কিন্তু কোনো প্রযুক্তির নাগাল পাওয়া আর সেটি দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারা এক বিষয় নয়। যারা কঠিন সমস্যা সমাধানে এআইকে কাজে লাগাতে পারবে এবং যারা কেবল এআইয়ের দেয়া উত্তর ভোগ করবে—এ দুই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে ব্যবধান দ্রুত বাড়ছে। আগামী দশকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হবে অর্কেস্ট্রেশন—অর্থাৎ একজন ব্যক্তির নির্ধারিত লক্ষ্য পূরণে একাধিক এআই এজেন্টকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করার ক্ষমতা।
এতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: শিক্ষায় এআই কি হুমকি, নাকি সুযোগ? আমার উত্তর—এটি একটি সুযোগ, তবে কেবল সেইসব প্রতিষ্ঠানের জন্য, যারা এআইকে কেন্দ্র করে নিজেদের নতুন করে গড়ে তুলতে প্রস্তুত। এর অর্থ হলো মূল্যায়ন পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন, কারণ এখন আর জ্ঞান পুনরুৎপাদন করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং বিচক্ষণতা, বিচারক্ষমতা এবং বাস্তব প্রয়োগের দক্ষতা প্রদর্শনই মুখ্য।
তাই পরীক্ষা হওয়া উচিত একজন শিক্ষার্থী এআই ব্যবস্থাকে কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা ও সমালোচনামূলকভাবে মূল্যায়ন করতে পারে, সে নিজের চিন্তাভাবনা পুরোপুরি এআইয়ের কাছে সমর্পণ করেছে কিনা, তা নয়। এ পরিবর্তন ঘটলে এআই শিক্ষার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সম্প্রসারণের হাতিয়ার হতে পারে। এতে ব্যক্তিকেন্দ্রিক টিউটরিংয়ে অতিরিক্ত ব্যয় কমবে। শিক্ষক মূল্যায়নের জন্য একদিন, এক সপ্তাহ বা এক মাস অপেক্ষা করতে হবে না। তাৎক্ষণিক মূল্যায়ন দিয়ে দেবে এআই।
ইউক্রেনের এসইটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। সেখানে আমার সাইবার নিরাপত্তা স্টার্টআপ আয়রনসাইবারের সঙ্গে যৌথভাবে একটি সরাসরি ড্রোন-হ্যাকিং সিমুলেশন পরিচালনা করা হয়েছিল। সেখানে এআই ব্যবহার করে কাজটি প্রায় ছয় গুণ দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়। প্রযুক্তিগত স্তরকে দ্রুততর করা যায়, কিন্তু অর্কেস্ট্রেশনের স্তরকে সংকুচিত করা যায় না। অথচ পুরনো শিক্ষা ব্যবস্থা, যা মূলত এআই-প্রতিরোধী কাঠামো মাথায় রেখে গড়ে উঠেছিল—এ বাস্তবতাই বুঝতে ব্যর্থ হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই জানে না তার প্রকৃত মূল্য কোথায়। ক্যাম্পাস, শিক্ষক এবং একাডেমিক প্রোগ্রামকে তারা নিজেদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বলে মনে করে। কিন্তু ডিজিটাল যুগে সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো তথ্য। একটি শিক্ষণ-প্লাটফর্মে শিক্ষার্থীর প্রতিটি কার্যক্রম তার চিন্তার ধরন, অভিযোজনের গতি এবং সহযোগিতার সক্ষমতার ছাপ রেখে যায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাছে এ ধরনের তথ্যের টেরাবাইটের পর টেরাবাইট ভাণ্ডার রয়েছে, কিন্তু তারা সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার প্রায় করে না বললেই চলে।
