বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় মামলা জট দীর্ঘদিনের এক বাস্তবতা। আদালতের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বিচারকের সংখ্যা বাড়েনি, বিভিন্ন আইন সংস্কার হয়েছে; কিন্তু মামলার চাপ কমেনি। এই বাস্তবতায় বিশ্বজুড়েই বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বিচারব্যবস্থার অপরিহার্য অংশে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশও সেই পথেই এগোচ্ছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য আইনগত সহায়তা প্রদান আইন, ২০০০-এ সংশোধনের মাধ্যমে লিগ্যাল এইড ব্যবস্থার আওতায় মধ্যস্থতার পরিধি বাড়ানো হয়েছে। পরবর্তীতে আইনগত সহায়তা প্রদান (আইনি পরামর্শ ও মধ্যস্থতা) বিধিমালা, ২০২৫-এ জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের মাধ্যমে প্রি-লিটিগেশন ও কোর্ট-রেফার্ড মধ্যস্থতার বিস্তারিত কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন অনুযায়ী অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও অভিজ্ঞ আইনজীবীদের Special Mediator হিসেবে নিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, দেওয়ানি কার্যবিধির ৮৯এ ধারা আদালতকে উপযুক্ত ক্ষেত্রে বিরোধ মধ্যস্থতায় পাঠানোর ক্ষমতা দিয়েছে। অর্থাৎ আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট—বিচারব্যবস্থার একটি পেশাদার, নিরপেক্ষ ও কার্যকর বিকল্প কাঠামো গড়ে তোলা।
এটি নিঃসন্দেহে একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। একজন দক্ষ মধ্যস্থতাকারী এমন একটি বিরোধের সমাধান করতে পারেন, যা অন্যথায় বছরের পর বছর আদালতে ঝুলে থাকতে পারত। এতে শুধু একটি মামলা কমে না; আদালতের সময় সাশ্রয় হয়, বিচারপ্রার্থীর অর্থ ও ভোগান্তি কমে, পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কও অনেক ক্ষেত্রে অক্ষুণ্ণ থাকে। তাই একটি দক্ষ মধ্যস্থতাকারী কার্যত বিচারব্যবস্থার নীরব সহযোদ্ধা কিন্তু এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো-যাঁরা স্পেশাল মেডিয়েটর হিসেবে নিয়োগ পাবেন, তাঁদের নির্বাচন কীসের ভিত্তিতে হবে?
পেশাগত যোগ্যতা, প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা, সততা ও নিরপেক্ষতা—নাকি রাজনৈতিক পরিচয়, দলীয় আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব?
প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে একটি নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয় মনে হলেও বাস্তবে এটি বাংলাদেশের এডিআর ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কারণ একজন মধ্যস্থতাকারীর হাতে বিচারকের মতো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নেই। তিনি কাউকে সাজা দিতে পারেন না, কাউকে বাধ্য করতে পারেন না। তাঁর একমাত্র শক্তি হলো—বিশ্বাস। বিরোধে জড়িত দুই পক্ষ তাঁর সামনে বসেন এই আস্থায় যে, তিনি কারও প্রতিনিধি নন; তিনি আইনের কাঠামোর মধ্যে থেকে একটি ন্যায়সংগত ও গ্রহণযোগ্য সমাধানের সহায়ক ভূমিকা রাখবেন।
সেই কারণেই মধ্যস্থতা কোনো সাধারণ আপস-মীমাংসা নয়। এটি একটি বিশেষায়িত পেশা। একজন মধ্যস্থতাকারীর আইন জানতে হয়, মানুষের মন বুঝতে হয়, সংঘাত ব্যবস্থাপনা জানতে হয়, আলোচনার কৌশল জানতে হয় এবং সবচেয়ে বড় কথা—নিজেকে নিরপেক্ষ রাখতে হয়। রাজনৈতিক পরিচয় এসব দক্ষতার কোনো বিকল্প নয়। এটাই রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা।
