বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ক্ষুদ্র, অতিক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি শিল্প -কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ)খাত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় উৎপাদন, দারিদ্র্য হ্রাস, নারী উদ্যোক্তা তৈরি এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে সচল রাখার ক্ষেত্রে এই খাতের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য CMSME খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছে।
কিন্তু সম্ভাবনাময় এই খাতের সামনে সবচেয়ে বড় বাধা এখনো পুঁজি। ব্যাংকের দরজায় ঘুরেও বহু উদ্যোক্তা প্রয়োজনীয় ঋণ পাচ্ছেন না। ফলে ব্যবসার সম্প্রসারণ থেমে যাচ্ছে, নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে না এবং অনেক সম্ভাবনাময় উদ্যোগ অকালেই ঝরে পড়ছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি এই সংকটের গভীরতাই তুলে ধরছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের জানুয়ারি-মার্চ ২০২৬ প্রান্তিকের CMSME অর্থায়ন প্রতিবেদনে দেখা যায়, মার্চ ২০২৬ শেষে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের CMSME (Cottage, Micro, Small and Medium Enterprise) ঋণের মোট স্থিতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ লাখ ৯৮ হাজার কোটি টাকা। আগের প্রান্তিকের তুলনায় এটি ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ এবং এক বছর আগের তুলনায় ১ দশমিক ৩৫ শতাংশ কম। একই সময়ে মোট ব্যাংকঋণের মধ্যে CMSME খাতের অংশ ছিল ১৫ দশমিক ৮৭ শতাংশ, যেখানে নিয়ন্ত্রক লক্ষ্যমাত্রা ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। অর্থাৎ নীতিগত লক্ষ্য ও বাস্তব ঋণপ্রবাহের মধ্যে এখনো উল্লেখযোগ্য ব্যবধান রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই ২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চের CMSME অর্থায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।
তবে চিত্রের আরেকটি দিকও রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৪৫৩টি উদ্যোগে মোট ৫২ হাজার ১০৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা CMSME অর্থায়ন করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ঋণ বিতরণ বেড়েছে ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ এবং ঋণগ্রহীতার সংখ্যা বেড়েছে ১৯ দশমিক ৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে অর্থ পৌঁছানোর ক্ষেত্রে কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে CMSME ঋণের মোট স্থিতি কমেছে এবং শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ২৪ দশমিক ০৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের মার্চে ২৬ দশমিক ০৪ শতাংশ হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, শুধু নতুন ঋণ বিতরণ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; বিদ্যমান ঋণের গুণগত মান, আদায় পরিস্থিতি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং উদ্যোক্তার পরিশোধ সক্ষমতার দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিএমএসএমই অর্থায়নসংক্রান্ত মাস্টার সার্কুলারে এ খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে ধাপে ধাপে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের মধ্যে মোট ঋণের ২৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণের পর প্রতি বছর অন্তত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ হারে এ অংশ বাড়িয়ে ২০২৯ সালের মধ্যে ২৭ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ২৫ দশমিক ৫০ শতাংশের অন্তর্বর্তী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তা ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতেও পৃথক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাসে সিএমএসএমই পুনঃঅর্থায়ন কাঠামো পুনর্গঠন, ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের উন্নয়নে আর্থিক খাতভিত্তিক তহবিল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর অংশ হিসেবে ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়নের জন্য ৩০০ কোটি টাকার তহবিল রাখা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ছোট উদ্যোক্তাদের কাছে অর্থের প্রবাহ বাড়ানো এবং উৎপাদনমুখী উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করা।
