দেশের পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের মন্দাভাবের মধ্যে হঠাৎই আশাবাদের সঞ্চার হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান ও কয়েকজন কমিশনারের পদত্যাগের খবর প্রকাশের পরই বাজারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়।
দিনের শুরুতে দরপতনের প্রবণতা থাকলেও শেষ পর্যন্ত শক্তিশালী উত্থানের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় নয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ লেনদেনের রেকর্ডও গড়েছে দেশের প্রধান শেয়ারবাজার।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নেতৃত্ব পরিবর্তনের খবর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করেছে। দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে আস্থাহীনতা, দুর্বল লেনদেন এবং মূল্যসূচকের অস্থিরতা নিয়ে আলোচনা চলছিল। এমন পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তনের ঘোষণা বিনিয়োগকারীদের আচরণে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলেছে।
বৃহস্পতিবার লেনদেনের শুরুতে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর কমতে থাকে। ফলে প্রধান মূল্যসূচকও নেতিবাচক অবস্থানে চলে যায়। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে খবর ছড়িয়ে পড়ে যে বিএসইসির চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং কমিশনের চার সদস্য দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন। এরপরই বাজারের চিত্র দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে।
একের পর এক কোম্পানির শেয়ার দরপতনের তালিকা থেকে বেরিয়ে ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরে আসে। ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়তে থাকায় বাজারে লেনদেনের গতি বৃদ্ধি পায় এবং শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ কোম্পানির শেয়ারদর বেড়ে দিন শেষ হয়। এর ফলে টানা নবম কার্যদিবসের মতো ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে থাকল পুঁজিবাজার।
দিন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ২৪২টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ১০৪টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪৫টির। অর্থাৎ বাজারে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর বড় অংশই ইতিবাচক প্রবণতায় ছিল।
ভালো লভ্যাংশ প্রদানকারী কোম্পানিগুলোর মধ্যেও শক্তিশালী উত্থান লক্ষ্য করা গেছে। বাজারের প্রথম সারির অনেক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়েছে, যা বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে মাঝারি মানের এবং দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল অবস্থানে থাকা কোম্পানিগুলোর শেয়ারেও ক্রয়চাপ লক্ষ্য করা গেছে।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দীর্ঘদিন ধরে লোকসান বা লভ্যাংশহীন অবস্থার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় থাকা অনেক কোম্পানির শেয়ারও এদিন ঊর্ধ্বমুখী ছিল। সাধারণত বাজারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হলে এই ধরনের কোম্পানিতেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ দেখা যায়, বৃহস্পতিবারের লেনদেনেও তার প্রতিফলন ঘটেছে।
বাজারের সার্বিক উন্নতির ফলে প্রধান মূল্যসূচক উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডিএসইর প্রধান সূচক ৩৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ৫ হাজার ৪৭৫ পয়েন্টে পৌঁছেছে। শরিয়াহভিত্তিক সূচক এবং ব্লু-চিপ কোম্পানিগুলোর সূচকও ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এর মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ের ইতিবাচক ধারাবাহিকতা আরও শক্তিশালী হয়েছে।
তবে দিনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল লেনদেনের পরিমাণ। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে মোট লেনদেন হয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৫২ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের সর্বোচ্চ। একই সঙ্গে গত বছরের সেপ্টেম্বরের পর এটিই সবচেয়ে বড় দৈনিক লেনদেন। আগের কার্যদিবসের তুলনায় লেনদেন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উচ্চ লেনদেন সাধারণত বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বাজারে তারল্য বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। ফলে শুধু মূল্যসূচক বৃদ্ধি নয়, লেনদেনের এই প্রবৃদ্ধিও বাজারের জন্য ইতিবাচক সংকেত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
লেনদেনের শীর্ষে ছিল কয়েকটি ব্যাংক, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ এবং উৎপাদন খাতের কোম্পানি। এসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে বড় অঙ্কের লেনদেন হয়েছে, যা বাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বৃদ্ধির প্রতিফলন।
অন্যদিকে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। সেখানে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়েছে এবং সার্বিক মূল্যসূচক ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে দিন শেষ করেছে। যদিও লেনদেনের পরিমাণ কিছুটা কমেছে, তবুও বাজারের সামগ্রিক মনোভাব ইতিবাচক ছিল।
এদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আনা হয়েছে। চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন করপোরেট খাতের অভিজ্ঞ নির্বাহী মাসুদ খান। পাশাপাশি তিনজন নতুন কমিশনারও নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন আইন, আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং সিকিউরিটিজ খাতে অভিজ্ঞ পেশাজীবী।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনর্গঠন, বাজারে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যাগুলোর সমাধান করা। সাম্প্রতিক উত্থান মূলত প্রত্যাশাভিত্তিক প্রতিক্রিয়া হলেও এই ধারা টেকসই করতে হলে বাস্তব সংস্কার প্রয়োজন হবে।
তাদের মতে, বাজারে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি, কারসাজি নিয়ন্ত্রণ, তালিকাভুক্ত কোম্পানির জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বাড়াতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারলে বর্তমান ইতিবাচক মনোভাব দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারের জন্য সুফল বয়ে আনতে পারে।
নেতৃত্ব পরিবর্তনের খবরে একদিনেই বাজারে যে শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বিনিয়োগকারীরা নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা ও নীতিগত সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। এখন নজর থাকবে নতুন নেতৃত্বের অধীনে বাজার কতটা স্থিতিশীল ও আস্থাভিত্তিক পরিবেশে এগোতে পারে, সেদিকে।

