২০২৫ সালে বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর বিক্রি হয়েছিল ৭৯১.৭ বিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫.৬ শতাংশ বেশি। ২০২৬ সালে এই বাজার আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
চিপশিল্পের বিস্তারও তার কৌশলগত গুরুত্বের সাক্ষ্য দেয়। ২০২৫ সালে বিশ্বে সেমিকন্ডাক্টর বিক্রি হয়েছিল ৭৯১.৭ বিলিয়ন ডলারের, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫.৬ শতাংশ বেশি। ২০২৬ সালে এই বাজার আরও দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এই প্রবৃদ্ধির পেছনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অবকাঠামোর চাহিদা বড় ভূমিকা রাখছে, বিশেষ করে মেমোরি চিপের ক্ষেত্রে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের জটিলতাও এর বিশেষত্ব। এর একটি স্তর–চিপ ডিজাইন, যেখানে মেধা ও সফটওয়্যার সক্ষমতা প্রধান। দ্বিতীয় স্তর ওয়েফার ফ্যাব্রিকেশন; যেখানে অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি, বিপুল মূলধন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ এবং বিশুদ্ধ পানির প্রয়োজন। তৃতীয় স্তর অ্যাসেম্বলি, প্যাকেজিং ও টেস্টিং। একটি আধুনিক ফ্যাব নির্মাণে ১০ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত প্রাথমিক বিনিয়োগ লাগতে পারে। ফলে চিপশিল্পে প্রবেশের পথ সব দেশের জন্য এক নয়; সক্ষমতা ও সম্পদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য শৃঙ্খলের উপযুক্ত স্তর বেছে নেওয়াই বাস্তবসম্মত কৌশল।
এই বাস্তবতার মধ্যেই ভারত গত কয়েক বছরে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে একটি সুদূরপ্রসারী জাতীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ভারতের বড় শক্তি ছিল চিপ ডিজাইনে। দেশটির সরকারের হিসাবে, বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ চিপ-ডিজাইন প্রতিভার উৎস ভারত। বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ ও পুনের মতো প্রযুক্তিকেন্দ্রে বহুদিন ধরে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। কিন্তু, ডিজাইনের এই শক্তির সঙ্গে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতার একটি ফাঁক ছিল। সেই ব্যবধান কমাতেই, ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ৭৬ হাজার কোটি রুপির ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশন অনুমোদিত হয়।
ভারতের লক্ষ্য এখন শুধু একটি বা দুটি চিপ কারখানা স্থাপন করা নয়, ধীরে ধীরে একটি পূর্ণাঙ্গ সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। ২০২৬ সালে অনুমোদিত ‘সেমিকন ২.০’ কর্মসূচিতে—ডিজাইন, যন্ত্রপাতি ও উপকরণ, ফ্যাব্রিকেশন, প্যাকেজিং, গবেষণা এবং দক্ষতা উন্নয়নকে একই কাঠামোর মধ্যে আনা হয়েছে। গুজরাটে টাটা-পিএসএমসি-এর ফ্যাব প্রকল্প, মাইক্রনের প্যাকেজিং উদ্যোগ এবং আসাম ও গুজরাটে অন্যান্য প্রকল্প এই বৃহত্তর অভিযানের অংশ।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ভারতের এই অগ্রযাত্রা সুদূরপ্রসারি পরিকল্পনায় এগিয়ে চলছে। ফ্যাব প্রতিষ্ঠা ধীর, ব্যয়বহুল এবং প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল। দক্ষ জনবলের ঘাটতিও বড় চ্যালেঞ্জ। টাটা দুই শতাধিক কর্মীকে তাইওয়ানে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠিয়েছে—এ ঘটনা দেখায় যে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি মানবসম্পদ গড়ে তোলাও কতটা জরুরি। ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়: সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রবেশ কোনো একক প্রকল্পের বিষয় নয়। এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি নীতি, দক্ষতা, গবেষণা, আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব এবং শিল্পের প্রতিটি স্তরে ধৈর্যশীল বিনিয়োগ প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য এই শিল্পের গুরুত্ব মূলত অর্থনীতির বহুমুখীকরণের প্রশ্নে। দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি এখনো তৈরি পোশাক খাত থেকে আসে। এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশ কিছুটা অতিরিক্ত প্রস্তুতির সময় পেয়েছে। এই সময়কে শুধু স্বস্তির অবকাশ হিসেবে দেখলে চলবে না; নতুন উচ্চ-মূল্য সংযোজনকারী শিল্পের ভিত্তি তৈরির সুযোগ হিসেবেও দেখতে হবে।
বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর যাত্রা অবশ্য শূন্য থেকে শুরু হচ্ছে না। দেশে কয়েকশ’ চিপ ডিজাইনার কাজ করছেন এবং উলকাসেমি-সহ কিছু প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক বাজেটে চিপ ডিজাইন, টেস্টিং ও প্যাকেজিংয়ের কাঁচামালে কর-সুবিধার প্রস্তাব এবং জাতীয় পর্যায়ে সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে নীতিগত আলোচনা ইঙ্গিত দেয় যে বিষয়টি সরকারের মনোযোগে এসেছে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে ‘ডিজাইন-ফার্স্ট’ কৌশল। চিপ ডিজাইনের জন্য বহু বিলিয়ন ডলারের ফ্যাব প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন দক্ষ প্রকৌশলী, আধুনিক সফটওয়্যার, গবেষণার পরিবেশ এবং বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংযোগ। এর পরের ধাপে অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং ও প্যাকেজিংয়ে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। মালয়েশিয়ার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দেখায়, ধাপে ধাপে এগিয়ে প্যাকেজিং থেকে নকশা ও আরও উচ্চতর প্রযুক্তির দিকে যাওয়া সম্ভব।
এখানেই ভারত ও বাংলাদেশের সহযোগিতার একটি স্বাভাবিক ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে। ভারতের রয়েছে বৃহৎ প্রযুক্তিবাজার, বিস্তৃত ডিজাইন দক্ষতা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং দ্রুত বিকশিত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন ও প্যাকেজিং অবকাঠামো।
বাংলাদেশের রয়েছে তরুণ প্রকৌশল জনশক্তি, তুলনামূলক ব্যয়সাশ্রয়ী মেধাশ্রম এবং নতুন প্রযুক্তিখাতে প্রবেশের প্রয়োজন ও সম্ভাবনা। দুই দেশকে একই শিল্পে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা সহযোগিতা, শিল্প-প্রশিক্ষণ, যৌথ বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার মাধ্যমে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে।
তবে বাংলাদেশের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। দেশে প্রকৌশল স্নাতকের সংখ্যা বাড়লেও—শিল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী, বিশেষায়িত দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। আধুনিক ভিএলএসআই প্রশিক্ষণ, সেমিকন্ডাক্টর ফিজিক্স, ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন সফটওয়্যার এবং ব্যবহারিক গবেষণার সুযোগ বাড়াতে হবে। সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে অত্যন্ত বিশুদ্ধ পানি, যাকে সাধারণত আল্ট্রা-পিওর ওয়াটার (ডব্লিউপিও) বলা হয়, মূলত চিপ তৈরির সময় ওয়েফার পরিষ্কার করার জন্য প্রয়োজন হয়। কারণ, সেমিকন্ডাক্টর চিপ তৈরিতে অতি ক্ষুদ্র ধুলিকণা বা রাসায়নিক দূষণও ক্ষতি করতে পারে। তাই ওয়েফার পরিষ্কার ও দূষণমুক্ত রাখতে বিপুল পরিমাণ অতি-বিশুদ্ধ পানি প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ, উন্নত লজিস্টিকস, ক্লিনরুম-সক্ষম শিল্পাঞ্চল এবং মেধাস্বত্ব সুরক্ষার আন্তর্জাতিক মানও নিশ্চিত করা জরুরি।
সবচেয়ে বড় ভুল হবে শুরুতেই একটি ব্যয়বহুল ফ্যাব নির্মাণকে সাফল্যের একমাত্র প্রতীক মনে করা। বাংলাদেশের প্রয়োজন নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী মূল্য শৃঙ্খলে জায়গা তৈরি করা—প্রথমে ডিজাইন ও দক্ষতা, তারপর প্যাকেজিং ও টেস্টিং, এবং সময়ের সঙ্গে আরও উন্নত সক্ষমতার দিকে অগ্রসর হওয়া।
সেমিকন্ডাক্টর বাংলাদেশের জন্য রাতারাতি তৈরি পোশাকের বিকল্প হয়ে উঠবে না। ২০৩০ সালের সম্ভাব্য রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রাও এখনো প্রত্যাশা, অর্জিত বাস্তবতা নয়। কিন্তু আগামী দিনের অর্থনীতিতে প্রযুক্তির শুধু ব্যবহারকারী হয়ে থাকাও যথেষ্ট হবে না। প্রযুক্তি নির্মাণের বিশ্বব্যাপী শৃঙ্খলে নিজেদের জায়গা করে নিতে হবে।
সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ভারতের অগ্রযাত্রা এই অঞ্চলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে: উচ্চপ্রযুক্তির শিল্প গড়ে ওঠে দীর্ঘ প্রস্তুতি, নীতির ধারাবাহিকতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে। বাংলাদেশের সামনে তাই সুযোগ রয়েছে ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরি করে এবং নিজেদের শক্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি পথ নির্মাণের। সিলিকনের এই নতুন যুগে দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশীর সাফল্যের পথ সহযোগিতার মধ্যেই আরও বিস্তৃত হতে পারে।
লেখক: মতামত- শোয়েব আরেফিন, বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড থেকে সংগৃহীত