এরই ধারাবাহিকতায় জুন ২০২৬-এ কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধনের সংকট মোকাবিলায় ৫ হাজার কোটি টাকার আবর্তনশীল তহবিল নিয়ে ‘CMSME Working Capital Refinance Fund’ চালু করা হয়। এ ব্যবস্থায় অংশগ্রহণকারী ব্যাংকগুলো ৪ শতাংশ সুদে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা পাবে এবং উদ্যোক্তা পর্যায়ে ঋণের সর্বোচ্চ সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ শতাংশ। চলতি মূলধনের ঘাটতিতে থাকা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনা ও উৎপাদন অব্যাহত রাখতে এ তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে নীতিগত উদ্যোগের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার এখনো বড় ধরনের ফারাক রয়েছে। ২০২৫ সালের জুলাই-সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় সিএমএসএমই ঋণ বিতরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ওই সময়ে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে বিঘ্ন এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার চাপ ঋণপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নেয়।
এই পরিস্থিতি স্পষ্ট করে যে, শুধু পুনঃঅর্থায়ন তহবিল, প্রণোদনা বা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেই সিএমএসএমই অর্থায়নের সংকট দূর হবে না। প্রকৃত পরিবর্তন আনতে হলে নীতিগত সুবিধাগুলো উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করতে হবে। অতিরিক্ত নথিপত্র, কঠোর জামানত-শর্ত, দীর্ঘ যাচাই-বাছাই এবং বড় করপোরেট ঋণের প্রতি ব্যাংকের তুলনামূলক বেশি আগ্রহের কারণে অনেক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক উদ্যোক্তা এখনো প্রাতিষ্ঠানিক অর্থায়নের বাইরে রয়েছেন। তাই ঋণপ্রক্রিয়া সরলীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর যাচাই, নগদ প্রবাহভিত্তিক ঋণ মূল্যায়ন এবং কার্যকর ক্রেডিট গ্যারান্টি ব্যবস্থার মাধ্যমে ব্যাংকের শাখা থেকে তৃণমূল উদ্যোক্তার হাতে অর্থ পৌঁছানো নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ঋণ পাওয়ার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি হলো জামানত। বড় প্রতিষ্ঠানের জমি, ভবন কিংবা অন্যান্য স্থাবর সম্পদ থাকতে পারে। কিন্তু একজন নতুন বা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার প্রকৃত সম্পদ হতে পারে তার মেশিন, পণ্য, অর্ডার, বিক্রয়-রেকর্ড, গ্রাহকভিত্তি ও ব্যবসার ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এসব বিষয়কে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে ঋণ মূল্যায়নের সুযোগ এখনো সীমিত।
ফলে ব্যবসা ভালো হলেও জামানত দিতে না পারায় উদ্যোক্তা ঋণ থেকে বঞ্চিত হন। অনেকে আবার পরিবারের সম্পত্তি বন্ধক রেখে ঋণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। ব্যবসায় সামান্য ধাক্কা এলেই তখন শুধু প্রতিষ্ঠান নয়, উদ্যোক্তার পারিবারিক আর্থিক নিরাপত্তাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
এই বাস্তবতায় ক্রেডিট গ্যারান্টি ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও সহজলভ্য করা জরুরি। বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদ্যমান ক্রেডিট গ্যারান্টি কাঠামোকে এমনভাবে শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে ব্যাংক সম্পত্তির জামানতের পাশাপাশি উদ্যোক্তার ব্যবসার নগদ প্রবাহ, বিক্রয়, অর্ডার এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিতে পারে।
ব্যাংকের অনীহা কেন? ক্ষুদ্র ঋণ বিতরণে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয়ও একটি বাস্তব সমস্যা। একটি বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানকে বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়া এবং একই অর্থ কয়েকশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার মধ্যে বিতরণ করা এক বিষয় নয়। ছোট ঋণের ক্ষেত্রে গ্রাহক যাচাই, নথিপত্র, মাঠপর্যায়ের পরিদর্শন, হিসাব পর্যবেক্ষণ ও আদায়—প্রতিটি ধাপে ব্যাংকের তুলনামূলক বেশি সময় ও শ্রম ব্যয় হয়। ফলে ব্যাংক অনেক সময় বড় ও প্রতিষ্ঠিত গ্রাহকের দিকে বেশি আগ্রহী হয়।
