ঈদুল আজহার দীর্ঘ ছুটি শেষে দেশের পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে লেনদেন ও সূচকে। সোমবার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের পরিমাণ দেড় হাজার কোটি টাকা অতিক্রম করেছে, যা প্রায় দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
একই সঙ্গে প্রধান সূচকেও শক্তিশালী উত্থান দেখা গেছে। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থায় সংস্কারের প্রত্যাশা এবং ভবিষ্যৎ নীতিগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়িয়েছে।
দিনজুড়ে ক্রয়চাপের কারণে বাজার ইতিবাচক ধারায় ছিল। মাঝপথে কিছু বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তা বাজারের সামগ্রিক গতিকে থামাতে পারেনি। ফলে কার্যদিবস শেষে ডিএসইর প্রধান সূচক ৪১ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৫১৬ পয়েন্টে পৌঁছায়। আগের কার্যদিবসে সূচকটির অবস্থান ছিল ৫ হাজার ৪৭৫ পয়েন্টে। একই সময়ে ব্লু-চিপভিত্তিক সূচক এবং শরিয়াহভিত্তিক সূচকও ঊর্ধ্বমুখী অবস্থানে দিন শেষ করে।
বাজারে বড় মূলধনী কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়ায় সূচকের উত্থানে গতি যোগ হয়। বিশেষ করে তামাক, ওষুধ, প্রযুক্তি এবং টেলিযোগাযোগ খাতের কিছু শীর্ষ কোম্পানির শেয়ার বিনিয়োগকারীদের নজর কাড়ে। এসব প্রতিষ্ঠানের ইতিবাচক পারফরম্যান্স বাজারে আস্থার বার্তা দিয়েছে।
সোমবার ডিএসইতে মোট ১ হাজার ৫২৯ কোটি টাকার শেয়ার ও সিকিউরিটিজ লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে এ পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৩৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানে লেনদেন উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। সর্বশেষ ২০২৪ সালের আগস্টে এর চেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছিল। ফলে বর্তমান বাজার পরিস্থিতিকে অনেক বিনিয়োগকারী নতুন গতি সঞ্চারের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন।
দিনভর লেনদেনে অংশ নেওয়া ৩৯৩টি কোম্পানি, মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ডের মধ্যে ১৮৪টির দর বেড়েছে। বিপরীতে দর কমেছে ১৬০টির এবং অপরিবর্তিত ছিল ৪৯টির। অর্থাৎ বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের সক্রিয় উপস্থিতি থাকলেও ইতিবাচক অবস্থানই ছিল বেশি শক্তিশালী।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নতুন কমিশনের অধীনে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক গণপ্রস্তাব এবং মার্জিন ঋণসংক্রান্ত কিছু বিধিনিষেধ শিথিল হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে বাজারে আলোচনা চলছে। এর ফলে অনেক বিনিয়োগকারী নতুন করে শেয়ার কেনায় আগ্রহী হচ্ছেন। ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি কার্যদিবস ধরে সূচক বৃদ্ধির পেছনেও এই মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাজারে যে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, তা কেবল স্বল্পমেয়াদি জল্পনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে অপেক্ষমাণ বিনিয়োগকারীদের আস্থারও প্রতিফলন। যদি নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় থাকে এবং সংস্কার কার্যক্রম দৃশ্যমান অগ্রগতি পায়, তাহলে বাজারে আরও নতুন বিনিয়োগ প্রবাহিত হতে পারে।
খাতভিত্তিক লেনদেনে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ছিল সাধারণ বীমা খাত। মোট লেনদেনের প্রায় ১৭ শতাংশের কাছাকাছি অংশ এই খাতের দখলে ছিল। এর পরেই অবস্থান করেছে প্রকৌশল খাত। ওষুধ ও রসায়ন খাতও উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে। এছাড়া বস্ত্র ও ব্যাংক খাতেও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো।
রিটার্নের দিক থেকে সাধারণ বীমা খাত সবচেয়ে ভালো অবস্থানে ছিল। পাশাপাশি খাদ্য, সিমেন্ট এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান খাতেও ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। অন্যদিকে পাট, কাগজ ও মুদ্রণ এবং সেবা ও আবাসন খাতের বেশ কয়েকটি কোম্পানির শেয়ার দরপতনের মুখে পড়ে।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, বাজারে বর্তমানে দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে—বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যৎ সংস্কারের প্রত্যাশা। তবে তারা সতর্ক করে বলেছেন, টেকসই ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় রাখতে হলে শুধু প্রত্যাশা নয়, বাস্তব সংস্কার এবং সুশাসন নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় স্বল্পমেয়াদি উচ্ছ্বাস দ্রুতই ম্লান হয়ে যেতে পারে।
সব মিলিয়ে ঈদের ছুটির পর পুঁজিবাজারে যে প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে, তা দীর্ঘদিনের স্থবিরতা কাটিয়ে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। লেনদেনের পরিমাণ, সূচকের উত্থান এবং বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে বাজারে ইতিবাচক মনোভাব ক্রমেই শক্তিশালী হচ্ছে।

