বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নের গতি ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ; অন্যদিকে বৈশ্বিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, উচ্চ সুদের হার এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন দেশের আর্থিক খাতকে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। এই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে শুধু সহজ শর্তে ঋণ বিতরণের ওপর নির্ভরশীল থাকা আর কার্যকর কৌশল হতে পারে না। বরং প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি গঠনের মাধ্যমে একটি টেকসই অর্থায়ন কাঠামো তৈরি করাই সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার।
স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের শিল্প ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে ব্যাংকঋণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু অর্থনীতি যত বড় হয়েছে, ততই স্পষ্ট হয়েছে যে কেবল ব্যাংককেন্দ্রিক অর্থায়ন দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কারণ ব্যাংকের অধিকাংশ আমানত স্বল্পমেয়াদি হলেও শিল্পকারখানা, অবকাঠামো, প্রযুক্তি, জ্বালানি, কৃষির আধুনিকায়ন এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদনে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ। এই সময়গত অসামঞ্জস্য ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে এবং আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে বিভিন্ন সময়ে সহজ শর্তে ঋণ, পুনঃতফসিল ও বিশেষ সহায়তা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় এসব পদক্ষেপের তাৎক্ষণিক গুরুত্ব থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে একই নীতির ওপর নির্ভরতা আর্থিক শৃঙ্খলা দুর্বল করে। ঋণের গুণগত মান কমে যায়, ঝুঁকি মূল্যায়নের সংস্কৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং খেলাপি ঋণের প্রবণতা বাড়ে। ফলস্বরূপ প্রকৃত উৎপাদনশীল উদ্যোক্তা ও অদক্ষ ঋণগ্রহীতার মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের হার ৩২ শতাংশের বেশি। এটি শুধু ব্যাংক খাতের জন্য নয়, সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আর্থিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ECL পদ্ধতি বাস্তবায়ন এবং ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি আগেভাগে চিহ্নিত করা, আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদার করা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে আরও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো।
বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা কেবল উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং নির্ধারিত হয় প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, দক্ষ মানবসম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি সংগ্রহের সক্ষমতার মাধ্যমে। উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতিগুলো ইতোমধ্যে ব্যাংকঋণের পাশাপাশি করপোরেট বন্ড, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, প্রাইভেট ইকুইটি, স্টার্টআপ ফান্ড, গ্রিন ফাইন্যান্স এবং ডিজিটাল বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মকে অর্থায়নের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে গড়ে তুলেছে। এর ফলে উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলো শুধু ঋণের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন উৎস থেকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের সুযোগ পাচ্ছে।
বাংলাদেশেও এই পরিবর্তনের ভিত্তি ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), ডিজিটাল ক্রেডিট স্কোরিং, ই-কেওয়াইসি (e-KYC), স্বয়ংক্রিয় ঝুঁকি মূল্যায়ন, তথ্য বিশ্লেষণ এবং অনলাইন ঋণ ব্যবস্থাপনা যুক্ত হওয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ও নির্ভুলতা বাড়ছে। একই সঙ্গে প্রতারণা শনাক্তকরণ, গ্রাহক যাচাই এবং ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণেও প্রযুক্তির ব্যবহার বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি যেমন বাড়ছে, তেমনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও আনুষ্ঠানিক অর্থায়নের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে।