এর সঙ্গে রয়েছে খেলাপি ঋণের ঝুঁকি। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে CMSME খাতে শ্রেণিকৃত ঋণের অনুপাত ২৬ দশমিক ০৪ শতাংশে উঠেছে, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ২৪ দশমিক ০৩ শতাংশের তুলনায় বেশি। এই পরিস্থিতি ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি-ভীতি বাড়ানোর যথেষ্ট কারণ তৈরি করেছে। কিন্তু এর সমাধান যদি অতিরিক্ত রক্ষণশীল ঋণনীতি হয়, তাহলে ভালো ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তারাও অর্থায়নের বাইরে চলে যাবেন। তাই প্রয়োজন ঝুঁকি এড়িয়ে চলা নয়, বরং ঝুঁকি পরিমাপের আধুনিক পদ্ধতি।
ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কাছে ব্যাংকঋণ অনেক সময় একটি দীর্ঘ প্রশাসনিক পরীক্ষার মতো। হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, করসংক্রান্ত নথি, ব্যবসার হিসাব, ব্যাংক বিবরণী, জামানতের কাগজসহ নানা নথি সংগ্রহ করতে গিয়ে অনেক উদ্যোক্তা শুরুতেই পিছিয়ে পড়েন। বিশেষ করে প্রান্তিক ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবসায়ীদের জন্য এই বাধা আরও বড়।
অথচ প্রযুক্তির যুগে একই তথ্য বারবার কাগজে চাওয়ার প্রয়োজন থাকার কথা নয়। ব্যাংক, কর কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায় নিবন্ধন ব্যবস্থা এবং অন্যান্য সরকারি তথ্যভান্ডারের মধ্যে নিরাপদ ও আইনসম্মত তথ্য-সমন্বয় গড়ে তোলা গেলে ঋণ আবেদন অনেক সহজ হতে পারে।
বর্তমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিও CMSME উদ্যোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে। মূল্যস্ফীতি, কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যয়, পরিবহন খরচ এবং দুর্বল বাজারচাহিদা ব্যবসার নগদ প্রবাহকে সংকুচিত করছে। একই সঙ্গে ঋণের ব্যয় বাড়লে কার্যকরী মূলধনের প্রয়োজন আরও বাড়ে।
বিশেষ করে আমদানিনির্ভর কাঁচামাল ব্যবহারকারী ক্ষুদ্র শিল্পগুলো বিনিময় হার ও আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতার কারণে বাড়তি চাপের মুখে পড়ে। ফলে একদিকে ব্যবসা চালাতে বেশি মূলধন প্রয়োজন হচ্ছে, অন্যদিকে ব্যাংক থেকে সেই অর্থ পাওয়া কঠিন হয়ে উঠছে। এ অবস্থায় স্বল্পমেয়াদি কার্যকরী মূলধনের পাশাপাশি উৎপাদনশীল খাতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নও জরুরি।
CMSME ঋণের খাতভিত্তিক বণ্টনেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অসামঞ্জস্য রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে মোট CMSME অর্থায়নের ৪৪ দশমিক ৯৩ শতাংশ গেছে বাণিজ্য খাতে। উৎপাদন খাতে গেছে ৩৪ দশমিক ৯৬ শতাংশ, যেখানে ন্যূনতম লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ শতাংশ। সেবা খাতে অর্থায়নের অংশ ছিল ২০ দশমিক ১১ শতাংশ।
এই প্রবণতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বাণিজ্য খাত অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও শুধু পণ্য কেনাবেচায় অর্থায়ন বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়ন সম্ভব নয়। মেশিন কেনা, কারখানা সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি সংযোজন, পণ্য উন্নয়ন, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিমুখী উৎপাদনে অর্থায়ন বাড়াতে হবে। কারণ উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগই দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ায়।
ব্যাংকের শাখায় কাগজের ফাইল হাতে নিয়ে দিনের পর দিন ঘোরার সংস্কৃতি বদলানোর সময় এসেছে। একজন উদ্যোক্তার ব্যাংক লেনদেন, ডিজিটাল বিক্রয়, করপরিশোধ, মোবাইল আর্থিক সেবা, ই-কমার্স লেনদেন এবং অন্যান্য বৈধ ব্যবসায়িক তথ্য বিশ্লেষণ করে তার ঋণযোগ্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও তথ্যভিত্তিক ক্রেডিট স্কোরিং ব্যবস্থার মাধ্যমে ছোট উদ্যোক্তার জন্য দ্রুত ঋণ অনুমোদন করা যেতে পারে। বিশেষ করে ছোট অঙ্কের ঋণের ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয় যাচাই ও ডিজিটাল অনুমোদন ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় কমাতে পারে।
