রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সঞ্চালন কোম্পানি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডকে সরকারের অনুকূলে ১ হাজার ৫২৯ কোটি টাকার অগ্রাধিকারমূলক শেয়ার ইস্যুর অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। নতুন এই শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে কোম্পানিটির মূলধন কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
বিএসইসির সম্মতি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবের অনুকূলে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রায় ১৫৩ কোটি অগ্রাধিকারমূলক শেয়ার ইস্যু করবে পাওয়ার গ্রিড। মূলত ‘ডিপোজিট ফর শেয়ারস’ হিসেবে সরকারের দেওয়া অর্থ সমন্বয়ের অংশ হিসেবেই এই শেয়ার বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কোম্পানিটি এর আগেও সরকারের অনুকূলে বিপুল পরিমাণ প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যু করেছিল। ২০২৪ অর্থবছর পর্যন্ত জমা হওয়া অর্থের বিপরীতে তখন ১ হাজার ৩২৪ কোটি টাকার শেয়ার ছাড়ে প্রতিষ্ঠানটি। নতুন অনুমোদনের ফলে সরকারের অংশীদারত্ব আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যদিও কোম্পানিটির সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদনে কিছুটা উন্নতির আভাস দেখা গেছে, তবুও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক চাপে রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এ বিদ্যুৎ সঞ্চালন সংস্থা। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় ৬ টাকা ২৪ পয়সা হয়েছে, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে লোকসান ছিল। এতে সাময়িকভাবে ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত মিলেছে।
তবে পুরো বছরের চিত্র এখনো দুর্বল। সর্বশেষ সমাপ্ত হিসাব বছরে কোম্পানিটি শেয়ারপ্রতি ২ টাকা ৩০ পয়সা লোকসান করেছে। যদিও আগের বছরের তুলনায় লোকসানের পরিমাণ কমেছে, তারপরও টানা কয়েক বছর ধরে লোকসানে থাকা কোম্পানিটির আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
আর্থিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোম্পানিটির পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকা। ফলে নতুন শেয়ার ইস্যুকে মূলধন ঘাটতি সামাল দেওয়ার কৌশল হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকেরা।
পাওয়ার গ্রিডের পরিচালনা পর্ষদ গত কয়েক বছরে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের জন্য খুব সীমিত লভ্যাংশ ঘোষণা করেছে। কিছু বছরে নগদ লভ্যাংশ দেওয়া হলেও সাম্প্রতিক দুই অর্থবছরে কোনো লভ্যাংশ দেয়নি কোম্পানিটি। এতে বাজারে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আগ্রহেও প্রভাব পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে কোম্পানিটির বড় অংশের শেয়ার সরকারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উদ্যোক্তা পরিচালক ও সরকারের হাতে মিলিয়ে মোট শেয়ারের বড় অংশ থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশ তুলনামূলক কম। বাজারে ফ্রি-ফ্লোট শেয়ারের পরিমাণ সীমিত হওয়ায় শেয়ারটির দর ওঠানামাও তুলনামূলক সংবেদনশীল বলে জানান বাজার বিশ্লেষকেরা।
পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো উন্নয়নে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে পাওয়ার গ্রিড। জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ, নতুন উপকেন্দ্র নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন সক্ষমতা বাড়ানোর কাজেও প্রতিষ্ঠানটির বড় বিনিয়োগ রয়েছে। তবে এসব প্রকল্পে বিপুল ব্যয় এবং ঋণনির্ভর বিনিয়োগের কারণে আর্থিক চাপও বেড়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সরকারের অনুকূলে নতুন প্রেফারেন্স শেয়ার ইস্যুর ফলে কোম্পানির নগদ প্রবাহে কিছুটা স্বস্তি এলেও দীর্ঘমেয়াদে টেকসই মুনাফায় ফিরতে না পারলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরবে না।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে সর্বশেষ লেনদেনে পাওয়ার গ্রিডের শেয়ারের দাম ছিল ৩৩ টাকা ২০ পয়সা। গত এক বছরে শেয়ারটির দর ২৫ টাকা ৬০ পয়সা থেকে ৩৬ টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে।

