গত কয়েক বছরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রায় প্রতিটি পেশায় ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়েছে, আর আইন পেশাও তার ব্যতিক্রম নয়। নথি পর্যালোচনা, মামলার গবেষণা, চুক্তিপত্র খসড়া তৈরি— যেসব কাজ একসময় জুনিয়র আইনজীবী বা প্যারালিগ্যালদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিত, এখন তার একটা বড় অংশ এআই টুলস মিনিটের মধ্যে করে দিচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, তাহলে কি আইন পেশা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাবে? নাকি এটি নতুন রূপে বদলে যাচ্ছে?
পরিসংখ্যান যা বলছে
সাম্প্রতিক জরিপগুলো একটা স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরছে। এআই ইতিমধ্যে আইন পেশার দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে গেছে। থমসন রয়টার্সের ২০২৬ সালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪১ শতাংশ ল’ ফার্ম এবং ৪৭ শতাংশ কর্পোরেট লিগ্যাল বিভাগ এখন জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করছে, যা ২০২৫ সালে ছিল যথাক্রমে ২৮ ও ২৩ শতাংশ। প্রতি বছর সময়ের সাথে সাথে এআই এর ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে এই পেশায়।
ওল্টার্স ক্লুয়ারের একটি বৈশ্বিক জরিপেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে যে জরিপে অংশগ্রহণকারী শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশি আইনজীবী তাঁদের দৈনন্দিন কাজে অন্তত একটি এআই টুল ব্যবহার করছেন, যা মূলত আইনি গবেষণা, নথি বিশ্লেষণ, চুক্তি খসড়া তৈরি ও প্রক্রিয়া স্বয়ংক্রিয়করণের কাজে লাগছে। এক্ষেত্রে আইনজীবীদের প্রচুর সময় সাশ্রয় হচ্ছে।
৮am™ নামক লিগ্যাল টেকনোলজি প্রতিষ্ঠানের তৈরী আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে সম্পর্কিত এক প্রতিবেদন বলছে, প্রায় ৬৯ শতাংশ আইন পেশাজীবী কাজের প্রয়োজনে ব্যক্তিগতভাবে এআই টুল ব্যবহার করেন বলে জানিয়েছেন।
প্রতিস্থাপন নয়, রূপান্তর
তবে বিশেষজ্ঞদের অধিকাংশের মত হলো, এআই আইনজীবীদের সরাসরি “প্রতিস্থাপন” করবে না বরং পেশার ধরন বদলে দেবে। ওল্টার্স ক্লুয়ারের প্রতিবেদনে এই পরিবর্তনকে বিপরীতকরণ” হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যেখানে নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজ (যেমন নথি পর্যালোচনা) থেকে আইনজীবীরা মুক্তি পেয়ে উচ্চ-মূল্যের কৌশলগত পরামর্শের দিকে বেশি সময় দিতে পারবেন। একই প্রতিবেদন স্পষ্ট করে বলছে, এটি আইন পেশার জন্য ক্ষতি নয়, বরং নতুন সম্ভাবনার দরজা।
আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশনের টাস্কফোর্সের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদনেও একই সুর শোনা গেছে। প্রতিবেদকদের ভাষায়, আইনজীবীরা এখন আর এআই দ্বারা প্রতিস্থাপিত হবেন কিনা তা নিয়ে ততটা চিন্তিত নন, বরং কীভাবে এআই টুলস ব্যবহার করে আরও দক্ষ আইনজীবী হয়ে ওঠা যায় তা নিয়েই বেশি মনোযোগী।
উদ্বেগও কম নয়
তবে ছবিটা পুরোপুরি আশাব্যঞ্জক নয়। থমসন রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৪৮ শতাংশ আইন পেশাজীবীর নিজস্ব বিচার-বুদ্ধি বিকাশের ওপর কী প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এই উদ্বেগ বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক জুনিয়র আইনজীবীদের ক্ষেত্র। কারণ যেসব প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ দিয়ে নতুন আইনজীবীরা দক্ষতা অর্জন করতেন, সেগুলোই এখন এআই দ্রুত করে দিচ্ছে।
থমসন রয়টার্স ইনস্টিটিউটের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ল’ ফার্মের ৭৮ শতাংশ পেশাজীবী মনে করেন, প্রারম্ভিক ক্যারিয়ারের আইনজীবীরা যেসব দক্ষতা এআই দিয়ে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে তা রপ্ত করতে অভিজ্ঞ সহকর্মীদের মেন্টরশিপের ওপর নির্ভরশীল। ফলে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে মেন্টরশিপের এই ঐতিহ্যবাহী প্রক্রিয়া কীভাবে টিকে থাকবে? জুনিয়র আইনজীবী কি আর নিয়োগ দিবে চেম্বার গুলা?