লিগ্যাল এইড অফিসকে যদি শুরু থেকেই একটি পেশাদার আইনগত প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের আরেকটি ক্ষেত্র বানানো হয়, তাহলে এটি আদালতের বিকল্প হয়ে উঠবে না; বরং ধীরে ধীরে এমন এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে, যেখানে বিচারপ্রার্থীরা আইনের চেয়ে মধ্যস্ততাকারীর প্রভাব-প্রতিপত্তিকে বেশি গুরুত্ব দিতে বাধ্য হবেন। আর সেদিনই এডিআরের সবচেয়ে বড় শক্তি—নিরপেক্ষতার প্রতি মানুষের বিশ্বাস ভেঙে পড়বে। এই প্রতিষ্ঠানটির ধ্বংস অনিবার্য পরিনতি হবে।
বাংলাদেশের সমাজে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি দীর্ঘ ঐতিহ্য রয়েছে। গ্রামবাংলার সালিশ, পঞ্চায়েত, মাতব্বরের বৈঠক—এসব বহুদিন ধরে সামাজিক বাস্তবতার অংশ। স্বাধীনতার পরও এই সংস্কৃতি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। বরং সময়ের সঙ্গে এর রূপ বদলেছে। আজও বহু এলাকায় জমি, পারিবারিক বিরোধ, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব কিংবা ছোটখাটো ফৌজদারি ঘটনার পর মানুষ প্রথমে আদালতের কথা ভাবেন না; খোঁজেন এমন একজনকে, যিনি ‘মীমাংসা করে দিতে পারবেন’।
এই বাস্তবতায় অনেক সময় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি কিংবা থানার কর্মকর্তারাও অনানুষ্ঠানিক সালিশের অংশ হয়ে ওঠেন। বিশেষ করে থানাকেন্দ্রিক আপস-মীমাংসা আমাদের সমাজে একটি বহুল পরিচিত চিত্র। যদিও পুলিশের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এবং অপরাধ তদন্ত, কিন্তু বাস্তবে নানা সামাজিক, প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কারণে অনেক থানা স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তির কেন্দ্র ও ওসি সাহেবদের সাথে সমাজপতিদের দেন-দরবারের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই ওসির কক্ষে বসে দুই পক্ষের মধ্যে আপস হয়, লিখিত মুচলেকা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালীরা উপস্থিত থাকেন, এবং প্রায়ক্ষেত্রেই বিষয়টির একটি একপাক্ষিক নিষ্পত্তিও ঘটে।
যদিও এসব ব্যবস্থার পক্ষে-বিপক্ষে নানা যুক্তি থাকতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক বিরোধ কমে, আবার বহু ক্ষেত্রেই প্রশ্ন ওঠে—সেখানে পক্ষগুলোর সম্মতি কতটা স্বাধীন ছিল? ক্ষমতার ভারসাম্য কি সমান ছিল? আইনগত অধিকার কি যথাযথভাবে বিবেচিত হয়েছে? সবচেয়ে বড় কথা, সেখানে কি আইনের শাসন কাজ করেছে, নাকি প্রভাবের শাসন?
ঠিক এই কারণেই রাষ্ট্র লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে একটি প্রাতিষ্ঠানিক মধ্যস্থতা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। কারণ একটি আধুনিক রাষ্ট্রে বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যক্তির প্রভাবের ওপর নির্ভর করতে পারে না; সেটি নির্ভর করবে নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠানের ওপর। সালিশ হতে পারে সামাজিক, কিন্তু মধ্যস্থতা হতে হবে আইনভিত্তিক। আপস হতে পারে স্বেচ্ছায়, কিন্তু সেটি হতে হবে নিরপেক্ষ পরিবেশে। আর এই পার্থক্যটিই লিগ্যাল এইডের এডিআর ব্যবস্থাকে থানার সালিশ কিংবা রাজনৈতিক মীমাংসা থেকে আলাদা করেছে।
কিন্তু যদি স্পেশাল মেডিয়েটর নিয়োগেও পিপি,জিপি নিয়োগের মত রাজনৈতিক পরিচয় বা দলীয় আনুগত্য প্রাধান্য পায়, তাহলে এই মৌলিক পার্থক্যটি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে।
ভাবুন, কোনো জেলার মানুষ জানেন যে, লিগ্যাল এইডের স্পেশাল মেডিয়েটর হিসেবে যে নির্বাচিত হয়েছেন, তা তাঁর মধ্যস্থতা দক্ষতার জন্য নয়, বরং তিনি একটি বিশেষ রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ হওয়ার কারণে। তখন বিরোধের অন্য পক্ষ কি তাঁর নিরপেক্ষতার ওপর আস্থা রাখতে পারবেন? তাঁরা কি আস্থা রাখতে পারবেন যে তাঁরা একজন স্বাধীন মধ্যস্থতাকারীর সামনে বসেছেন? নাকি মনে করবেন, তাঁরা এমন একজনের সামনে বসেছেন, যিনি প্রভাবশালী কোনো গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন?
