Close Menu
Citizens VoiceCitizens Voice
    Facebook X (Twitter) Instagram YouTube LinkedIn WhatsApp Telegram
    Citizens VoiceCitizens Voice শনি, আগস্ট 29, 2026
    • প্রথমপাতা
    • অর্থনীতি
    • বাণিজ্য
    • ব্যাংক
    • পুঁজিবাজার
    • বিমা
    • কর্পোরেট
    • বাংলাদেশ
    • আন্তর্জাতিক
    • আইন
    • অপরাধ
    • মতামত
    • অন্যান্য
      • খেলা
      • শিক্ষা
      • স্বাস্থ্য
      • প্রযুক্তি
      • ধর্ম
      • বিনোদন
      • সাহিত্য
      • বিশ্ব অর্থনীতি
      • ভূ-রাজনীতি
      • জলবায়ু ও পরিবেশ
      • লাইফস্টাইল
      • বিশ্লেষণ
      • ভিডিও
    Citizens VoiceCitizens Voice
    Home » নীরবে দরিদ্র হচ্ছে মধ্যবিত্ত, খবর রাখছে কে?
    মতামত

    নীরবে দরিদ্র হচ্ছে মধ্যবিত্ত, খবর রাখছে কে?

    নিউজ ডেস্কআগস্ট 29, 2026
    Facebook Twitter Email Telegram WhatsApp Copy Link
    Share
    Facebook Twitter LinkedIn Telegram WhatsApp Email Copy Link

    মাসের শেষ সপ্তাহে বাজারের ব্যাগটি একটু হালকা হয়ে আসে। ফ্রিজে খাবার আছে, কিন্তু আগের মতো বৈচিত্র্য নেই। সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানোর স্বপ্ন আছে, কিন্তু টিউশন ফি বাড়ছে। চিকিৎসার প্রয়োজন হলে সঞ্চয়ের হিসাব নড়বড়ে হয়ে যায়। বাসাভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, যাতায়াত, বাজার—সব খরচ মিটিয়ে মাস শেষে হাতে যা থাকে, তা দিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার কথা ভাবা কঠিন। আর কোনো আকস্মিক বিপদ এলে—অসুস্থতা, চাকরি হারানো, ব্যবসায় ক্ষতি—সেই পরিবারটি এক লাফে মধ্যবিত্তের নিরাপদ সীমা পেরিয়ে অনিশ্চয়তার দিকে চলে যেতে পারে।

    এই মানুষগুলো বাইরে থেকে হয়তো এখনো ‘মধ্যবিত্ত’। কিন্তু তাঁদের জীবনযাত্রার ভেতরে ক্রমেই বাড়ছে নিম্নমধ্যবিত্তের উদ্বেগ। প্রশ্ন হলো, মধ্যবিত্ত কি সত্যিই ক্রমেই দরিদ্র হয়ে পড়ছে?

    বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা বলছে, এই প্রশ্নকে আর নিছক আবেগ বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মে মাসে জাতীয় মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ; খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৬ শতাংশের কাছাকাছি এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ। শহর ও গ্রাম—দুই ক্ষেত্রেই জীবনযাত্রার ব্যয় উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে।

    বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য তাই একদিন এই প্রশ্নের উত্তরে মাপা হবে—একজন সাধারণ মানুষ কি আজ তার গতকালের চেয়ে একটু বেশি নিরাপদ, একটু বেশি সচ্ছল এবং আগামীকাল নিয়ে একটু বেশি আশাবাদী? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনে পৌঁছেছে। আর যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে আমাদের উন্নয়নের হিসাব যতই বড় হোক, মধ্যবিত্তের নীরব পতনের শব্দ আমাদের শুনতেই হবে।

    মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—এটি মানুষের আয়কে একদিনে কমিয়ে দেয় না; ধীরে ধীরে আয়ের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষয় করে। বেতন হয়তো একই থাকে, কিন্তু সেই বেতনে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা যায় না। পাঁচ বছর আগে যে আয় দিয়ে একটি পরিবার কিছুটা স্বস্তিতে চলত, আজ একই আয় দিয়ে তাকে অনেক বেশি হিসাব করতে হয়।

