আমাদের অনেকেরই সৌভাগ্য হবে মৃত্যুর পর উষ্ণভাবে স্মরণীয় হয়ে থাকার। অন্যদের দুর্ভাগ্য হবে সম্পূর্ণ বিস্মৃত হয়ে যাওয়া। আবার এমনও কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের স্মরণ করা হবে মানবজাতির কিছু জঘন্যতম অপরাধের সঙ্গে।
মৃত্যুকালে ‘বসনিয়ার কসাই’ হিসেবে স্মরণীয় রাতকো ম্লাদিচ শেষোক্ত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে জাতিগতভাবে নির্মূল করার অভিযানের মূল পরিকল্পনাকারী সার্বিয়ান জেনারেল হিসেবে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে প্রায় এক লক্ষ মানুষকে হত্যা, বিশ লক্ষ মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা, চল্লিশ হাজার মানুষের গুম এবং হাজার হাজার বসনিয়াক নারী ও মেয়েকে ধর্ষণের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
৬১৪টি মসজিদ, ২১৮টি প্রার্থনা কক্ষ, ৬৯টি কুরআন বিদ্যালয় ও চারটি দরবেশ আস্তানা ছাড়াও অগণিত গ্রন্থাগার, আর্কাইভ ও জাদুঘর ধ্বংস করার জন্য তাকে স্মরণ করা হবে।
সর্বোপরি, স্রেব্রেনিসার ঘটনার জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন: জাতিসংঘের একটি তথাকথিত নিরাপদ এলাকা অবরোধ করে ঠাণ্ডা মাথায় ৮,০০০-এরও বেশি বসনিয়াক পুরুষ ও বালককে হত্যা করার জন্য।
না, তাকে ভালো চোখে স্মরণ করা হবে না। ভুলেও যাওয়া হবে না।
ম্লাদিচ মারা গেছে; আপদ বিদায় হয়েছে- কিন্তু তাতে কী? লোকটা হয়তো চলে গেছে, কিন্তু সার্বিয়ান জাতীয়তাবাদের সেই বর্ণবাদী মতাদর্শ, যা তার অপরাধগুলোকে সম্ভব করে তুলেছিল, তা কিন্তু যায়নি।
প্রকৃতপক্ষে, বিশ্বব্যাপী চরম ডানপন্থীদের কিছু অংশের মধ্যে এটি নতুন জীবন পেয়েছে এবং এই চরম ডানপন্থী আন্দোলনগুলোর সংখ্যা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হওয়ার সাথে সাথে, আরেকটি বসনিয়ার ভূত অত্যন্ত বাস্তব হয়ে উঠছে।
জাতিগত নির্মূল
গণহত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত কোনো ব্যক্তি মারা গেছেন কি না, তার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, যে রাজনৈতিক শক্তিগুলো গণহত্যাকে সম্ভব করেছিল, সেগুলো আবারও শক্তি সঞ্চয় করছে কি না।
বসনিয়াকদের- অর্থাৎ মুসলিম বসনীয়দের- জাতিগত নির্মূলের পেছনে সার্বীয় জাতীয়তাবাদের একটি ধারা কাজ করেছিল, যার লক্ষ্য ছিল সকল সার্বকে একটি একক, জাতিগতভাবে সমগোত্রীয় রাষ্ট্র- বৃহত্তর সার্বিয়া- এর অধীনে একত্রিত করা। এর মূল খুঁজে পাওয়া যায় ঊনবিংশ শতাব্দীতে বলকান অঞ্চলে অটোমান শাসনের পতনের সময়ে।
তথাপি, পূর্ব ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদকে আদিম উপজাতীয়তাবাদ বা স্থানীয় জাতিগত সংঘাতের রূপ হিসেবে চিত্রিত করা দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীতে, সার্বীয় জাতীয়তাবাদকে পশ্চিম ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক সমাজগুলোতে বিদ্যমান মতাদর্শের সাথে তুলনীয় একটি বর্ণবাদী মতাদর্শ হিসেবে শনাক্ত করা যায়।
এর মূলে, একটি বর্ণবাদী মতাদর্শ তিনটি আন্তঃসম্পর্কিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কাজ করে: একটি জনগোষ্ঠীকে স্বতন্ত্র শ্রেণীতে বিভক্ত করা, সেই শ্রেণীগুলোর শ্রেণিবিন্যাস করা এবং অধীনস্থ শ্রেণীর বর্জন, বহিষ্কার বা নির্মূলের অনুমোদন দেওয়া।
সার্বীয় জাতীয়তাবাদ ঠিক এভাবেই কাজ করে। সার্ব ও বসনিয়াকদের অভিন্ন জাতিগত বংশধারা থাকা সত্ত্বেও, এটি অর্থোডক্স খ্রিস্টান সার্বদের একটি স্বতন্ত্র ও সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