তবে প্রযুক্তিনির্ভর ঋণব্যবস্থায় তথ্যের গোপনীয়তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং ভুল তথ্যের ঝুঁকি বিবেচনায় রাখতে হবে। প্রযুক্তি যেন জামানতের বিকল্প হয়ে নতুন বৈষম্যের কারণ না হয়, সে বিষয়েও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
নারী ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা। নারী ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য সমস্যাটি আরও জটিল। অনেকের পর্যাপ্ত জামানত নেই, আনুষ্ঠানিক হিসাবরক্ষণ নেই কিংবা দীর্ঘদিনের ব্যাংক লেনদেনের ইতিহাস নেই। ফলে সম্ভাবনাময় ব্যবসা থাকা সত্ত্বেও ঋণ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে নারী ও নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য পৃথক ঋণপণ্য, সহজ জামানত ব্যবস্থা, ব্যবসায়িক প্রশিক্ষণ এবং ঋণ-পরবর্তী পরামর্শসেবা প্রয়োজন। শুধু টাকা দিলেই উদ্যোক্তা সফল হবেন—এ ধারণা থেকে বেরিয়ে এসে অর্থায়নের সঙ্গে ব্যবসা ব্যবস্থাপনার সহায়তাও যুক্ত করতে হবে।
সমাধান কোথায়? প্রথমত, CMSME ঋণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণকে শুধু বিতরণের অঙ্ক দিয়ে বিচার করা যাবে না। ঋণ কোন উদ্যোক্তা পেলেন, কোন খাতে গেল, কত কর্মসংস্থান তৈরি হলো এবং ব্যবসার উৎপাদনশীলতা কতটা বাড়ল—এসব সূচকও বিবেচনায় আনতে হবে।
দ্বিতীয়ত, জামানতনির্ভর ঋণের পাশাপাশি নগদ প্রবাহভিত্তিক ঋণ চালু ও সম্প্রসারণ করতে হবে। ব্যবসার নিয়মিত বিক্রয় ও ব্যাংক লেনদেন একজন উদ্যোক্তার ঋণ পরিশোধের সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে।
তৃতীয়ত, ক্রেডিট গ্যারান্টি ও পুনঃঅর্থায়ন ব্যবস্থাকে আরও সহজ, দ্রুত ও স্বচ্ছ করতে হবে। এতে ব্যাংকের ঝুঁকি কমবে এবং জামানতহীন বা স্বল্পজামানতের উদ্যোক্তাদের অর্থায়নের সুযোগ বাড়বে।
চতুর্থত, উৎপাদন, প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানিমুখী শিল্প এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে ক্লাস্টারভিত্তিক অর্থায়ন কার্যকর হতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৬ সালে এ ধরনের ক্লাস্টার ফাইন্যান্সিং স্কিম চালুর উদ্যোগও নিয়েছে।
পঞ্চমত, উদ্যোক্তাদের জন্য এক-স্টপ ডিজিটাল সেবা চালু করা যেতে পারে, যেখানে ব্যবসা নিবন্ধন, করসংক্রান্ত নথি, ব্যাংক হিসাব ও ঋণ আবেদনের প্রয়োজনীয় তথ্য এক জায়গা থেকে ব্যবস্থাপনা করা যাবে।
সবশেষে, সাময়িক সংকটে পড়া কিন্তু সম্ভাবনাময় ব্যবসার জন্য বাস্তবসম্মত ঋণ পুনর্গঠনের ব্যবস্থা থাকতে হবে। কারণ সাময়িক সমস্যায় পড়া একজন উদ্যোক্তাকে সম্পূর্ণভাবে অর্থায়নব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দিলে ভবিষ্যতের সম্ভাবনাও নষ্ট হয়।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা ব্যাংকের করুণা চান না; তারা চান সহজ, ন্যায্য, স্বচ্ছ ও পূর্বানুমানযোগ্য অর্থায়নব্যবস্থা। বাস্তবতা হলো, CMSME খাতে ঋণ বিতরণে কিছু অগ্রগতি হলেও মোট ঋণে এ খাতের অংশ এখনো নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার অনেক নিচে। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের চাপও বাড়ছে। ফলে সামনে চ্যালেঞ্জ একদিকে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো, অন্যদিকে ঋণের মান ও আদায়যোগ্যতা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশের অর্থনীতিকে যদি বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের নতুন ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হয়, তাহলে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে ব্যাংকের বারান্দায় অপেক্ষমাণ রেখে সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। ব্যাংকের মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনতে হবে—সম্পত্তির পরিবর্তে ব্যবসার সক্ষমতা, কাগজের পরিবর্তে তথ্য, বড় গ্রাহকের পরিবর্তে বৈচিত্র্যময় উদ্যোক্তা এবং বিচ্ছিন্ন ঋণের পরিবর্তে উৎপাদনশীল খাতে পরিকল্পিত অর্থায়নকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আজকের ক্ষুদ্র উদ্যোগই আগামী দিনের মাঝারি শিল্প; আর আজকের মাঝারি শিল্পই হতে পারে আগামী দিনের বড় উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ভিত্তি। তাই CMSME উদ্যোক্তার হাতে সময়মতো পুঁজি পৌঁছে দেওয়া কোনো দয়া নয়—এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ।