    এই হিসাবের চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ে মধ্যবিত্তের ওপর। অতি দরিদ্র মানুষের জন্য রাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি থাকে। উচ্চবিত্তের হাতে থাকে সম্পদ, বিনিয়োগ, একাধিক আয়ের উৎস ও সংকট সামাল দেওয়ার সক্ষমতা। মধ্যবিত্তের বড় অংশের কাছে থাকে মূলত একটি চাকরি বা একটি নির্দিষ্ট আয়ের উৎস। সেই আয় বন্ধ হয়ে গেলে অথবা মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়লে পরিবারটির আর্থিক নিরাপত্তা দ্রুত দুর্বল হয়ে যায়। মধ্যবিত্তের সংকট তাই শুধু ‘কম আয়’ নয়; এটি ‘আয় ও ব্যয়ের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান ব্যবধান’।

    বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গত কয়েক দশকে বড় পরিবর্তন এসেছে। দারিদ্র্য কমেছে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ বেড়েছে, নগরায়ণ হয়েছে, নতুন পেশা ও ব্যবসার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় দারিদ্র্যের হার ২০২২ সালের ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ২১ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছে। একই সময়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের চাপ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এই পরিসংখ্যানের ভেতরে মধ্যবিত্তের সংকটও লুকিয়ে আছে।

    একটি পরিবার দরিদ্র হওয়ার আগে অনেক সময় তার জীবনযাত্রার মান কমতে শুরু করে। মাছের বদলে ডিম, ডিমের বদলে ডাল; ব্যক্তিগত গাড়ির বদলে গণপরিবহন; চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার বদলে ওষুধের দোকান; সন্তানের অতিরিক্ত শিক্ষার খরচ কমিয়ে দেওয়া; ছুটি কাটানোর পরিকল্পনা বাতিল করা—এভাবে ধীরে ধীরে একটি পরিবারের ‘স্বাভাবিক জীবন’ সংকুচিত হয়। এই সংকোচনকে সবসময় দারিদ্র্য বলা হয় না। কিন্তু এটি আর্থিক অবনতির স্পষ্ট লক্ষণ।

    বাংলাদেশের মধ্যবিত্তের একটি বড় অংশের সমস্যা হলো, তাঁদের ব্যয়ের বড় অংশ অনিবার্য। বাসাভাড়া কমানো যায় না। সন্তানের স্কুলের ফি কমানো যায় না। চিকিৎসা এড়িয়ে চলা যায় না। যাতায়াতের খরচ কমানোরও সীমা আছে। বাজারে গিয়ে মানুষ অনেক সময় বিলাসী পণ্য নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যই কেনেন। ফলে মূল্যস্ফীতি যখন দীর্ঘস্থায়ী হয়, তখন মধ্যবিত্তের সঞ্চয়ই প্রথমে ক্ষয় হয়। সঞ্চয় শেষ হলে শুরু হয় ঋণ।

    ক্রেডিট কার্ড, ব্যক্তিগত ঋণ, আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার, কিস্তিতে পণ্য কেনা—এসব একসময় মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে দাঁড়ায়। ঋণ হয়তো সাময়িকভাবে সংকট সামলায়, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা আয়ের একটি অংশকে ভবিষ্যৎ থেকে কেটে নেয়। মাসের বেতন হাতে আসার আগেই যদি তার একটি বড় অংশ আগের ঋণ পরিশোধে চলে যায়, তাহলে নতুন মাসের ব্যয় মেটাতে আবার ঋণ নিতে হয়। এভাবেই তৈরি হয় ঋণের চক্র।