এসবই ইঙ্গিত দেয়, এখন দরকার এআই-নেটিভ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। শিক্ষা-প্রযুক্তি (এডটেক) খাতের নাটকীয় পতন ও পুনর্জন্মই দেখাচ্ছে, এ পরিবর্তন এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। যেসব প্রতিষ্ঠান কেবল শ্রেণীকক্ষের লেকচার অনলাইনে ছেড়ে দিয়েই প্রযুক্তিতে বড় বিপ্লবের নস্টালজিয়ায় ভুগছিল তারা একে একে হারিয়ে যাচ্ছে। যে বিনিয়োগকারীরা একসময় সিলিকন ভ্যালির এ ধরনের প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে বড় করেছিলেন, তারাই এখন নতুন বিকল্পে অর্থ ঢালছেন। ডুওলিঙ্গোর সাবেক নির্বাহীরা মিলে নতুন এক উদ্যোগ চালু করেছেন। তাদের অঙ্গীকার ‘ভবিষ্যতের বিশ্ববিদ্যালয়’ নির্মাণ। এরই মধ্যে তা খোসলা ভেঞ্চারস, লাইটস্পিড ও ডিএসটি গ্লোবালের কাছ থেকে ৩ কোটি ৬০ লাখ ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর আস্থা হারানো প্রযুক্তিবিশ্বের আরো প্রভাবশালী ব্যক্তিরাও বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তুলছেন। পিটার থিয়েল তরুণদের বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে স্টার্টআপ শুরু করতে ১ লাখ ডলার করে দিচ্ছেন। ওয়াই কম্বিনেটর উদ্যোক্তাদের জন্য এক ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে, যেখানে বহু বছরের অভিজ্ঞতা কয়েক মাসের মধ্যেই অর্জনের সুযোগ তৈরি হয়। অথচ অভিজাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসল পণ্য কখনই শিক্ষা ছিল না—এমআইটি দুই দশক ধরেই তাদের লেকচার উন্মুক্ত করে দিয়েছে। তাদের প্রকৃত সম্পদ হলো নেটওয়ার্ক। একই শ্রেণীকক্ষে চার বছর কাটানো এমন এক সামাজিক পুঁজি তৈরি করে, যার সুফল সারা জীবন ধরে বাড়তে থাকে। মানুষ আসলে পাঠ্যক্রমের জন্য নয়, এ সামাজিক পুঁজির জন্যই অর্থ ব্যয় করে।
অতএব, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সচেতনভাবে এমন পরিবেশ নির্মাণের ওপর, যেখানে শক্তিশালী মানবিক ও পেশাগত সংযোগ গড়ে ওঠে। অথচ বাস্তবে প্রায় কেউই তা করছে না। একই সঙ্গে গুরুত্ব দেয়া উচিত কেবল কতজন এসটিইএম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) স্নাতক তৈরি হচ্ছে, সেটির ওপর নয়; বরং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি গবেষণা বা ধারণা কত দ্রুত বাজারযোগ্য পণ্য হয়ে উঠছে, সেই পথটি কতটা কার্যকর, তার ওপর। অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করেন যে চীন যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি এসটিইএম পিএইচডি তৈরি করছে। কিন্তু চীনের প্রকৃত শক্তি অন্য জায়গায়—তারা গবেষণাকে মানুষের ব্যবহারযোগ্য উদ্ভাবনে রূপ দিতে কয়েক বছরের বেশি সময় নেয় না; যেখানে বিশ্বের অনেক জায়গায় একই প্রক্রিয়ায় এক দশক বা তারও বেশি সময় লেগে যায়।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশ এখনো শিক্ষাকে এমন একটি সাংস্কৃতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখে, যেখানে কেবল সামান্য কিছু উন্নতি করলেই চলবে। অথচ শিক্ষা এখন কৌশলগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান নির্ধারক। তা না হলে কানাডা, জার্মানি, সিঙ্গাপুর ও সংযুক্ত আরব আমিরাত কেন অন্য দেশগুলোর অর্থে প্রশিক্ষিত প্রযুক্তিকর্মীদের দ্রুত আমদানি করতে বিশেষ ভিসা চালু করবে? একটি দেশ যদি কেবল বিদেশে রফতানির জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করে, তবে তা মূলত অন্য অর্থনীতিকে ভর্তুকি দেয়ারই নামান্তর। তাই শিক্ষা সংস্কারকারীদের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—কীভাবে একজন মানুষের অর্জিত জ্ঞানকে যত দ্রুত সম্ভব নিজের দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তর করা যায়, তার আগেই যেন অন্য কোনো দেশ সেই সুবিধা নিয়ে যেতে না পারে।
লেখক: ইরিনা ভলনিৎসকা- আয়রনসাইবারের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)।

