দীর্ঘদিন উৎপাদন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকা এমারেল্ড অয়েল ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ারদরে হঠাৎ অস্বাভাবিক উল্লম্ফন নিয়ে পুঁজিবাজারে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। কোম্পানিটির আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশও দুই বছরের বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে শেয়ারটির দর দ্রুত বাড়ছে। বিষয়টি নিয়ে ব্যাখ্যা জানতে চাইলেও কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো জবাব পায়নি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো কোম্পানির মৌলভিত্তিতে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক পরিবর্তন না ঘটলেও শেয়ারদরের অস্বাভাবিক উত্থান বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ এবং আর্থিক তথ্য প্রকাশ অনিয়মিত, সেসব ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
ডিএসই সূত্র জানিয়েছে, শেয়ারদরের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি নিয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে গত মে মাসে কোম্পানির কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে কোনো উত্তর দেওয়া হয়নি।
বাজার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাত্র এক মাসের ব্যবধানে কোম্পানিটির শেয়ারদর প্রায় অর্ধেক বেড়েছে। মে মাসের শুরুতে যেখানে শেয়ারটির মূল্য ছিল ১৪ টাকার সামান্য বেশি, জুনের শুরুতে তা ২০ টাকারও ওপরে উঠে যায়। এই দ্রুত মূল্যবৃদ্ধিকে স্বাভাবিক বাজার আচরণের বাইরে বলে মনে করছে স্টক এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ।
পুঁজিবাজার বিশ্লেষকদের মতে, কোনো কোম্পানির প্রকৃত আর্থিক অবস্থা, ব্যবসায়িক অগ্রগতি কিংবা উৎপাদন সক্ষমতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকলে বিনিয়োগকারীরা সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ না হওয়ায় এমারেল্ড অয়েলের বর্তমান ব্যবসায়িক অবস্থাও বিনিয়োগকারীদের কাছে অস্পষ্ট রয়ে গেছে।
কোম্পানিটি সর্বশেষ ২০২৩ সালের শেষভাগ পর্যন্ত আর্থিক তথ্য প্রকাশ করেছিল। এরপর থেকে নতুন কোনো আর্থিক বিবরণী বা ব্যবসায়িক হালনাগাদ তথ্য বাজারে দেওয়া হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় বা ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা কার্যত অন্ধকারে রয়েছেন।
শুধু আর্থিক তথ্য প্রকাশই নয়, কয়েক বছর ধরে কোম্পানিটির উৎপাদন কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। এর ফলে শেয়ারহোল্ডাররাও লভ্যাংশ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। সর্বশেষ ২০২২-২৩ অর্থবছরের জন্য নগদ লভ্যাংশ ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর আর কোনো লভ্যাংশ বিতরণ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তালিকাভুক্ত কোনো প্রতিষ্ঠানের জন্য নিয়মিত আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ এবং বিনিয়োগকারীদের তথ্য সরবরাহ করা বাধ্যতামূলক দায়িত্ব। এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী অনিয়ম বাজারের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
পুঁজিবাজারে প্রায় এক যুগ আগে তালিকাভুক্ত হওয়া এমারেল্ড অয়েলের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শেয়ার সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে রয়েছে। ফলে কোম্পানিটির শেয়ারদরের অস্বাভাবিক ওঠানামা হাজারো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীর আর্থিক সিদ্ধান্তের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কোম্পানিটির বর্তমান অবস্থা, উৎপাদন পুনরায় চালুর সম্ভাবনা এবং আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের বিষয়ে দ্রুত স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া প্রয়োজন। অন্যথায় শেয়ারদরের এই অস্বাভাবিক উত্থান নিয়ে জল্পনা-কল্পনা আরও বাড়তে পারে এবং বিনিয়োগকারীরা বাড়তি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে, পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে শুধু শেয়ারদরের ঊর্ধ্বগতি নয়, কোম্পানির মৌলিক অবস্থা ও তথ্য প্রকাশের ধারাবাহিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বিনিয়োগের আগে বিনিয়োগকারীদের আরও সতর্ক হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