    মধ্যবিত্তের আরেকটি বড় সংকট হলো কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশে শিক্ষিত তরুণের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু দক্ষতা অনুযায়ী ভালো চাকরির সুযোগ সেই অনুপাতে বাড়ছে না। যারা চাকরিতে আছেন, তাঁদের অনেকের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ছে না। আবার বেসরকারি খাতে চাকরির নিরাপত্তা অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত।

    একজন চাকরিজীবী যখন জানেন, তাঁর আয় আগামী পাঁচ বছর কতটা বাড়বে তা অনিশ্চিত, কিন্তু সন্তানের শিক্ষা, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয় নিশ্চিতভাবেই বাড়বে—তখন ভবিষ্যৎ সম্পর্কে উদ্বেগ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। অর্থনীতির ভাষায় এটি ক্রয়ক্ষমতার সংকট; মানুষের ভাষায় এটি অনিশ্চয়তার জীবন।

    বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান চিত্রে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দুর্বল প্রবৃদ্ধি, আর্থিক খাতের চাপ ও দারিদ্র্য বৃদ্ধির বিষয়টি উল্লেখ করেছে। সংস্থাটির মতে, ২০২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে এবং মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৫ শতাংশের মতো থাকতে পারে।

    এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—প্রবৃদ্ধির হার এবং মানুষের জীবনের বাস্তবতা সবসময় একই কথা বলে না। জাতীয় আয় বাড়তে পারে, মাথাপিছু আয় বাড়তে পারে, অর্থনীতির আকার বড় হতে পারে; কিন্তু যদি একটি পরিবারের আয় ব্যয়ের চেয়ে ধীরে বাড়ে, তাহলে সেই পরিবারের কাছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল অদৃশ্যই থেকে যায়।

    এ কারণেই ‘মধ্যবিত্ত’ শব্দটিকে শুধু আয়ের পরিমাণ দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা যায় না। একজন মধ্যবিত্ত মানুষ সাধারণত এমন একটি জীবনযাত্রা বজায় রাখতে চান, যেখানে সন্তানকে শিক্ষিত করা যাবে, অসুস্থ হলে চিকিৎসা নেওয়া যাবে, জরুরি প্রয়োজনে কিছু সঞ্চয় থাকবে এবং ভবিষ্যতের জন্য কিছু পরিকল্পনা করা যাবে। যখন এই চারটি নিরাপত্তা একে একে দুর্বল হয়ে যায়, তখন মানুষ তার আয়তাত্ত্বিক শ্রেণিতে মধ্যবিত্ত থাকলেও বাস্তবে আর্থিকভাবে বিপন্ন হয়ে পড়ে।

    এই বিপন্নতার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো সম্পদের অসম বণ্টন। যাদের বাড়ি আছে, জমি আছে, ব্যবসা আছে, শেয়ার বা অন্যান্য সম্পদে বিনিয়োগ আছে, মূল্যস্ফীতির সময় তাঁদের সম্পদের দামও অনেক ক্ষেত্রে বাড়ে। কিন্তু যার পুরো সম্পদ হলো ব্যাংকে রাখা সামান্য সঞ্চয়, মূল্যস্ফীতি তার সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ সম্পদশালী মানুষ মূল্যস্ফীতির অভিঘাত কিছুটা সামাল দিতে পারেন; শুধু আয়নির্ভর মানুষ পারেন না।

    এই বাস্তবতা মধ্যবিত্তের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। শুধু সঞ্চয় করলেই আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য রক্ষার জন্য আর্থিক পরিকল্পনাও প্রয়োজন। তবে এখানে রাষ্ট্রের দায়িত্বও কম নয়। মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে ঠেলে দিয়ে ‘বিনিয়োগ করুন’ বলা কোনো সমাধান নয়। বরং নিরাপদ, স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রিত বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করা জরুরি।

    মধ্যবিত্তের সংকট মোকাবিলায় সবচেয়ে জরুরি হলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে বা বাজারে সাময়িক অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সরবরাহব্যবস্থার সংস্কার, বাজারে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, সিন্ডিকেট ও কারসাজি নিয়ন্ত্রণ, কৃষক ও উৎপাদকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা এবং আমদানি-রপ্তানি নীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে হবে।