মধ্যস্থতার সবচেয়ে বড় সম্পদ হচ্ছে perception of neutrality অর্থাৎ নিরপেক্ষতার প্রতি জনধারণা। একজন মধ্যস্থতাকারী বাস্তবে নিরপেক্ষ হলেও যদি পক্ষগুলোর মনে তাঁর নিরপেক্ষতা নিয়ে কিঞ্চিৎ সন্দেহও জন্মায়, তাহলে মধ্যস্থতা কার্যত ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। ফলে এখানে শুধু প্রকৃত নিরপেক্ষ হওয়াই যথেষ্ট নয়; নিরপেক্ষ বলে প্রতীয়মান হওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই স্পেশাল মেডিয়েটর নিয়োগকে সাধারণ প্রশাসনিক নিয়োগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি আস্থার বিষয়। আমরা ইতোমধ্যে রাষ্ট্রের বিভিন্ন আইনগত প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক দেখেছি। সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগের ক্ষেত্রেও এই বিতর্ক বারবার আলোচনার বিষয়বস্তু হয়ে উঠে যেহেতু আমাদের দেশে স্বাধীন এটোর্নি সার্ভিস নেই। প্রশ্নটি টাই কোনো ব্যক্তি বা সরকারের নয়; প্রশ্নটি একটি নীতির। রাষ্ট্রীয় আইনগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কি যোগ্যতা মুখ্য হবে, নাকি রাজনৈতিক আনুগত্য?
যদি সেই একই সংস্কৃতি লিগ্যাল এইড অফিসেও প্রবেশ করে, তাহলে সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে প্রতিষ্ঠানটির চরিত্রের। ধীরে ধীরে মানুষ লিগ্যাল এইড অফিসকে আর একটি নিরপেক্ষ আইনগত সহায়তা কেন্দ্র হিসেবে দেখবেন না। বরং এটি স্থানীয় রাজনৈতিক সমঝোতার আরেকটি কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। বিচারপ্রার্থীরা তখন আইনজ্ঞানসম্পন্ন, প্রশিক্ষিত ও নিরপেক্ষ একজন মধ্যস্থতাকারীর কাছে নয়; বরং রাজনৈতিক পরিচয়ের ওজন মেপে সেখানে যেতে শুরু করবেন। আদালতের বিকল্প হিসেবে যে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তোলার কথা ছিল, সেটি তখন জনমনে থানার ওসির আপস-মীমাংসার কক্ষ কিংবা স্থানীয় রাজনৈতিক সালিশের একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্করণ হিসেবেই প্রতিভাত হতে পারে।
এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা হবে না; এটি হবে এডিআর দর্শনের পরাজয়। কারণ এডিআরের ভিত্তি হলো আইনের শাসনকে সহজলভ্য করা, প্রভাবশালীর আরোপিত সমঝোতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া নয়। এই কারণেই স্পেশাল মেডিয়েটর নিয়োগের ক্ষেত্রে একমাত্র বিবেচ্য হওয়া উচিত—আইনজ্ঞান, পেশাগত অভিজ্ঞতা, মধ্যস্থতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ, নৈতিক মান, নিরপেক্ষতা এবং পূর্ববর্তী কর্মদক্ষতা। এর বাইরে অন্য কোনো বিবেচনা যতই গ্রহণযোগ্য মনে হোক না কেন, তা শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির নিরপেক্ষতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করবে।
আরও একটি বিষয় এখানে গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে। বিচারব্যবস্থায় আস্থা গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে; কিন্তু সেই আস্থা নষ্ট হতে খুব বেশি সময় লাগে না। একজন বিচারক, একজন সরকারি আইন কর্মকর্তা কিংবা একজন মধ্যস্থতাকারীর ব্যক্তিগত আচরণ কখনো কখনো পুরো প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তিকে প্রভাবিত করে। ফলে লিগ্যাল এইড অফিসে যদি এমন ধারণা জন্মায় যে এখানে নিয়োগের প্রধান যোগ্যতা পেশাগত দক্ষতা নয়, বরং রাজনৈতিক পরিচয়, তাহলে শুধু একজন মধ্যস্থতাকারী নন—প্রশ্নের মুখে পড়বে পুরো প্রতিষ্ঠান। এর প্রভাবও হবে বহুমাত্রিক।
প্রথমত, বিচারপ্রার্থীরা মধ্যস্থতায় আগ্রহ হারাবেন। তাঁরা মনে করবেন, আদালতে বিচার পাওয়ার সম্ভাবনা যতটুকু, এখানেও ততটাই রাজনৈতিক প্রভাবের হিসাব করতে হবে। ফলে যে বিরোধ মধ্যস্থতায় নিষ্পত্তি হতে পারত, সেটিও আদালতে যাবে। মামলা জট কমানোর যে উদ্দেশ্যে রাষ্ট্র এই ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে, সেটিই ব্যাহত হবে।
