বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা থাকলেও গত বছর বৈশ্বিক সম্পদ বৃদ্ধির অন্যতম বড় চালিকাশক্তি ছিল শেয়ারবাজার। বিভিন্ন দেশের পুঁজিবাজারে শক্তিশালী উত্থানের ফলে ২০২৫ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২০ লাখ নতুন লাখপতির আবির্ভাব ঘটেছে। একই সময়ে অতিধনী ব্যক্তিদের সম্পদ বৃদ্ধির হারও সাধারণ ধনীদের তুলনায় বেশি ছিল, যা বৈশ্বিক সম্পদ বণ্টনের বৈষম্য আরও স্পষ্ট করেছে।
আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ক্যাপজেমিনির সাম্প্রতিক সম্পদবিষয়ক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত বছর বিশ্বে লাখপতির সংখ্যা ৭ দশমিক ৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২ কোটি ৫৩ লাখে পৌঁছেছে। শুধু সংখ্যাই নয়, তাদের সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এক বছরে মোট সম্পদ ৮ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৯৮ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে দ্রুত প্রবৃদ্ধির রেকর্ড।
প্রতিবেদনে লাখপতি বলতে এমন ব্যক্তিদের বোঝানো হয়েছে, যাদের বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের পরিমাণ অন্তত ১০ লাখ মার্কিন ডলার। তবে ব্যক্তিগত বাসস্থান, দৈনন্দিন ব্যবহার্য সামগ্রী কিংবা সংগ্রহে থাকা মূল্যবান বস্তু এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত নয়। অর্থাৎ শেয়ার, বন্ড, নগদ অর্থ, বিনিয়োগ তহবিল এবং অন্যান্য আর্থিক সম্পদের ভিত্তিতে এ মূল্যায়ন করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাপী সম্পদ বৃদ্ধির এই প্রবণতার সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়েছেন অতিধনী ব্যক্তিরা। যাদের বিনিয়োগযোগ্য সম্পদের পরিমাণ ৩ কোটি ডলারের বেশি, তাদের সংখ্যা এবং সম্পদ উভয়ই অন্যদের তুলনায় দ্রুত বেড়েছে। গত বছর এ শ্রেণির মানুষের সংখ্যা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় আড়াই লাখে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে তাদের মোট সম্পদ বেড়েছে ৯ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর এবং উচ্চ প্রবৃদ্ধির বিভিন্ন খাতে শেয়ারের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছেন বড় বিনিয়োগকারীরা। ফলে সম্পদের নতুন সঞ্চয়ন প্রধানত উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীর মধ্যেই কেন্দ্রীভূত হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বে মোট লাখপতিদের মাত্র ১ শতাংশ এই অতিধনী শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বৈশ্বিক লাখপতি সম্পদের প্রায় ৩৫ শতাংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। অর্থাৎ সম্পদ বৃদ্ধির ধারা যত শক্তিশালী হয়েছে, সম্পদের কেন্দ্রীভবনও তত বাড়ছে।
দেশভিত্তিক বিশ্লেষণে বরাবরের মতোই সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৫ সালে দেশটিতে নতুন করে প্রায় ৭ লাখ ৩০ হাজার মানুষ লাখপতির কাতারে যুক্ত হয়েছেন। ফলে দেশটিতে মোট লাখপতির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ ৩০ হাজারে। শক্তিশালী শেয়ারবাজার, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মূল্যবৃদ্ধি এবং করপোরেট মুনাফা বৃদ্ধিকে এই প্রবৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এদিকে এশিয়াও সম্পদ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। গত বছর এশিয়ায় লাখপতির সংখ্যা ৯ দশমিক ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৮৩ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলের সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান চালিকা শক্তি ছিল চীন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ান নতুন নেতৃত্বে উঠে এসেছে।
বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার শেয়ারবাজারে বড় উত্থান এবং তাইওয়ানের চিপ ও সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে ব্যাপক প্রবৃদ্ধি বিনিয়োগকারীদের সম্পদ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পের প্রসার এবং বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির কারণে এসব দেশের বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বেড়েছে।
ইউরোপেও ধনীদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। সেখানে লাখপতির সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৬ শতাংশ বেড়েছে। তবে অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় লাতিন আমেরিকায় প্রবৃদ্ধি ছিল অনেক ধীর। ওই অঞ্চলে লাখপতির সংখ্যা মাত্র দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। সেখানে লাখপতির সংখ্যা ১ দশমিক ৪ শতাংশ কমেছে। জ্বালানি বাজারের ওঠানামা, আঞ্চলিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের পরিবর্তনকে এর পেছনের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধনী ব্যক্তিদের বিনিয়োগ আচরণেও বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে অনেকেই বিপুল পরিমাণ অর্থ নগদ বা স্বল্প ঝুঁকির সম্পদে রাখতেন, এখন তারা বেশি ঝুঁকছেন শেয়ারবাজার ও উচ্চ প্রবৃদ্ধির খাতে বিনিয়োগের দিকে। এর ফলে সম্পদ বৃদ্ধির গতি আরও দ্রুত হয়েছে।
একই সঙ্গে সম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও নতুন প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে ধনী বিনিয়োগকারীরা একটি মাত্র আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে একাধিক সম্পদ ব্যবস্থাপক, বিনিয়োগ পরামর্শক এবং বিশেষজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সহায়তা নিচ্ছেন। এতে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হচ্ছে এবং বিনিয়োগের সুযোগও বিস্তৃত হচ্ছে।
অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বৈশ্বিক শেয়ারবাজারের সাম্প্রতিক উত্থান বিশ্বের সম্পদশালী মানুষের সংখ্যা বাড়ালেও এর সুফল সমানভাবে সবার কাছে পৌঁছায়নি। কারণ শেয়ারবাজারে বড় বিনিয়োগ করার সক্ষমতা মূলত উচ্চ আয়ের মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ফলে বাজার যত বাড়ছে, ধনী ও সাধারণ মানুষের সম্পদের ব্যবধানও অনেক ক্ষেত্রে আরও বিস্তৃত হচ্ছে।
তাদের মতে, আগামী বছরগুলোতে প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং সবুজ জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক সম্পদ বৃদ্ধির ধারা আরও জোরালো হতে পারে। তবে একই সঙ্গে সম্পদ বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করাও নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সাল বিশ্ব অর্থনীতির জন্য এমন একটি বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যখন শেয়ারবাজারের উত্থান লাখো মানুষকে নতুন করে সম্পদশালীদের তালিকায় যুক্ত করেছে। তবে এই সম্পদ বৃদ্ধির বড় অংশ যে এখনও অল্পসংখ্যক অতিধনীর হাতে কেন্দ্রীভূত, সেই বাস্তবতাও সমানভাবে সামনে এসেছে।