    বাজারে পণ্যের দাম কমানোর দায়িত্ব শুধু ভোক্তার নয়। একজন সাধারণ মানুষ কম কিনে মূল্যস্ফীতি থামাতে পারবেন না। তাঁকে বরং এমন একটি বাজার দিতে হবে, যেখানে প্রতিযোগিতা থাকবে, তথ্য স্বচ্ছ থাকবে এবং অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।

    একই সঙ্গে মধ্যবিত্তের আয় বাড়ানোর নীতিও প্রয়োজন। কেবল মূল্যস্ফীতি কমানো যথেষ্ট নয়। উচ্চ উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন এবং নতুন পেশার সুযোগ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এমন কর্মসংস্থানের ওপর, যা শুধু চাকরি দেয় না—মানুষকে মধ্যবিত্ত জীবনের নিরাপত্তাও দেয়।

    শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি পরিবারের আয়ের বড় অংশ যদি সন্তানের শিক্ষার পেছনে চলে যায়, আর অসুস্থ হলে চিকিৎসা ব্যয়ের ভয়ে মানুষ চিকিৎসা এড়িয়ে যায়, তাহলে সেই মধ্যবিত্ত পরিবার আসলে নিরাপদ নয়। সবার জন্য মানসম্মত সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে পরিবারের ওপর ব্যক্তিগত ব্যয়ের চাপ অনেক কমবে।

    একটি কার্যকর রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় অবদান হতে পারে—মানুষকে এমন সব মৌলিক সেবার জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে না হওয়া, যা নাগরিক অধিকার হিসেবে পাওয়ার কথা।

    মধ্যবিত্তের জন্য আবাসনও একটি বড় সংকট। শহরে বাড়িভাড়া ও জমির দাম আয় বৃদ্ধির তুলনায় দ্রুত বাড়লে মানুষ তার আয়ের একটি অস্বাভাবিক বড় অংশ বাসস্থানের পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হয়। দীর্ঘমেয়াদে পরিকল্পিত নগরায়ণ, ভাড়াভিত্তিক আবাসন, গণপরিবহনকেন্দ্রিক শহর পরিকল্পনা এবং শহরের বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হলে এই সংকট আরও গভীর হবে।

    ঢাকার মতো শহরে একজন মানুষ শুধু বাসাভাড়ার জন্য নয়, যাতায়াতের সময় ও অর্থের জন্যও মূল্য দেন। শহরের কেন্দ্র থেকে দূরে বসবাসের খরচ কম হলেও যাতায়াতের ব্যয় বাড়ে। ফলে সস্তা আবাসনের সুবিধা অনেক সময় পরিবহন ব্যয় খেয়ে ফেলে। এটি শুধু ব্যক্তিগত সমস্যা নয়; এটি নগর পরিকল্পনার ব্যর্থতা।

    মধ্যবিত্তের সংকটের আরেকটি দিক মানসিক। যে পরিবার বছরের পর বছর হিসাব করে চলে, কিন্তু কখনো নিরাপদ বোধ করে না, তার মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয়, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উৎকণ্ঠা, চাকরি হারানোর আতঙ্ক, চিকিৎসা ব্যয়ের ভয়—এসব মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে।

    আমরা অর্থনৈতিক নীতিতে প্রায়ই মূল্যস্ফীতি, প্রবৃদ্ধি ও রাজস্বের কথা বলি; কিন্তু মানুষের আর্থিক উদ্বেগের কথাও বলা দরকার। একটি অর্থনীতি তখনই সুস্থ, যখন মানুষ শুধু বেঁচে থাকে না—ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করার সাহসও পায়।