দ্বিতীয়ত, প্রকৃত অর্থে দক্ষ ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত আইনজীবীরা নিরুৎসাহিত হবেন। যারা বছরের পর বছর নিজেদের দক্ষতা বাড়িয়েছেন, মধ্যস্থতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন এবং পেশাগত গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করেছেন, তাঁরা যদি দেখেন যে নিয়োগের ক্ষেত্রে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় বেশি কার্যকর, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই তাঁদের আগ্রহ কমে যাবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে পুরো পেশাটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তৃতীয়ত, লিগ্যাল এইড অফিসের প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা দুর্বল হবে। একটি প্রতিষ্ঠান তখনই শক্তিশালী হয়, যখন জনগণ বিশ্বাস করেন যে প্রতিষ্ঠানটি ব্যক্তি বা দলের নয়; আইনের। সেই বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে তা পুনর্গঠন করা অত্যন্ত কঠিন।
এ কারণেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মধ্যস্থতাকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়। শুধু আইনজীবী হলেই কেউ মধ্যস্থতাকারী হন না। তাঁকে নির্দিষ্ট প্রশিক্ষণ নিতে হয়, নিরপেক্ষতা বজায় রাখার সক্ষমতা প্রমাণ করতে হয়, নিয়মিত মূল্যায়নের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে প্যানেল থেকেও বাদ পড়তে হয়। কারণ একটি সফল মধ্যস্থতা ব্যবস্থার মূলধন ভবন বা বাজেট নয়; মূলধন হলো বিশ্বাসযোগ্যতা।
বাংলাদেশেও এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গিই গ্রহণ করার সময় এসেছে। স্পেশাল মেডিয়েটর নিয়োগে উন্মুক্ত আবেদন, স্বচ্ছ বাছাই, নির্দিষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড, স্বীকৃত প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতার মূল্যায়ন এবং নিয়মিত পারফরম্যান্স রিভিউ বাধ্যতামূলক করা উচিত। কে কাকে চেনেন, কার রাজনৈতিক পরিচয় কী, কে কোন প্রভাবশালী ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ—এসব প্রশ্নের কোনো স্থান একটি আধুনিক এডিআর ব্যবস্থায় থাকতে পারে না।
কারণ লিগ্যাল এইড অফিসের দরজায় একজন বিচারপ্রার্থী যখন প্রবেশ করেন, তখন তিনি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে আসেন না; তিনি ন্যায়সংগত সমাধানের আশা নিয়ে আসেন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই আস্থার মর্যাদা রক্ষা করা। লিগ্যাল এইড বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার অন্যতম সফল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সীমিত অর্থনৈতিক সামর্থ্যের মানুষের জন্য আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু হলেও আজ এটি শুধু আইনি সহায়তা প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠান নয়; বরং আদালতের ওপর চাপ কমানো, সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা এবং বিচারপ্রাপ্তিকে সহজলভ্য করার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে পরিণত হয়েছে।
এই অর্জন কোনো ব্যক্তি বা সরকারের একক অবদান নয়; এটি বিচারক, আইনজীবী, লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা, বার, আদালত এবং সংশ্লিষ্ট সকলের দীর্ঘদিনের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। এই কারণেই লিগ্যাল এইডকে ঘিরে রাষ্ট্রের প্রত্যাশাও অনেক বড়। এটি এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিচারপ্রার্থী আদালতের আনুষ্ঠানিক পরিবেশের বাইরে থেকেও আইনের শাসনের সুরক্ষা অনুভব করবেন। যেখানে তিনি বিশ্বাস করবেন, তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা অর্থনৈতিক সামর্থ্য নয়—আইনই তাঁর সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