যদিও বসনিয়াকরা বলকান অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠী, যাদের পূর্বপুরুষেরা ৫০০ বছরের অটোমান শাসনকালে ক্রমান্বয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিল, সার্বীয় জাতীয়তাবাদী ভাষ্য তাদেরকে জাতীয় সত্তা থেকে বিতাড়িত করে এবং খ্রিস্টধর্মের বিশ্বাসঘাতক, “তুর্কি” এবং ফলস্বরূপ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নিজেদের আবাসভূমি বলে আসা ভূমির দখলদার হিসেবে নতুনভাবে চিত্রিত করে।
একবার বিদেশী হিসেবে চিহ্নিত করা হলে, তাদের গণহত্যা ও বাস্তুচ্যুতিকে জাতীয় ও ধর্মীয় সুরক্ষার কাজ হিসেবে ন্যায্যতা দেওয়া যেতে পারে।
প্রচলিত ধারণার বিপরীতে, সার্বীয় জাতীয়তাবাদ ১৯৯০-এর দশকে প্রথম রাজনৈতিক গতি লাভ করেনি। এর একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, চেতনিক নামে পরিচিত রাজতন্ত্রপন্থী সার্বীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন বসনীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে একটি জাতিগত নির্মূল অভিযান চালিয়েছিল। ‘ক্রাইমস এগেইনস্ট বসনীয় মুসলিমস ১৯৪১-১৯৪৫’ গ্রন্থে ঐতিহাসিক সেমসো তুজাকোভিচ নথিভুক্ত করেছেন যে, গ্রাম ও বাড়িঘর পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছিল এবং প্রায় ১,০০,০০০ মুসলিম বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করা হয়েছিল, যা ছিল বসনিয়ার এক স্বল্প-পরিচিত গণহত্যা।
চরম ডানপন্থী পুনরুজ্জীবন
অ-সার্বীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি চেতনিকদের অবজ্ঞা এবং একটি “জাতিগতভাবে বিশুদ্ধ” সার্বীয় রাষ্ট্র গঠনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে সেই জাতিগত চিন্তাধারার সাথে তুলনা করা হয়েছে, যা নাৎসিদের উন্টারমেনশ (অ-আর্য “উপমানব”) ধারণা এবং একচেটিয়া জার্মান লেবেনস্রাউম (জীবনের স্থান) প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার ভিত্তি ছিল।
সুতরাং, ১৯৯০-এর দশকের বসনীয় গণহত্যা কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা বা জাতিগত সংঘাতের স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ ছিল না, বরং এটি ছিল অশ্বেতাঙ্গদের নিয়ন্ত্রণের এক অত্যন্ত ইউরোপীয় পদ্ধতির বলকানীয় বহিঃপ্রকাশ।
সার্বীয় জাতীয়তাবাদকে একটি বর্ণবাদী মতাদর্শ ও গণহত্যার যুক্তি হিসেবে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। এটি বসনিয়ার ঘটনাকে বর্ণচিন্তা দ্বারা চালিত গণহত্যার এক দীর্ঘ ইতিহাসের অংশ করে তোলে, যার মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ফিলিস্তিনি জনগণের ওপর চলমান গণহত্যা, নাকবা, হলোকাস্ট, বসতি স্থাপনকারী-ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রজুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নির্মূল এবং আরও অগণিত ঔপনিবেশিক গণহত্যা।
এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে উপলব্ধিকে আরও শাণিত করতে এবং উদীয়মান উগ্র ডানপন্থীদের দ্বারা সার্বীয় জাতীয়তাবাদের পুনরুজ্জীবন ও মহিমান্বিতকরণের ফলে সৃষ্ট গণহত্যাজনিত বিপদগুলো দেখতে সাহায্য করে।
অনেক ইউরোপীয়ের কাছে বসনিয়ার গণহত্যা প্রায় অজানা এক ইতিহাস। তবে সমসাময়িক উগ্র ডানপন্থী আন্দোলনগুলোর কাছে এটি খুবই পরিচিত- এমনকি প্রশংসিতও।
গণহত্যার সময় বসনীয় সার্ব বাহিনীর মনোবল বাড়ানোর জন্য লেখা একটি সার্ব জাতীয়তাবাদী গান “রিমুভ কাবাব” নামে একটি আন্তর্জাতিক উগ্র-ডানপন্থী মিমে পরিণত হয়েছে। ২০১৯ সালে ব্রেন্টন ট্যারান্ট ক্রাইস্টচার্চের মসজিদের দিকে যাওয়ার পথে গানটি বাজিয়েছিলেন, যেখানে তিনি ৫১ জন মুসলিম মুসল্লিকে হত্যা করেন। তার ইশতেহারে তিনি নিজেকে একজন “কাবাব অপসারণকারী” হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ট্যারান্ট একা ছিলেন না। তার অনুপ্রেরণা ও সহযোগী শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী অ্যান্ডার্স ব্রেইভিক, যিনি ২০১১ সালে নরওয়েতে ৭৭ জনকে হত্যা করেছিলেন, তার ইশতেহার জুড়ে বারবার সার্বিয়ার কথা উল্লেখ করেন। তিনি বসনীয় গণহত্যার সময়কার সার্বিয়ার রাষ্ট্রপতি এবং সাজাপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধী রাদোভান কারাদজিচকে একজন “সম্মানিত ক্রুসেডার এবং ইউরোপীয় যুদ্ধবীর” হিসেবে প্রশংসা করেন।