    মধ্যবিত্তের পতন কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। একজন মানুষ বেশি পরিশ্রম করলেই যদি তাঁর আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে না বাড়ে, তাহলে তাকে ব্যর্থ বলা যায় না। একজন পরিবার যদি সঞ্চয় করতে চায়, কিন্তু ভাড়া, শিক্ষা, চিকিৎসা ও খাদ্যের ব্যয় তার আয়কে ছাড়িয়ে যায়, তাহলে সমস্যাটি ব্যক্তির বাজেট ব্যবস্থাপনায় নয়; অর্থনৈতিক কাঠামোতেও আছে।

    তাই মধ্যবিত্তকে শুধু ‘খরচ কমান’ বলা যথেষ্ট নয়। তাঁকে ভালো চাকরি দিতে হবে, ন্যায্য মজুরি দিতে হবে, সাশ্রয়ী আবাসন দিতে হবে, মানসম্মত সরকারি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দিতে হবে এবং নিরাপদ বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে।

    একটি দেশের মধ্যবিত্ত যত শক্তিশালী, তার অর্থনীতি তত স্থিতিশীল। কারণ মধ্যবিত্তই সাধারণত ভোক্তা বাজারকে সচল রাখে, কর দেয়, সন্তানকে শিক্ষিত করে, উদ্যোক্তা তৈরি করে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি গড়ে। মধ্যবিত্ত দুর্বল হয়ে পড়লে শুধু পরিবার নয়, বাজারও দুর্বল হয়।

    আজ যে পরিবার রেস্তোরাঁয় খাওয়া বন্ধ করছে, পোশাক কেনা কমাচ্ছে, ভ্রমণ বাতিল করছে, চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে বা সন্তানের অতিরিক্ত শিক্ষার ব্যয় কমাচ্ছে—তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত অর্থনীতির বৃহত্তর চিত্রের সঙ্গে যুক্ত। কোটি কোটি পরিবারের এই সংকোচন শেষ পর্যন্ত বাজারে চাহিদা কমায়, ব্যবসায় চাপ বাড়ায় এবং কর্মসংস্থানের ওপর প্রভাব ফেলে। অতএব মধ্যবিত্তকে রক্ষা করা কোনো বিশেষ শ্রেণির প্রতি অনুগ্রহ নয়; এটি অর্থনীতিকে রক্ষা করার কৌশল।

    বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনা নয়; প্রবৃদ্ধিকে মানুষের জীবনে ফিরিয়ে আনা। এমন প্রবৃদ্ধি দরকার, যা মানুষের আয় বাড়াবে, কর্মসংস্থান তৈরি করবে, মূল্যস্ফীতির চাপ কমাবে এবং একটি পরিবারকে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার সুযোগ দেবে। কারণ মানুষ শুধু আজকের বাজারের হিসাব করে বাঁচে না। সে সন্তানের ভবিষ্যৎ, নিজের বার্ধক্য এবং অনিশ্চিত দিনের জন্যও প্রস্তুতি নিতে চায়।

    মধ্যবিত্ত যদি ক্রমেই দরিদ্র হয়ে পড়ে, তাহলে সমাজে শুধু ভোগ কমবে না; কমবে আস্থা, স্বপ্ন ও সামাজিক গতিশীলতা। যে মানুষ একসময় মনে করতেন, পরিশ্রম করলে তাঁর সন্তান নিজের চেয়ে ভালো জীবন পাবে, তিনি যদি সেই বিশ্বাস হারান, তবে অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—ভবিষ্যতের প্রতি আস্থা—ক্ষয়ে যায়।

    শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু মধ্যবিত্ত কত টাকা আয় করে, তা নয়। প্রশ্ন হলো—তার আয় দিয়ে সে কেমন জীবনযাপন করতে পারে, কতটা সঞ্চয় করতে পারে, সংকটে কতটা নিরাপদ থাকে এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কতটা আশাবাদী হতে পারে।

    যে অর্থনীতিতে মানুষের আয় বাড়ে কিন্তু ক্রয়ক্ষমতা কমে, যে সমাজে সম্পদ বাড়ে কিন্তু নিরাপত্তা কমে, যে উন্নয়নে শহর বড় হয় কিন্তু পরিবারের স্বপ্ন ছোট হয়ে আসে—সেই উন্নয়নকে নতুন করে মূল্যায়ন করতে হয়।

