বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে বড় ধরনের সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছে নতুন নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। বাজারে কারসাজি, অনিয়ম ও কৃত্রিম প্রভাব বিস্তারের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান।
বৃহস্পতিবার দায়িত্ব গ্রহণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিএসইসি কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে নতুন কমিশনের অগ্রাধিকার ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বিনিয়োগ ও পুঁজিবাজারবিষয়ক বিশেষ সহকারী তানভীর গনি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব নাজমা মোবারেক এবং নবনিযুক্ত কমিশনাররা উপস্থিত ছিলেন।
নতুন চেয়ারম্যান বলেন, বর্তমান কমিশনের প্রধান লক্ষ্য হবে এমন একটি নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা, যা একদিকে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা কমিয়ে বাজারকে আরও গতিশীল করবে। তাঁর মতে, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে আধুনিক, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর এবং অংশীজনবান্ধব করে তুলতে হবে, যাতে বাজার পরিচালনায় দক্ষতা ও স্বচ্ছতা একসঙ্গে বৃদ্ধি পায়।
কারসাজির বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করে মাসুদ খান জানান, ভবিষ্যতে বাজারে কোনো ধরনের কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি, গুজবভিত্তিক লেনদেন বা সংঘবদ্ধ কারসাজি শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, অতীতের তুলনায় আরও দ্রুত এবং কার্যকরভাবে অনিয়মকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ ও দুর্বল আর্থিক অবস্থার কোম্পানিগুলোর ওপর শুরু থেকেই বাড়তি নজরদারি থাকবে।
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থরক্ষাকে নতুন কমিশনের কেন্দ্রীয় অঙ্গীকার হিসেবে উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, বাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এজন্য তথ্যপ্রকাশ, কোম্পানির জবাবদিহি এবং বাজার তদারকির ক্ষেত্রে নতুন পদ্ধতি চালুর বিষয়েও কাজ করা হবে।
তিনি আরও জানান, কমিশন কোনোভাবেই শেয়ারের দাম কৃত্রিমভাবে নিয়ন্ত্রণ করার পথে হাঁটবে না। বাজারে একটি শেয়ারের মূল্য যেন প্রকৃত চাহিদা, সরবরাহ ও কোম্পানির মৌলভিত্তির ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা থাকবে। বাজারের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিকে বাধাগ্রস্ত করে এমন কোনো হস্তক্ষেপে কমিশন আগ্রহী নয় বলেও তিনি ইঙ্গিত দেন।
নতুন কমিশনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে পুঁজিবাজারকে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসা। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে তদারকি, তথ্য বিশ্লেষণ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং বাজার পর্যবেক্ষণের কাজ আরও দ্রুত ও কার্যকর করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে কমিশনের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমও আধুনিকায়নের আওতায় আসবে।
বাজারে শক্তিশালী ও মানসম্পন্ন কোম্পানির অংশগ্রহণ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেছেন নতুন চেয়ারম্যান। তিনি জানান, ভালো কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে আনার জন্য সরাসরি তালিকাভুক্তির একটি নতুন ও কার্যকর কাঠামো তৈরির বিষয়ে কমিশন কাজ করবে। এতে বাজারের গভীরতা বাড়বে এবং বিনিয়োগকারীরা অধিক মানসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের সুযোগ পাবেন।
নতুন কমিশনের কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বৃদ্ধি। পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, করপোরেট সুশাসনের উন্নয়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাজারের স্থিতিশীলতা ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়তে পারে।
এদিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ নতুন চেয়ারম্যান ও তিন কমিশনার নিয়োগের প্রজ্ঞাপন জারি করে। চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন করপোরেট খাতের অভিজ্ঞ নির্বাহী মাসুদ খান। কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, আর্থিক খাতের পেশাজীবী তানভীর হাবিব রহমান এবং পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধান নাফিজ আল তারিক। তাঁদের চার বছরের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং দায়িত্ব পালনের সময় অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মসম্পর্ক না রাখার শর্ত আরোপ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, একই দিন সকালে আগের কমিশন পদত্যাগ করার পর দ্রুত নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। নতুন নেতৃত্বের কাছে এখন বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা, দীর্ঘদিনের আস্থাসংকট কাটিয়ে বাজারকে আরও স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক ও স্থিতিশীল অবস্থানে নিয়ে যাওয়া।

