দেশের শেয়ারবাজারে সূচক, লেনদেন ও বাজার মূলধন—সবকিছুতেই ইতিবাচক অগ্রগতি দেখা গেলেও অর্থনীতির সামগ্রিক আকারের তুলনায় বাজারের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
দুই বছরের বেশি সময় ধরে নতুন কোনো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) না আসা, মানসম্পন্ন কোম্পানির ঘাটতি এবং শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি মূলধন সংগ্রহে পুঁজিবাজারের সীমিত ভূমিকার কারণে জিডিপির অনুপাতে শেয়ারবাজারের পরিধি আরও সংকুচিত হয়েছে বলে মনে করছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা।
সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ‘মার্কেট ক্যাপ টু জিডিপি’ অনুপাত ১১ দশমিক ৯৩ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ৪২ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ বাজার মূলধন বাড়লেও দেশের অর্থনীতি যেভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে, শেয়ারবাজার সেই গতিতে এগোতে পারেনি। ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে পুঁজিবাজারের অংশগ্রহণ আগের তুলনায় আরও কমেছে।
ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন পর্যন্ত সরকারি বন্ডসহ সব ধরনের সিকিউরিটিজের মোট বাজার মূলধন দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৬৯২ কোটি টাকা। এক বছর আগে যা ছিল ৬ লাখ ৬২ হাজার ২৭১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরে বাজার মূলধন বেড়েছে ৩৬ হাজার ৪২১ কোটি টাকা। সরকারি বন্ড বাদ দিলে কোম্পানির শেয়ারসহ অন্যান্য সিকিউরিটিজের বাজার মূলধনও প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু এই প্রবৃদ্ধি দেশের জিডিপি বৃদ্ধির তুলনায় যথেষ্ট না হওয়ায় অনুপাত কমে গেছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি দেশের অর্থনীতিতে পুঁজিবাজার কতটা কার্যকর, তা বোঝার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো ‘মার্কেট ক্যাপ টু জিডিপি’ অনুপাত। উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোতে এই অনুপাত সাধারণত ১০০ থেকে ২০০ শতাংশ বা তারও বেশি থাকে। অনেক উদীয়মান অর্থনীতিতেও এটি ৫০ শতাংশের ওপরে অবস্থান করে। সেখানে বাংলাদেশের অনুপাত মাত্র ১১ শতাংশের ঘরে থাকা দেশের পুঁজিবাজারের সীমিত পরিধিরই প্রতিফলন।
বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতিগুলোর সঙ্গে তুলনা করলে ব্যবধান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে শেয়ারবাজারের বাজার মূলধন দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। যুক্তরাজ্যে এই অনুপাত প্রায় ৯১ থেকে ১২০ শতাংশের মধ্যে ওঠানামা করে। প্রতিবেশী ভারতেও এটি ১২৫ থেকে ১৩৭ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। সেই তুলনায় বাংলাদেশের শেয়ারবাজার এখনও অর্থনীতির প্রকৃত সম্ভাবনার অনেক নিচে অবস্থান করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শক্তিশালী পুঁজিবাজার একটি দেশের শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশে এখনও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল। ফলে অর্থায়নের বিকল্প উৎস হিসেবে শেয়ারবাজার তার প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে পারছে না।
এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হিসেবে নতুন আইপিওর অভাবকে গুরুত্ব দিচ্ছেন বাজারসংশ্লিষ্টরা। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুনে একটি ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান আইপিওর মাধ্যমে প্রায় ১০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করে। এরপর টানা দুই অর্থবছর কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠান শেয়ারবাজার থেকে নতুন মূলধন সংগ্রহ করতে পারেনি। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য নতুন বিনিয়োগের সুযোগ যেমন কমেছে, তেমনি বাজারের গভীরতাও সংকুচিত হয়েছে।
বাজার বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দেশে লক্ষাধিক নিবন্ধিত কোম্পানি থাকলেও চার শতাধিক প্রতিষ্ঠানও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত নয়। অথচ শিল্প খাতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের জন্য শেয়ারবাজারই সবচেয়ে উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম। নতুন ও বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত না হওয়ায় বাজারে মানসম্পন্ন শেয়ারের ঘাটতি ক্রমেই বাড়ছে।
গত ১৫ বছরে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে মূলধন সংগ্রহের পরিসংখ্যানও আশাব্যঞ্জক নয়। এই সময়ে ১৪৭টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১০ হাজার ৭১৪ কোটি টাকা সংগ্রহ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য অংশ এসেছে ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে, যাদের অনেক ক্ষেত্রেই আইন অনুযায়ী তালিকাভুক্ত হওয়া বাধ্যতামূলক। বিপরীতে উৎপাদনমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম থাকায় বাজারের বৈচিত্র্যও সীমিত রয়েছে।
অন্যদিকে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে বাজারের সামগ্রিক সূচকগুলো ইতিবাচক ছিল। ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স ১৯ শতাংশের বেশি বেড়ে ৫ হাজার ৭৬৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে। একই সময়ে ডিএস-৩০ সূচক প্রায় ২০ শতাংশ এবং শরিয়াহভিত্তিক সূচক ১০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। মোট লেনদেন ৫৫ শতাংশের বেশি বেড়ে ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে। বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের লেনদেনও আগের বছরের তুলনায় এক হাজার কোটি টাকার বেশি বেড়েছে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে শেয়ার লেনদেনও প্রায় ৭৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগে আগ্রহ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়।
তবে ইতিবাচক এসব সূচকের আড়ালেও বড় ধরনের দুর্বলতা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বর্তমানে তালিকাভুক্ত ৩৬০টি কোম্পানির মধ্যে ১২৫টি ‘জেড’ শ্রেণিতে রয়েছে। এর মধ্যে ৬০টির বেশি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ অথবা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। অনেক কোম্পানিই নিয়মিত লভ্যাংশ দিতে পারছে না। ফলে বিনিয়োগকারীদের জন্য মানসম্পন্ন শেয়ারের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী করতে হলে একদিকে দুর্বল কোম্পানিগুলোর সুশাসন ও আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে, অন্যদিকে বড় ও লাভজনক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে দ্রুত শেয়ারবাজারে আনতে হবে। এতে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়বে, বাজারের গভীরতা বৃদ্ধি পাবে এবং অর্থনীতির সঙ্গে পুঁজিবাজারের সংযোগও আরও শক্তিশালী হবে।
নিয়ন্ত্রক সংস্থা জানিয়েছে, আইপিও প্রক্রিয়া আরও সহজ ও আন্তর্জাতিক মানসম্মত করতে বিধিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। পাশাপাশি তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য কর সুবিধাও বাড়ানো হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে ভবিষ্যতে নতুন ও মানসম্পন্ন কোম্পানি শেয়ারবাজারে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সূচক বা লেনদেন বাড়লেই একটি পুঁজিবাজারকে শক্তিশালী বলা যায় না। অর্থনীতির আকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাজারের পরিধি বৃদ্ধি, নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ, বিনিয়োগকারীদের আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি মূলধন গঠনের সক্ষমতাই একটি কার্যকর শেয়ারবাজারের প্রকৃত মানদণ্ড। সেই জায়গায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজারের সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে।

