বহু চেষ্টা সত্ত্বেও বাংলাদেশে বেসরকারি বিনিয়োগ কেন বাড়ছে না, সেই প্রশ্নই তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান। পত্রিকায় প্রকাশিত মতামত লেখায় তিনি বলেন, বিনিয়োগ-সম্মেলন, অর্থনৈতিক অঞ্চলের উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা, বিদেশি বিনিয়োগে কর ছাড় আর ব্যবসাবান্ধব পরিবেশের বারবার প্রতিশ্রুতির পরও বেসরকারি বিনিয়োগ আটকে আছে।
লেখকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বহু বছর ধরে দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৩ থেকে ২৪ শতাংশে স্থির ছিল বেসরকারি বিনিয়োগ। এখন তা নেমে এসেছে প্রায় ২২ শতাংশে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর ফলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ শতাংশেরও নিচে। তাঁর প্রশ্ন, বছরের পর বছর বিনিয়োগ উৎসাহিত করার নীতির পরও ব্যবসায়ীরা কেন নতুন বিনিয়োগে এগোচ্ছেন না।
সেলিম রায়হানের মতে, এর একটি বড় কারণ ঘোষণা ও বাস্তবায়নের মধ্যকার ফারাক। বিনিয়োগের পরিবেশ এখনো অনুকূল হয়নি। জমি উন্নয়ন, অবকাঠামো ও নির্ভরযোগ্য ইউটিলিটি সংযোগে পিছিয়ে থাকায় অনেক অর্থনৈতিক অঞ্চল পুরোপুরি চালু হতে অনেক সময় নিচ্ছে। কর ব্যবস্থা এখনো খণ্ডিত ও অনেক ক্ষেত্রে বিকৃতিমূলক। এসব উদ্যোগ থেকে যে পরিমাণ বিনিয়োগ, বৈচিত্র্য কিংবা প্রযুক্তিগত উন্নয়ন আসার কথা ছিল, তা আসেনি। অথচ এর জন্য রাষ্ট্রকে বড় অঙ্কের রাজস্ব ছাড় দিতে হয়েছে।
বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এই দুর্বলতাকে আরও গুরুতর করেছে বলে মনে করেন তিনি। মহামারির পর প্রবৃদ্ধি তীব্রভাবে কমেছে। গত দুই বছরে তা এমন স্তরে নেমেছে, যা বাংলাদেশ দীর্ঘদিন দেখেনি। প্রায় চার বছর ধরে মূল্যস্ফীতি উচ্চ থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে, বাড়ছে উৎপাদন খরচ। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি কার্যত স্থবির ছিল, যদিও বিভিন্ন সরকারি তথ্যসূত্র ও সংশোধনের কারণে হিসাবে সামান্য ভিন্নতা আছে। প্রবাসী আয় ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়ে বৈদেশিক লেনদেনের হিসাব ও রিজার্ভকে সহায়তা দিলেও উৎপাদনশীল কর্মকাণ্ডের পুনরুদ্ধারের বিকল্প তা হতে পারে না।
কয়েক মাস ধরে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে, যা ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন পর্যায়ে। বিনিয়োগ-সংশ্লিষ্ট পণ্যসহ আমদানির চাহিদা দুর্বল। সরকারের রাজস্ব-সক্ষমতাও সংকুচিত হয়েছে। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি ও গ্যাস–সংকট অনিশ্চয়তা বাড়িয়েছে। প্রবৃদ্ধি ফেরাতে, কর্মসংস্থান তৈরি করতে, উৎপাদনশীলতা বাড়াতে ও রপ্তানি বহুমুখী করতে অনেক বেশি বেসরকারি বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু দুর্বল চাহিদা, ব্যয়বহুল অর্থায়ন, অনিশ্চিত জ্বালানি সরবরাহ ও অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতির মধ্যে উদ্যোক্তাদের দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতিতে যেতে হচ্ছে।
লেখক বলছেন, অনির্ভরযোগ্য জ্বালানি, ব্যয়বহুল লজিস্টিকস, জটিল কর ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনিশ্চয়তা, দুর্বল চুক্তি-বাস্তবায়ন, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা ও ব্যাংকিং খাতের দুর্বল সুশাসন নিয়ে ব্যবসায়ীরা বহু বছর ধরেই অভিযোগ করছেন। এখন নতুন বিষয় হলো, এসব সমস্যা মূল্যস্ফীতি, আর্থিক খাতের চাপ, সংকুচিত রাজস্ব-সক্ষমতা, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও দুর্বল চাহিদার সঙ্গে মিলে আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অর্থনীতির সহনক্ষমতা কমে যাওয়ায় পুরোনো কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো এখন বেশি বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