তবে প্রযুক্তির প্রকৃত শক্তি শুধু ঋণ দ্রুত বিতরণে নয়; বরং অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কতটা কার্যকরভাবে বিনিয়োগ হচ্ছে, তা নিশ্চিত করার মধ্যেই নিহিত। তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর বিশ্লেষণ এবং রিয়েল-টাইম পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণ ব্যবস্থাপনাকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং ফলপ্রসূ করে তুলতে পারে। এর মাধ্যমে শুধু জামানতের ওপর নির্ভর না করে উদ্যোক্তার ব্যবসায়িক সক্ষমতা, নগদ প্রবাহ, কর পরিশোধের ইতিহাস, ডিজিটাল লেনদেন এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ভিত্তিতে অর্থায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—অর্থনীতির ভবিষ্যৎ কি আরও বেশি ঋণ বিতরণের ওপর নির্ভর করবে, নাকি প্রযুক্তিনির্ভর দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি গঠনের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি তৈরি করা হবে? এই প্রশ্নের উত্তরই আগামী দশকের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতার গতিপথ নির্ধারণ করবে।
দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি গঠনের প্রশ্নটি এখন আর শুধু অর্থায়নের বিকল্প উৎস খোঁজার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মধ্যম আয়ের গণ্ডি পেরিয়ে একটি উদ্ভাবননির্ভর ও প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতিতে রূপান্তরের পূর্বশর্ত। শিল্পায়ন, অবকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্মার্ট কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, সেমিকন্ডাক্টর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী উৎপাদন খাতে বিনিয়োগের জন্য এমন অর্থায়ন প্রয়োজন, যার মেয়াদ দীর্ঘ এবং ব্যয় তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল। এই চাহিদা পূরণে স্বল্পমেয়াদি ব্যাংকঋণের ওপর অতিনির্ভরতা অর্থনীতিকে কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে দিতে পারবে না।
বিশ্বব্যাপী অর্থায়নের ধরন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। ব্যাংককেন্দ্রিক অর্থায়নের পাশাপাশি করপোরেট বন্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক, অবকাঠামো বন্ড, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল, প্রাইভেট ইকুইটি, ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড এবং প্রযুক্তিনির্ভর বিকল্প অর্থায়ন ব্যবস্থা ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে। এর ফলে উদ্যোক্তারা ব্যবসার ধরন ও ঝুঁকি অনুযায়ী বিভিন্ন উৎস থেকে মূলধন সংগ্রহের সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি ঋণের চাপও কমছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এই রূপান্তর অপরিহার্য। বর্তমানে দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় ব্যাংকঋণের অংশ অত্যন্ত বেশি, অথচ পুঁজিবাজার ও বন্ড বাজারের গভীরতা এখনও সীমিত। ফলে বৃহৎ শিল্প, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিনির্ভর নতুন উদ্যোগের জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের পর্যাপ্ত বিকল্প তৈরি হয়নি। এ বাস্তবতায় পুঁজিবাজারকে আরও কার্যকর, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলা এবং করপোরেট বন্ড বাজার সম্প্রসারণ এখন সময়ের দাবি।
প্রযুক্তি এই পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বিগ ডেটা অ্যানালিটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং মেশিন লার্নিং এখন শুধু গ্রাহকসেবা উন্নত করার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে না; বরং বিনিয়োগ ঝুঁকি মূল্যায়ন, ঋণগ্রহীতার সক্ষমতা বিশ্লেষণ, জালিয়াতি শনাক্তকরণ এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক প্রবণতা পূর্বাভাসেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তথ্যভিত্তিক এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা অর্থায়নকে আরও দক্ষ, নিরপেক্ষ এবং উৎপাদনমুখী করে তুলছে।
বাংলাদেশে ডিজিটাল আর্থিক সেবার দ্রুত বিস্তার এই পরিবর্তনের জন্য শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে। মোবাইল আর্থিক সেবা, তাৎক্ষণিক ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-কেওয়াইসি, অনলাইন হিসাব খোলা এবং স্বয়ংক্রিয় লেনদেন ব্যবস্থার ফলে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এখন প্রয়োজন এই ডিজিটাল অবকাঠামোকে বিনিয়োগ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন গঠনের সঙ্গে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করা।
বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (SME) বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হলেও অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তা পর্যাপ্ত জামানতের অভাবে অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন। আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিকল্প ক্রেডিট স্কোরিং, ডিজিটাল লেনদেনের ইতিহাস, কর পরিশোধের তথ্য এবং ব্যবসার নগদ প্রবাহ বিশ্লেষণ করে তাদের প্রকৃত সক্ষমতা মূল্যায়ন করা সম্ভব। এতে জামানতনির্ভর অর্থায়নের পরিবর্তে তথ্যনির্ভর অর্থায়নের সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।
একই সঙ্গে স্টার্টআপ অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কৌশলগত খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রযুক্তিনির্ভর নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো শুরুতে ব্যাংকঋণের পরিবর্তে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাইভেট ইকুইটির মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহ করে দ্রুত বিকশিত হয়েছে। বাংলাদেশেও তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষিপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যপ্রযুক্তি, শিক্ষা প্রযুক্তি এবং সবুজ প্রযুক্তিভিত্তিক উদ্যোগে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। সেজন্য বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা, কর-সুবিধা এবং দ্রুত নিয়ন্ত্রক অনুমোদন নিশ্চিত করা জরুরি।
ফিনটেক প্রতিষ্ঠানগুলোও আর্থিক খাতের রূপান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে তারা কম খরচে, দ্রুত এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দিচ্ছে। ভবিষ্যতে ওপেন ব্যাংকিং, নিরাপদ তথ্য বিনিময় এবং সমন্বিত ডিজিটাল আর্থিক অবকাঠামো গড়ে উঠলে ব্যাংক, ফিনটেক, বীমা এবং পুঁজিবাজারের মধ্যে আরও কার্যকর সংযোগ তৈরি হবে। এর ফলে ব্যক্তি ও ব্যবসা—উভয় ক্ষেত্রেই অর্থায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
তবে প্রযুক্তিনির্ভর অর্থায়নের প্রসারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষাকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থা যত বিস্তৃত হবে, সাইবার হামলা, তথ্য চুরি এবং আর্থিক জালিয়াতির ঝুঁকিও তত বাড়বে। তাই আন্তর্জাতিক মানের সাইবার নিরাপত্তা কাঠামো, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক তদারকি ছাড়া প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থার পূর্ণ সুফল অর্জন সম্ভব নয়।
আজকের বিশ্বে যে দেশ প্রযুক্তি, উদ্ভাবন এবং দীর্ঘমেয়াদি পুঁজিকে এক সুতোয় গাঁথতে পেরেছে, সেই দেশই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে রয়েছে। বাংলাদেশের জন্যও এখন সবচেয়ে বড় সুযোগ হলো—তরুণ জনগোষ্ঠী, দ্রুত বিস্তৃত ডিজিটাল অর্থনীতি এবং শিল্পায়নের ক্রমবর্ধমান চাহিদাকে একত্রিত করে এমন একটি অর্থায়ন কাঠামো গড়ে তোলা, যা শুধু বর্তমান প্রবৃদ্ধিকে নয়, আগামী কয়েক দশকের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকেও শক্তিশালী করবে।
বাংলাদেশের আর্থিক খাতকে আধুনিক ও টেকসই ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হলে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো সুশাসন প্রতিষ্ঠা। প্রযুক্তি যত উন্নতই হোক, যদি ঋণ অনুমোদন, ঝুঁকি মূল্যায়ন, তদারকি এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হয়, তবে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন সম্ভব হবে না। তাই আর্থিক খাতের সংস্কারকে কেবল প্রযুক্তি গ্রহণের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করতে হবে।
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানের ECL পদ্ধতি বাস্তবায়ন, ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি জোরদার এবং খেলাপি ঋণ কমাতে কাঠামোগত সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে ঋণের প্রকৃত ঝুঁকি আগেভাগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হবে এবং ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে করপোরেট সুশাসন নিশ্চিত করা, পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি বৃদ্ধি এবং ঋণ পুনরুদ্ধার ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা অপরিহার্য।
এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির বিকল্প উৎস সম্প্রসারণে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নিতে হবে। করপোরেট বন্ড, গ্রিন বন্ড, সুকুক, অবকাঠামো বন্ড, মিউচুয়াল ফান্ড এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে নীতিগত সংস্কার প্রয়োজন। বীমা, পেনশন ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কে উৎপাদনশীল বিনিয়োগে যুক্ত করতে পারলে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে।