এছাড়া, আদালতে ভুয়া বা এআই-উৎপাদিত মিথ্যা রেফারেন্সসহ নথি জমা দেওয়ার মতো নৈতিক সমস্যাও ক্রমাগত সামনে আসছে, যা আইনি জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
যে দক্ষতাগুলো ভবিষ্যতে প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ হলো, আইনজীবীদের এমন দক্ষতা গড়ে তুলতে হবে যা এআই এখনো আয়ত্ত করতে পারেনি। আইনজীবীদের এমন মানবিক দক্ষতা ঝালাই করা উচিত যা এআই এখনো অর্জন করতে পারেনি। একই সঙ্গে কৌশলগতভাবে প্রযুক্তি গ্রহণ করা উচিত যা দক্ষতা বাড়ায় এবং ক্লায়েন্টের ফলাফল উন্নত করে। এর মধ্যে পড়ে- জটিল আলোচনা-দরকষাকষি, আদালতে যুক্তি উপস্থাপন, ক্লায়েন্টের সঙ্গে বিশ্বাস তৈরি, নৈতিক বিচার-বিবেচনা এবং জটিল, অস্পষ্ট পরিস্থিতিতে কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
আইন পেশায় আসা কি উচিত?
এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়, তবে বর্তমান তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট বলা যায়:
- পেশা বিলুপ্ত হচ্ছে না, বদলাচ্ছে। বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী নিকট ভবিষ্যতে ব্যাপক কর্মী ছাঁটাইয়ের সম্ভাবনা কম, কিন্তু কাজের ধরন উল্লেখযোগ্যভাবে বদলে যাচ্ছে। নিয়োগ আগের থেকে কমতে পারে বলে ধারনা করা হচ্ছে।
- টেকনিক্যাল দক্ষতা এখন অপরিহার্য। যেসব আইনজীবী এআই টুলস দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে জানবেন, তাঁরা প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকবেন।
- জুনিয়র পর্যায়ে প্রতিযোগিতা কঠিন হতে পারে। যেহেতু এন্ট্রি-লেভেল কাজের একটা অংশ এআই করে দিচ্ছে, নতুনদের জন্য শেখার ও দক্ষতা অর্জনের ধরন বদলে যেতে পারে। তাই মানিয়ে নেওয়ার সক্ষমতা জরুরি হয়ে উঠছে।
বলা যায়, আইন পেশা বিলুপ্ত হওয়ার বদলে এমন এক রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রযুক্তিগত দক্ষতা আর মানবিক বিচার-বুদ্ধি, দুটোই সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। যাঁরা এই পেশায় আসতে চান, তাঁদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট- শুধু আইনি জ্ঞান নয়, এআই সাক্ষরতা ও নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতাও এখন সমান গুরুত্বপূর্ণ যোগ্যতা। তবে প্রতিনিয়ত এ আই এর ব্যবহার এই পেশায় বৃদ্ধির ফলে, চাকরির পরিমান কমতে পারে। সেক্ষেত্রে ভবিষ্যতে সন্তানদের এই বিষয়ে পড়ালেখা করানোর ব্যপারে অভিভাবকরা উদাসিন হতে পারেন।