বিনিয়োগ মানে আজ সম্পদ খাটিয়ে কয়েক বছর পর প্রত্যাশিত ফল পাওয়া। তাই নীতি অনুমানযোগ্য থাকবে কি না, চুক্তি কার্যকর হবে কি না এবং সম্পদ নিরাপদ থাকবে কি না, তা ব্যবসায়ীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ম পরিষ্কার থাকলে কঠিন নীতির সঙ্গেও মানিয়ে নেওয়া যায়। কিন্তু কর, শুল্ক, জ্বালানির দাম বা আমদানি-বিধিতে সংস্কারের রোডম্যাপ অস্পষ্ট হলে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা কঠিন হয়ে পড়ে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হয়তো অনিশ্চয়তার একটি উৎস সরিয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক পালাবদল আপনাআপনি আস্থা ফেরায় না বলে মনে করেন লেখক। আইনশৃঙ্খলা, রাজনৈতিক সংঘাত, প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা এবং নিয়ম প্রয়োগে রাষ্ট্রের সক্ষমতার দিকে ব্যবসায়ীরা নজর রাখছেন। গণপিটুনি, নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষমতার যথেচ্ছ প্রয়োগ সম্পত্তি ও ব্যবসার নিরাপত্তা নিয়ে ধারণাকে প্রভাবিত করে, ফলে অর্থনীতির ওপরও এর মূল্য চুকাতে হয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশকে প্রতিযোগী গন্তব্যগুলোর সঙ্গে তুলনা করেন। আর দেশীয় বিনিয়োগকারীরা সম্প্রসারণ পিছিয়ে দেন।
সেলিম রায়হান বলেন, শুধু উচ্চ সুদহার কমালেই যথেষ্ট নয়। উল্লিখিত অনিশ্চয়তা থাকলে উদ্যোক্তারা কেবল সস্তা ঋণের আশায় ঋণ নেবেন না। মূল্যস্ফীতি উচ্চ থাকা অবস্থায় মুদ্রানীতি শিথিল করাও সহজ সমাধান নয়। ব্যবসায়ীদের সাশ্রয়ী অর্থায়ন দরকার, কিন্তু অকালে নীতি শিথিল করলে মূল্যস্ফীতি ও বিনিময় হারের চাপ আবার উসকে উঠতে পারে।
ব্যাংক খাতের সংকট পরিস্থিতি আরও কঠিন করেছে। বছরের পর বছর রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণ বিতরণ, দুর্বল সুশাসন, বারবার ঋণ পুনঃ তফসিল এবং প্রভাবশালী খেলাপিদের বিরুদ্ধে দুর্বল ব্যবস্থা মূলধন বণ্টনকে বিকৃত করেছে। খেলাপি ঋণ এখন মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। রাজনৈতিক যোগাযোগ থাকা ঋণগ্রহীতারা পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই বড় ঋণ পান, আর উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানকে সাধারণ বাণিজ্যিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এতে সীমিত মূলধন ভুলভাবে বণ্টিত হচ্ছে।
এর ক্ষতির বোঝা শেষ পর্যন্ত পড়ে আমানতকারীর ওপর, দুর্বল ব্যাংকের মাধ্যমে। করদাতার ওপর, ব্যাংকের পুনর্মূলধনের মাধ্যমে। দায়িত্বশীল ঋণগ্রহীতার ওপর, বাড়তি অর্থায়ন ব্যয়ের মাধ্যমে। আর পুরো অর্থনীতির ওপর, সংকুচিত ঋণপ্রবাহের মাধ্যমে। তাই বিনিয়োগ-এজেন্ডার কেন্দ্রে রয়েছে ব্যাংক সংস্কার। ব্যাংকের পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ কমানো এবং পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের যোগ্যতার শর্ত কঠোর করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রস্তাবকে তিনি সঠিক পথে পদক্ষেপ বলে মনে করেন। তবে ব্যাংক মালিকদের প্রতিরোধ সংস্কারের রাজনৈতিক অর্থনীতিকেই সামনে আনছে। রাজনৈতিক প্রভাব কমিয়ে ব্যাংক খাতের স্বাধীনতা জোরদারে আরও বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার দরকার।
