পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার নতুন নেতৃত্ব দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম কার্যদিবসেই দেশের শেয়ারবাজারে দেখা গেছে শক্তিশালী ইতিবাচক প্রবণতা। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা ও আস্থার প্রতিফলন হিসেবে লেনদেনের শুরু থেকেই অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়েছে, যার ফলে সূচকে উল্লেখযোগ্য উত্থান হয়েছে।
রোববার দিনের শুরুতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ব্যাপক কেনার চাপ লক্ষ্য করা যায়। অধিকাংশ খাতের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বাড়তে থাকায় প্রধান মূল্যসূচক দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হয়। একই সঙ্গে লেনদেনেও গতি ফিরে আসে, যা সাম্প্রতিক সময়ের স্থবির বাজার পরিস্থিতির তুলনায় অনেক বেশি ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরে।
লেনদেন শুরুর প্রথম আধাঘণ্টার মধ্যেই প্রধান সূচক ৫০ পয়েন্টের বেশি বেড়ে যায়। বাজারে দাম বৃদ্ধির তালিকায় স্থান পায় আড়াই শতাধিক কোম্পানি। একই সময়ে লেনদেনের পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকা অতিক্রম করে, যা বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ইঙ্গিত দেয়।
শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। সেখানে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বাড়ায় সার্বিক সূচক ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে চলে যায়। লেনদেনের গতিও ছিল তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, নতুন চেয়ারম্যান ও কমিশনের প্রতি বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা এই উত্থানের অন্যতম কারণ। দীর্ঘদিন ধরে বাজারে সুশাসনের ঘাটতি, কারসাজির অভিযোগ, বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা এবং ধারাবাহিক দরপতনের কারণে বাজারে হতাশা বিরাজ করছিল। নতুন নেতৃত্ব এসব সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেবে—এমন আশাবাদ থেকেই অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে শেয়ার কেনায় আগ্রহী হয়েছেন।
ব্রোকারেজ হাউসগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক মাসে বাজারে লেনদেন কমে যাওয়া এবং অধিকাংশ শেয়ারের দর নিম্নমুখী থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী অপেক্ষার অবস্থানে ছিলেন। নতুন কমিশনের অধীনে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে নতুন করে ইতিবাচক মনোভাব গড়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শেয়ারবাজারে সূচকের সাময়িক উত্থানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার। কারণ আস্থা ছাড়া কোনো বাজার দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হতে পারে না। এজন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে দ্রুত কিছু দৃশ্যমান সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে।
তাদের মতে, বাজারে ভালো মৌলভিত্তির নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্ত করা, দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ কোম্পানির তালিকাভুক্তি নিয়ন্ত্রণ, করপোরেট সুশাসন জোরদার এবং বাজার কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া এখন সময়ের দাবি। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করা গেলে বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বাজারের তথ্য অনুযায়ী, লেনদেনের শুরুতে প্রায় সব খাতেই শেয়ারদর বাড়লেও পরে কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে মুনাফা তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে সূচকের ঊর্ধ্বগতির গতি কিছুটা কমে আসে। তবুও সার্বিকভাবে বাজার শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়।
সকাল ১০টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে ২২৯টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে দাম কমেছে ৮৫টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ৬৭টির। এ সময় প্রধান সূচক প্রায় ৫০ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি ডিএসই-৩০ সূচক ১৯ পয়েন্ট এবং শরিয়াহভিত্তিক সূচক ৭ পয়েন্ট বেড়েছে।
একই সময়ে ডিএসইতে মোট লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪১১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, যা বাজারে সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও ইতিবাচক চিত্র দেখা গেছে। সেখানে সার্বিক মূল্যসূচক ৮১ পয়েন্ট বেড়েছে। লেনদেন হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে অধিকাংশের শেয়ারদর বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট লেনদেনের পরিমাণ ছিল ২ কোটি ১৫ লাখ টাকার বেশি।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, নতুন নেতৃত্বের প্রথম দিনে বাজারের এই উত্থান মূলত প্রত্যাশা ও আস্থার প্রতিফলন। তবে এই ইতিবাচক ধারা ধরে রাখতে হলে শুধু আশাবাদ নয়, বাস্তবভিত্তিক সংস্কার, স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতিমালা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাজারকে দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে হবে। অন্যথায় সাময়িক উচ্ছ্বাস দীর্ঘস্থায়ী হবে না।
তাদের মতে, আগামী কয়েক সপ্তাহে নতুন কমিশনের নীতিগত পদক্ষেপ, বাজার উন্নয়ন পরিকল্পনা এবং বিনিয়োগকারীবান্ধব সিদ্ধান্তগুলোই নির্ধারণ করবে এই উত্থান কেবল এক দিনের ঘটনা হয়ে থাকবে, নাকি তা বাজার পুনরুদ্ধারের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হবে।