মূলধারায় ফিরে আসা
এই ধরনের উল্লেখগুলো গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এগুলো এমন এক আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক কল্পনাকে উন্মোচন করে , যেখানে ইউরোপীয় মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো গণহত্যা এমন এক ইতিহাস যা প্রশংসার যোগ্য এবং বর্তমানেও তা অব্যাহত রাখা হয়।
এই বিন্যাস শুধু ইশতেহারেই নয়, জাতীয়তাবাদী মতাদর্শেও দেখা যায়। সার্বীয় জাতীয়তাবাদের আখ্যান কাঠামোটি ইউরোপীয় উগ্র-ডানপন্থীদের মধ্যেও অনুকরণ করা হয়: অশ্বেতাঙ্গ শ্রেণীগুলোকে জাতীয় সমষ্টি থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং অভিবাসী, পরিযায়ী ও আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
তাদের প্রকৃত ধর্মবিশ্বাস নির্বিশেষে, তাদেরকে মুসলিম হিসেবে জাতিগতভাবে চিহ্নিত করা হয়। শ্বেতাঙ্গদের ধারাবাহিকতা ও অস্তিত্ব রক্ষার জন্য বিতাড়ন ও সহিংসতাকে অপরিহার্য হিসেবে দেখানো হয়।
এর সবচেয়ে সুস্পষ্ট উদাহরণ আমরা যুক্তরাজ্যে দেখতে পাই, যেখানে কিছু উগ্র-ডানপন্থী গোষ্ঠী প্রধানত অভিবাসী এবং অভিবাসীদের আশ্রয়কেন্দ্রগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়। অভিবাসীদের দ্বারা সংঘটিত সহিংসতাকে নিয়মিতভাবে “মুসলিম সহিংসতা” হিসেবে জাতিগতভাবে চিহ্নিত করা হয় এবং উগ্র-ডানপন্থী সমাবেশগুলোতে ইসলাম ধারাবাহিকভাবে বিদ্বেষের প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উঠে আসে। “পুনঃঅভিবাসন” অভিবাসন নীতির একটি মূল স্তম্ভ হিসেবে আবির্ভূত হয়, যেখানে সহিংসতাকে একটি শ্বেতাঙ্গ, খ্রিস্টান রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা হিসেবে তুলে ধরা হয়।
বিশ্বজুড়ে শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী আন্দোলনের পুনরুত্থানের প্রেক্ষাপটে সার্বীয় জাতীয়তাবাদের উত্তরজীবী প্রভাব বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই যে, বসনীয় গণহত্যার আদর্শিক কাঠামোটি এর অন্যতম একনিষ্ঠ প্রবক্তার মৃত্যুর পরেও টিকে আছে।
ম্লাদিচ মারা গেছেন। এতদিনে আমাদের জেনে যাওয়া উচিত যে, এতে মুসলমানরা আরও নিরাপদ হয় না।
গণহত্যা কখনোই কোনো একক ব্যক্তি দ্বারা সংঘটিত হয় না, কিংবা এর সবচেয়ে কুখ্যাত স্থপতিরা মারা গেলে, কারারুদ্ধ হলে বা আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের সম্মুখীন হলে এর জাতিগত যুক্তিগুলোও বিলুপ্ত হয়ে যায় না। সেগুলো টিকে থাকে।
তারা হয়তো রাজনৈতিক জীবনের প্রান্তিক অবস্থানে চলে যান, কিন্তু সাংস্কৃতিক স্মৃতির মধ্য দিয়ে তাদের আনাগোনা অব্যাহত থাকে। আর যখন রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূল হয়, তখন তাদের মূলধারায় ফিরিয়ে এনে রাজনৈতিক ও সংসদীয় ক্ষমতা দেওয়া হয়।
এই বাস্তবতাকে স্বীকার করাই হলো মূল কাজ। তা না করলে, আমরা উগ্র-ডানপন্থী রাজনীতির দ্বারা বিভ্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকব এবং ইউরোপে আবারও গণমৃত্যু ও বিতাড়নের সম্ভাবনা তৈরি করছে এমন পরিস্থিতি সম্পর্কে অজ্ঞাত থাকব।
ম্লাদিচ মারা গেছেন। কিন্তু তিনি যে বিপদের প্রতীক ছিলেন, তা নয়।
- ডক্টর আমিনা শরীফ: মুসলিম-বিরোধী বর্ণবাদের একজন গবেষক। তিনি হিজাব রাজনীতি, চরমপন্থা-প্রতিরোধ এবং রাস্তায় মুসলিম-বিরোধী সহিংসতার বিষয়ে আগ্রহী। সূত্র: মিডল ইস্ট আই