কর ব্যবস্থাতেও একই সমস্যা দেখেন লেখক। দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৭ শতাংশের নিচে, যা বিশ্বের সর্বনিম্নগুলোর একটি। অথচ কর-ছাড়, বিবেচনামূলক সুবিধা ও দুর্বল প্রয়োগের কারণে অনেকে সুরক্ষা পাচ্ছেন, আর করজালের ভেতরে থাকা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তির ওপরই বোঝা অসমভাবে পড়ছে। সামগ্রিক রাজস্ব আহরণ অত্যন্ত দুর্বল থাকলেও ব্যবসায়ীদের আক্রমণাত্মক কর প্রশাসনের মুখে পড়তে হচ্ছে।
তাঁর মতে, করভিত্তি প্রসারিত করতে হবে, কর-পরিপালন সহজ করতে হবে, বিবেচনামূলক সুবিধা কমাতে হবে এবং প্রয়োগে ধারাবাহিকতা আনতে হবে। যেখানে প্রণোদনা যৌক্তিক, সেখানে তা হতে হবে স্বচ্ছ, সময়সীমাবদ্ধ এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের সঙ্গে যুক্ত। এ পর্যন্ত সংস্কার অনেক ক্ষেত্রেই দ্বিধাগ্রস্ত ও অসংগতিপূর্ণ ছিল, ব্যবস্থা বদলের বিশ্বাসযোগ্য রোডম্যাপ ছাড়াই।
এর মধ্যে সংরক্ষণবাদ বাড়ছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি কম অনুমানযোগ্য হয়ে উঠেছে, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা উল্লেখযোগ্য, আর জ্বালানি ও জাহাজভাড়া বাইরের ধাক্কার প্রতি ঝুঁকিপূর্ণ। বাংলাদেশকে এলডিসি উত্তরণের মুখোমুখি হতে হচ্ছে, পাশাপাশি পরিবেশগত শর্ত, শ্রম-মান ও সাপ্লাই চেইনে যথাযথ যাচাইয়ের বাধ্যবাধকতা কঠিন হচ্ছে। উন্নত লজিস্টিকস, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অধিকারী প্রতিযোগীরা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটানোর অপেক্ষায় বসে থাকবে না।
লেখকের মতে, বেসরকারি খাত একক চরিত্রের নয়। বাংলাদেশে প্রতিযোগিতামূলক রপ্তানিকারক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা এবং প্রকৃত বাণিজ্যিক ঝুঁকি নেওয়া উদ্যোক্তা আছেন। আবার এমন ব্যবসাও আছে, যাদের মুনাফা নির্ভর করেছে উচ্চ সুরক্ষা, অগ্রাধিকারমূলক অর্থায়ন, কর-ছাড়, নিয়ন্ত্রক সুবিধা কিংবা রাজনৈতিক যোগাযোগের ওপর। ফলে বেসরকারি খাতকে সহায়তার নামে নেওয়া নীতি অনেক সময় উৎপাদনশীল প্রতিষ্ঠানের বদলে সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠানকেই শক্তিশালী করে।
এটিই সংস্কারে বাধার কারণও ব্যাখ্যা করে। ব্যাংক সংস্কার ক্ষতিগ্রস্ত করে দুর্বল সুশাসনের সুবিধাভোগী ঋণগ্রহীতাদের। শুল্ক যৌক্তিকীকরণ প্রভাব ফেলে সুরক্ষায় অভ্যস্ত শিল্পে। কর সংস্কার চ্যালেঞ্জ করে ছাড়-ভোগীদের। প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়-প্রক্রিয়া হুমকিতে ফেলে বিশেষ সুবিধার ওপর নির্ভরশীল প্রতিষ্ঠানকে। সুবিধাভোগীরা সংখ্যায় কম হলেও প্রভাবশালী, আর ক্ষতির বোঝা ছড়িয়ে পড়ে ভোক্তা, করদাতা ও উৎপাদনশীল ব্যবসায়ীদের ওপর।
সেলিম রায়হান বলেন, সরকারের কাজ শুধু ‘ব্যবসাবান্ধব’ হওয়া নয়, বরং উৎপাদনশীল বিনিয়োগের বন্ধু হওয়া। এর জন্য আইনশৃঙ্খলা ফেরানো, নীতির অনুমানযোগ্যতা বাড়ানো, ব্যাংক খাতের সুশাসন মেরামত, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চিত, কর ব্যবস্থার সংস্কার এবং বাণিজ্যনীতিতে রপ্তানিবিরোধী প্রবণতা কমানো দরকার। অর্থনৈতিক অঞ্চলে নতুন ঘোষণা নয়, দরকার কার্যকর অবকাঠামো ও ইউটিলিটি।
শক্তিশালী স্বার্থগোষ্ঠীর মুখোমুখি হয়েও সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি বলে মত দেন তিনি। তাঁর মতে, আসল পরীক্ষা হলো, রাজনৈতিক যোগাযোগহীন একজন উদ্যোক্তা অনুমানযোগ্য নিয়ম, বাণিজ্যিক শর্তে ঋণ, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, ন্যায্য কর আচরণ এবং চুক্তি ও সম্পত্তির সুরক্ষা আশা করতে পারেন কি না। প্রণোদনার আরেকটি স্তর যোগ করার চেয়ে এই শর্তগুলো উন্নত করাই বেসরকারি বিনিয়োগ ফেরানোর বেশি বিশ্বাসযোগ্য পথ।
*লেখক পরিচিতি: ড. সেলিম রায়হান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক।