পুঁজিবাজারকে আরও গভীর, স্বচ্ছ এবং প্রযুক্তিনির্ভর করে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের তথ্য প্রকাশ, করপোরেট সুশাসন, বিনিয়োগকারী সুরক্ষা এবং বাজার তদারকিতে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। এতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহের সক্ষমতা শক্তিশালী হবে।
ক্ষুদ্র, মাঝারি ও উদীয়মান উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের নতুন কাঠামো গড়ে তোলাও সময়ের দাবি। জামানতনির্ভর ঋণ ব্যবস্থার পাশাপাশি তথ্যনির্ভর ক্রেডিট মূল্যায়ন, ডিজিটাল লেনদেন বিশ্লেষণ এবং বিকল্প ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবস্থা চালু করলে সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারা সহজে অর্থায়নের সুযোগ পাবেন। বিশেষ করে প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ, কৃষি-উদ্ভাবন, স্বাস্থ্যসেবা, সবুজ জ্বালানি এবং রপ্তানিমুখী শিল্পকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের আওতায় আনতে হবে।
একই সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা, তথ্য সুরক্ষা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করা ভবিষ্যতের আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হবে। ডিজিটাল আর্থিক সেবা যত বিস্তৃত হবে, ততই তথ্য নিরাপত্তা, গ্রাহকের গোপনীয়তা এবং সাইবার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক মান অনুসরণ করতে হবে। প্রযুক্তির প্রতি মানুষের আস্থা গড়ে তোলার জন্য এটিই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন। প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে শুধু সফটওয়্যার বা অবকাঠামোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন তথ্য বিশ্লেষক, ঝুঁকি ব্যবস্থাপক, সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ, আর্থিক প্রযুক্তিবিদ এবং উদ্ভাবনী উদ্যোক্তা। তাই শিক্ষা, গবেষণা, কারিগরি প্রশিক্ষণ এবং শিল্প-শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সমন্বয় জোরদার করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরি হয়।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে ডিজিটাল আর্থিক সেবা, মোবাইল লেনদেন, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং উদ্যোক্তা উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন প্রয়োজন এই অর্জনকে দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি গঠনের সঙ্গে যুক্ত করা। অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে যদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর অর্থায়ন এবং সুশাসনকে একসঙ্গে স্থান দেওয়া যায়, তবে দেশের শিল্পায়ন আরও গতিশীল হবে, কর্মসংস্থান বাড়বে, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে এবং অর্থনীতি বহুমুখী ও সহনশীল ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী অধ্যায় নির্ধারিত হবে ঋণের পরিমাণ দিয়ে নয়, বরং সেই ঋণ ও পুঁজি কতটা উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে, কতটা প্রযুক্তিনির্ভর, কতটা স্বচ্ছ এবং কতটা দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সৃষ্টি করতে পারছে—তার ওপর। সহজ শর্তে ঋণ বিতরণ সাময়িকভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে গতি আনতে পারে, কিন্তু তা কখনোই একটি শক্তিশালী ও স্থিতিশীল অর্থনীতির স্থায়ী ভিত্তি হতে পারে না।
অতএব, বাংলাদেশের সামনে এখন যে পথটি সবচেয়ে বাস্তবসম্মত, তা হলো—ব্যাংকঋণনির্ভর অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে প্রযুক্তিনির্ভর দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি গঠনের একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা। সেখানে ব্যাংক, পুঁজিবাজার, ফিনটেক, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, উদ্যোক্তা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং আধুনিক প্রযুক্তি হবে একই উন্নয়ন-চক্রের অংশীদার। এই সমন্বিত রূপান্তরই বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আরও প্রতিযোগিতামূলক, উদ্ভাবননির্ভর এবং টেকসই প্রবৃদ্ধির নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে পারে। সহজ শর্তে ঋণ নয়, বরং আধুনিক প্রযুক্তির সহায়তায় দীর্ঘমেয়াদি পুঁজি গঠনই হোক আগামী দিনের অর্থনৈতিক নীতির মূল লক্ষ্য।