    বাংলাদেশের মধ্যবিত্ত আজ সাহায্য চাইছে না; তারা সুযোগ চাইছে। তারা দয়া চায় না; তারা এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চায়, যেখানে পরিশ্রমের সঙ্গে জীবনের মানও উন্নত হবে। যেখানে একটি চাকরি হারালে পুরো পরিবার অন্ধকারে পড়ে যাবে না। যেখানে সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা ও একটি নিরাপদ বাসস্থান কোনো পরিবারের জন্য অসম্ভব স্বপ্ন হবে না।

    মধ্যবিত্তকে বাঁচানো মানে কেবল একটি শ্রেণিকে বাঁচানো নয়। এটি সেই সামাজিক সিঁড়িটিকে রক্ষা করা, যার ওপর দাঁড়িয়ে দরিদ্র মানুষ মধ্যবিত্তে ওঠে এবং মধ্যবিত্ত মানুষ আরও সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়। যদি সেই সিঁড়ির মাঝের ধাপগুলো ভেঙে যায়, তাহলে সমাজে ওপরে ওঠার পথও সংকুচিত হয়ে যায়।

    বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রকৃত সাফল্য তাই একদিন এই প্রশ্নের উত্তরে মাপা হবে—একজন সাধারণ মানুষ কি আজ তার গতকালের চেয়ে একটু বেশি নিরাপদ, একটু বেশি সচ্ছল এবং আগামীকাল নিয়ে একটু বেশি আশাবাদী? যদি উত্তর ‘হ্যাঁ’ হয়, তবে প্রবৃদ্ধি মানুষের জীবনে পৌঁছেছে। আর যদি উত্তর ‘না’ হয়, তবে আমাদের উন্নয়নের হিসাব যতই বড় হোক, মধ্যবিত্তের নীরব পতনের শব্দ আমাদের শুনতেই হবে।

    লেখক : ড. হারুন রশীদ-সাংবাদিক, কলামিস্ট। ডেপুটি এডিটর, জাগো নিউজ।

    Share. Facebook Twitter LinkedIn Email Telegram WhatsApp Copy Link

    সম্পর্কিত সংবাদ

    অর্থনীতি

    সুন্দরবনের মাটির নিচে হাজার বছরের লবণ অর্থনীতি

    আগস্ট 29, 2026
    অর্থনীতি

    শক্তিশালী টাকায় আন্তর্জাতিক বাজারে পিছিয়ে পড়ছে রপ্তানি

    আগস্ট 29, 2026
    অপরাধ

    শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা ৮১ টন কাগজ খুলনার বদলে ঢাকায় বিক্রি

    আগস্ট 29, 2026
    একটি মন্তব্য করুন Cancel Reply

    সর্বাধিক পঠিত

    ইস্পাত শিল্প তীব্র সংকটে উৎপাদন বন্ধের পথে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    আইএমএফের রিপোর্টে ঋণের নতুন রেকর্ড পৌছালো ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারে

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    নতুন বাণিজ্য কৌশলে আরসেপে যুক্ত হতে চায় বাংলাদেশ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024

    অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেলেন তিন আমেরিকান অর্থনীতিবিদ

    অর্থনীতি অক্টোবর 16, 2024
    সংযুক্ত থাকুন
    • Facebook
    • Twitter
    • Instagram
    • YouTube
    • Telegram

    EMAIL US

    contact@citizensvoicebd.com

    FOLLOW US

    Facebook YouTube X (Twitter) LinkedIn
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement
    • About Us
    • Contact Us
    • Terms & Conditions
    • Comment Policy
    • Advertisement

    WhatsApp

    01339-517418

    Copyright © 2026 Citizens Voice All rights reserved

    Type above and press Enter to search. Press Esc to cancel.