সেই প্রতিষ্ঠানকে যদি আমরা ধীরে ধীরে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাবাধীন করে ফেলি, তাহলে ক্ষতি শুধু একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তখন মানুষ আর লিগ্যাল এইড অফিসকে একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখবেন না। বরং এটি স্থানীয় ক্ষমতার ভারসাম্য, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা পরিচিতির আরেকটি ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। বিচারপ্রার্থী তখন ভাবতে শুরু করবেন—’আমার আইনি অবস্থান কতটা শক্তিশালী’—তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ‘আমার রাজনৈতিক ঘনিষ্টতা কতটা শক্তিশালী’। এটি কোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাম্য চিত্র হতে পারে না।
আমরা যদি সত্যিই মামলা জট কমাতে চাই, আদালতের ওপর চাপ কমাতে চাই এবং এডিআরকে বিচারব্যবস্থার একটি কার্যকর স্তম্ভে পরিণত করতে চাই, তাহলে প্রথম কাজ হবে মধ্যস্থতাকারীর প্রতি মানুষের আস্থা অক্ষুণ্ণ রাখা। সেই আস্থা আইন দিয়ে তৈরি করা যায় না; সেটি তৈরি হয় নিয়োগের স্বচ্ছতা, পেশাগত মান, নিরপেক্ষতা এবং জবাবদিহির মাধ্যমে।
রাষ্ট্রের উচিত স্পেশাল মেডিয়েটর নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি সুস্পষ্ট নীতি অনুসরণ করা। প্যানেলভুক্তির জন্য নির্ধারিত যোগ্যতা প্রকাশ করতে হবে। নির্বাচন প্রক্রিয়া হতে হবে উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক। মধ্যস্থতা বিষয়ে স্বীকৃত প্রশিক্ষণ, ন্যূনতম পেশাগত অভিজ্ঞতা, আচরণগত মানদণ্ড এবং নিয়মিত কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। একই সঙ্গে সফল মধ্যস্থতার হার, পক্ষগুলোর সন্তুষ্টি এবং নৈতিক আচরণের ভিত্তিতে প্যানেল পর্যায়ক্রমে পুনর্মূল্যায়নের ব্যবস্থাও থাকা উচিত।
কারণ বিচারব্যবস্থায় একটি মৌলিক নীতি আছে—ন্যায়বিচার শুধু হতে হবে না; ন্যায়বিচার হয়েছে বলেও জনগণের কাছে প্রতীয়মান হতে হবে। মধ্যস্থতার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। একজন স্পেশাল মেডিয়েটর শুধু নিরপেক্ষ হলেই চলবে না; তাঁকে নিরপেক্ষ বলেও জনগণের কাছে প্রতীয়মান হতে হবে। আর সেই ধারণা জন্মায় স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা থেকে নয়।
তাই প্রশ্নটি একজন আইনজীবী বা একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারকের নিয়োগের নয়। প্রশ্নটি লিগ্যাল এইডের ভবিষ্যৎ চরিত্রের। এটি কি আদালতের বাইরে আইনের শাসনের একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হবে, নাকি ধীরে ধীরে স্থানীয় রাজনৈতিক সালিশ, পরিচয়ভিত্তিক প্রভাব কিংবা থানাকেন্দ্রিক আপস-মীমাংসার আরেকটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্করণে পরিণত হবে?
রাষ্ট্রের সামনে এখনো সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। লিগ্যাল এইড অফিস আদালতের বিকল্প হতে পারে; কিন্তু কখনোই রাজনৈতিক সালিশের বিকল্প হতে পারে না। এটি কোনো দলীয় কার্যালয় নয়, কোনো জনপ্রতিনিধির মীমাংসা কেন্দ্র নয়, কোনো থানার ওসির সালিশ দরবারও নয়। এটি রাষ্ট্রের আইনগত সহায়তা প্রদানকারী একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের দরজা খুলবে বিচারপ্রার্থীর জন্য—রাজনৈতিক পরিচয়ের জন্য নয়।
স্পেশাল মেডিয়েটর নিয়োগে তাই একটিই নীতি হওয়া উচিত—রাজনৈতিক বিবেচনা নয়, পেশাগত যোগ্যতা। কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের শক্তি তার ভবনে নয়, তার মানুষের ওপর জনগণের বিশ্বাসে। আর সেই বিশ্বাস একবার হারিয়ে গেলে, নতুন আইন করে তা সহজে ফিরিয়ে আনা যায় না।
- লেখক: শামস নজীব অর্ক, আইনজীবী, জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ঢাকা।

