বিশ্ব অর্থনীতিতে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তার পর আশার আলো দেখছেন বিনিয়োগকারীরা। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত নিরসনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য সমঝোতার খবর প্রকাশের পর বিশ্বজুড়ে শেয়ারবাজারে ব্যাপক উত্থান দেখা গেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের স্বস্তি ফিরে এসেছে। কয়েক মাস ধরে যুদ্ধের কারণে যে উদ্বেগ আর্থিক বাজারকে চাপে রেখেছিল, তা অনেকটাই কমে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির অবসান ঘটলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্ব অর্থনীতিই এর ইতিবাচক প্রভাব অনুভব করবে। কারণ বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের একটি বড় অংশ ওই অঞ্চলের স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল।
সমঝোতার সম্ভাবনার খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ ও এশিয়ার অধিকাংশ শেয়ারবাজারে শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা যায়। বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদে আবারও আগ্রহ দেখাতে শুরু করেন। ফলে প্রযুক্তি, শিল্প, আর্থিক সেবা এবং ভোক্তাপণ্য খাতের শেয়ারগুলোর চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
যুক্তরাষ্ট্রের বাজার খোলার আগেই বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। প্রধান সূচকগুলোর ফিউচার লেনদেনে উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা যায়, যা বাজারে সম্ভাব্য শক্তিশালী সূচনার ইঙ্গিত দেয়। ইউরোপের প্রধান শেয়ারবাজারগুলোও একই ধারায় লেনদেন করে, যেখানে বিনিয়োগকারীরা যুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রত্যাশায় শেয়ার কেনায় সক্রিয় হন।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল হরমুজ প্রণালি ঘিরে। বিশ্বের সমুদ্রপথে পরিবাহিত বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে যাতায়াত করে। যুদ্ধের কারণে সেখানে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি হওয়ায় তেল সরবরাহ এবং মূল্য নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
এ পরিস্থিতিতে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে পরিবহন, উৎপাদন এবং ভোগ্যপণ্যের বাজারে। অনেক দেশেই মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়তে শুরু করে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহার নীতি নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে সম্ভাব্য সমঝোতার খবর প্রকাশের পর আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে বড় ধরনের দরপতন ঘটে। একদিনের ব্যবধানে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৪ ডলারের বেশি কমে যায়। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুদ্ধের ঝুঁকি কমে গেলে সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়, আর সেই প্রত্যাশাই দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম কমা শুধু জ্বালানি খাতের জন্য নয়, পুরো বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক সংকেত। এতে পরিবহন ব্যয় কমতে পারে, উৎপাদন খরচ হ্রাস পেতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপও কিছুটা কমার সুযোগ তৈরি হবে।
এশিয়ার বাজারে এ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। জাপানের শেয়ারবাজারে বড় উত্থান দেখা গেছে এবং প্রধান সূচক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনায় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। গত এক বছরে এআই-সংশ্লিষ্ট খাত জাপানের বাজারে প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, হংকং, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ান এবং ভারতের বাজারেও শক্তিশালী ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ার ফলে বাজারে লেনদেনের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনলেও এখনো পুরো পরিস্থিতি স্থায়ীভাবে স্থিতিশীল হয়নি। কারণ ঘোষিত সমঝোতা বাস্তবে কত দ্রুত কার্যকর হবে এবং দুই পক্ষ কতটা প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, সেটিই আগামী দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান এবং হরমুজ প্রণালিতে স্বাভাবিক নৌ চলাচল নিশ্চিত হলে বিশ্ব অর্থনীতি নতুন করে গতি পেতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশগুলো এর সবচেয়ে বেশি সুবিধা পাবে। উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোর জন্যও এটি স্বস্তির খবর হতে পারে, কারণ জ্বালানি ব্যয় কমলে আমদানি ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ উভয়ই কমার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এদিকে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সিদ্ধান্তের দিকে। সুদহার, মূল্যস্ফীতি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে তাদের পরবর্তী পদক্ষেপ বৈশ্বিক আর্থিক বাজারের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সামগ্রিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনা বিশ্ববাজারে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। শেয়ারবাজারের উত্থান, তেলের দামের পতন এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে আসার প্রবণতা ইঙ্গিত দিচ্ছে—দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর বৈশ্বিক অর্থনীতি হয়তো আবারও স্থিতিশীলতার পথে এগোতে শুরু করেছে।

