ফিলিস্তিনিদের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ধ্বংসসাধন কোনোভাবেই শুধু গাজা বা অধিকৃত পশ্চিম তীরে সীমাবদ্ধ নয়।
পশ্চিম তীরে ডাক্তারদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি, ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি নাগরিক এবং ইসরায়েলি হাসপাতালে কর্মরত ডাক্তারদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে একটি প্রচারণা শুরু করা হয়েছে।
লেবাননে আহত এক সৈনিকের আত্মীয়দের দ্বারা সর্বশেষ এই আন্দোলনটি শুরু হয়েছিল।
গাজা যুদ্ধবিরতির বিরোধী এবং যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সমর্থক একটি ফোরামের সভাপতি ইয়োশুয়া শানি দাবি করেছেন, হাইফার রামবাম হেলথ কেয়ার ক্যাম্পাসে তার ভাগ্নে আরব কর্মীদের দ্বারা দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন।
এক্স-এ করা একটি পোস্টে শানি বলেছেন, কর্তব্যরত নার্সরা সবাই “আরবিভাষী” ছিলেন, যারা রোগীর পানির অনুরোধ উপেক্ষা করে তাকে বিছানায় “সার্ডিনের মতো” উল্টেপাল্টে দেন, এতে তার মাথা বিছানায় ঠুকে যায়।
রামবামের হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে যে, এই রোগীকে ‘অনুপযুক্ত’ চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল।
গল্পটা সেখানেই শেষ হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু তা হয়নি।
প্রকাশ্য উস্কানি
ইসরায়েলে শীঘ্রই এই বিতর্ক শুরু হলো যে, আরবদের আদৌ ডাক্তারি করার অনুমতি দেওয়া উচিত কিনা, ইহুদি হাসপাতালে আরবিতে কথা বলা তো দূরের কথা।
“একজন সৈনিককে হাসপাতালে তার প্রতিপক্ষের ভাষা শুনতে হওয়া উচিত নয়… এই দেশে যা ঘটছে তা রীতিমতো পাগলামিতে পরিণত হয়েছে। একটি কক্ষে একজন সৈনিক একা – আর সবাই আরবিভাষী,” বলেছেন ইসরায়েলি সাংবাদিক বোয়াজ গোলান।
নেসেটের একজন সদস্য ইতিবাচক পদক্ষেপের হিব্রু শব্দটিকে- যার আক্ষরিক অর্থ “সংশোধনমূলক বৈষম্য”- ব্যবহার করে এটিকে “ক্ষতিকর বৈষম্য” হিসেবে নতুন রূপ দিয়েছেন।
“আরব ডাক্তারদের বিষয়ে এবং আমাদের সেবায় নিয়োজিত সন্তানদের ক্ষতিসাধনকারী ক্ষতিকর বৈষম্যের বিষয়েও আমি আপনাদের জন্য লড়াই চালিয়ে যাব। যতক্ষণ না আমরা পরিস্থিতির সমাধান করছি, বৈষম্য দূর করছি এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের সন্ত্রাসী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আসা শিক্ষার্থীদের ইসরায়েলের হাসপাতালগুলোতে ভর্তি হওয়া বন্ধ করছি, ততক্ষণ আমি হাল ছাড়ব না,” বলেছেন লিকুদ দলের এমকে মোশে সা’দা।
আইনজীবী এবং লিকুদ দলের সাবেক সাংসদ ওসনাৎ মার্ক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থেকে সকল ফিলিস্তিনি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের অপসারণের আহ্বান জানিয়েছেন: “আমাদের কেবল এই চিকিৎসা পেশাটিকে- ফার্মাসিস্ট, নার্সদের- ইহুদিকরণ করা দরকার। আপনি হাসপাতালে গেলে আপনার প্রায় মনে হবে যেন আপনি রামাল্লায় আছেন।”
গত বছর প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুসারে, মার্ক ইসরায়েলের প্রায় এক-চতুর্থাংশ চিকিৎসক, ২৭ শতাংশ নার্স ও দন্তচিকিৎসক এবং অর্ধেকেরও কম ফার্মাসিস্টের কথা বলছিলেন।
নতুন নিবন্ধিত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা বাড়লেও, বর্তমানে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। প্রায় ৫,০০০ প্রশিক্ষিত চিকিৎসক চাকরি পাচ্ছেন না, কারণ তাদের জন্য ইন্টার্নশিপের সুযোগ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এবং অনেকেই দেশত্যাগের কথা ভাবছেন।
নিপীড়নের একটি ঢেউ
ইসরায়েলি স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কর্মরত ফিলিস্তিনিরা বর্ণবাদী হামলার শিকার হচ্ছেন।
কোনো সরকারি তথ্য না থাকলেও, মানবাধিকার সংস্থা ‘ফিজিশিয়ানস ফর হিউম্যান রাইটস-ইসরায়েল’ (পিএইচআরআই) ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে অন্তত ১৫টি হাসপাতাল এবং ইসরায়েলের চারটি স্বাস্থ্য রক্ষণাবেক্ষণ সংস্থার সবকটিতেই ফিলিস্তিনি ডাক্তারদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক শুনানির ওপর নজর রেখেছে।
এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দলটি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছে যে, “প্রকাশিত মতামত বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কার্যকলাপের প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি কর্মীদের লক্ষ্য করে ইসরায়েলের সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় নিপীড়নের একটি ঢেউ দেখা গেছে, যার মধ্যে শুনানি, শাস্তিমূলক তদন্ত, নিষেধাজ্ঞা এবং বরখাস্ত অন্তর্ভুক্ত।”
আমি ফিলিস্তিনি ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং নাম প্রকাশ না করার শর্তে তাদের একজন আমাকে যা বলেছেন তা নিচে তুলে ধরছি।
একবার আমার কাছে একজন রোগী চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন এবং আমার নাম দেখে ও সেটি আরবি জেনে তিনি হতবাক হয়ে যান। তিনি বিদ্রূপ করে বলতে শুরু করেন, ‘একজন আরব আমার চিকিৎসা করতে চায়! আমি তাকে একদমই চাই না।’ এরপর তিনি আমার বিরুদ্ধে উদ্ধত, জঘন্য বর্ণবাদী মন্তব্য করতে থাকেন যা আমি পুনরাবৃত্তি করতে চাই না।
যে বিষয়টি আমাকে আরও বেশি বিচলিত করেছিল তা হলো তার মধ্যে প্রদর্শিত অধিকারবোধ। কোনো রকম লজ্জা বা দ্বিধা ছাড়াই পুরো মেডিকেল টিমের সামনে সে সম্পূর্ণ স্বাচ্ছন্দ্যে এই সমস্ত কথা বলছিল।
ডাক্তার তার ম্যানেজারকে ঘটনাটি জানালেন এবং রোগীর নাম ও আইডি নম্বরও দিলেন, কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হলো না। ম্যানেজার তবুও তাকে গ্রহণ করে চিকিৎসা করতে ইচ্ছুক ছিলেন।
এর বিপরীতে, একজন রোগী ডাক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করলে হাসপাতালের সচিবের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ কঠোর। সচিবের মতে, অভিযোগটি হয়তো ডাক্তারের পক্ষ থেকে বর্ণবাদের কারণে করা হয়েছে।
“সবাই অভিযোগটিকে ‘গুরুত্ব সহকারে’ নিতে শুরু করেছিল, যদিও অভিযোগটিতে প্রথম থেকেই বর্ণবাদের কোনো অভিযোগ ছিল না,” ডাক্তার বললেন।
‘ভালো আরব’
চিকিৎসকেরা বলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের চেষ্টা বাড়ছে। হিব্রুভাষী রোগীরা আরবি বলতে শুনলে অবাক হন।
ব্যক্তিগতভাবে, আরবিতে কথা বলায় আমি কোনো দোষ দেখি না। একবার একজন আমাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘আপনি আমার সামনে আরবিতে কথা বলছেন কেন?’ আমি উত্তর দিয়েছিলাম, ‘আপনি আমার সামনে হিব্রুতে কথা বলছেন কেন? যদি বুঝতে চান, তাহলে গিয়ে আরবি শিখুন।’
এই ডাক্তার ইহুদি ইসরায়েলি রোগীদের সামনে আরবিতে কথা বলা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অনড় ছিলেন।
হিব্রু ভাষায় যত্ন করে সাজানো শব্দ দিয়ে আমাদের অবস্থানের ন্যায্যতা প্রমাণ করার কোনো কারণ আমি দেখি না। যারা চায় আমরা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনার অধীনে কেবল কর্মী হিসেবে কাজ করি, তাদের কাছে আমাদের আরবি ভাষার কৈফিয়ত চাওয়ার কোনো অধিকার নেই,” তিনি আমাকে বললেন।
ইসরায়েলি নাগরিকত্ব থাকা আরেকজন ফিলিস্তিনি ডাক্তার পিএইচআরআই (PHRI)-কে বলেছেন : “ব্যবস্থাটি আপনাকে বলে… আপনি আরব হতে পারেন… কিন্তু আপনাকে হতে হবে… ‘ভালো আরব’। যে আরবরা কোনোমতে একটি কর্মজীবন গড়ে তুলতে এবং আরও উচ্চ পদে পৌঁছাতে সক্ষম হন… তাদের পতাকা, সৈন্য এবং যে আতশ কাঁচের নিচে তারা প্রতিনিয়ত থাকেন, সেগুলোর সাথে মানিয়ে নিতে হয়।”
আপনাকে এটা মেনে নিতে হবে যে, ফিলিস্তিনি হওয়ার কারণে আপনার কর্মজীবনের উন্নতি আরও কঠিন হবে এবং এ নিয়ে আপনার অভিযোগ করা উচিত নয়।
আমি সাধারণত ঐতিহাসিক তুলনা এড়িয়ে চলি। প্রতিটি সংঘাতেরই নিজস্ব ভয়াবহতা আছে, কিন্তু এটা না ভেবে থাকা প্রায় অসম্ভব যে, ১৯৩৮ সালে নাৎসি কর্তৃপক্ষ জার্মানিতে ইহুদি চিকিৎসকদের চিকিৎসা করার লাইসেন্স কেড়ে নিয়েছিল এবং শুধুমাত্র অল্প কয়েকজনকে একান্তভাবে ইহুদি রোগীদের চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিল।

