নতুন অর্থবছরের শুরুতে প্রথম কার্যদিবসের মন্দাভাব কাটিয়ে দ্বিতীয় কার্যদিবসে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন করেছে দেশের শেয়ারবাজার। জ্বালানি, অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বস্ত্র খাতের শেয়ারে ক্রয়চাপ বাড়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রাম—উভয় শেয়ারবাজারেই সূচক, লেনদেন এবং দরবৃদ্ধির তালিকায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা গেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার ফলে সামগ্রিক বাজারে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে।
সোমবারের লেনদেনের শুরুতে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বাড়লেও কিছু সময়ের মধ্যেই বিক্রির চাপ বাড়ায় প্রধান সূচক সাময়িকভাবে নিম্নমুখী হয়ে পড়ে। তবে দিনের মধ্যভাগ থেকে আর্থিক প্রতিষ্ঠান, জ্বালানি এবং বস্ত্র খাতের শেয়ারে ক্রেতাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাজারের চিত্র বদলে দেয়। শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক ধারাই বজায় থাকে এবং সূচক উল্লেখযোগ্য উত্থান নিয়ে দিনের লেনদেন শেষ হয়।
দিন শেষে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ১৭৭টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ও ইউনিটের দাম বেড়েছে। বিপরীতে ১৫৩টির দর কমেছে এবং ৫৯টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। খাতভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, অব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৮টি কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েছে, যেখানে কমেছে মাত্র ৪টির। জ্বালানি খাতে ১৮টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারদর বেড়েছে, কমেছে ৩টির। একইভাবে বস্ত্র খাতে ৩২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, আর দর কমেছে ১৮টির।
ভালো মৌলভিত্তির কোম্পানিগুলোর মধ্যেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। ১০ শতাংশ বা তার বেশি লভ্যাংশ দেওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৯২টির শেয়ারদর বেড়েছে, ৭৫টির কমেছে এবং ২৮টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। ১০ শতাংশের কম লভ্যাংশ দেওয়া মধ্যম মানের ৪২টি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম বেড়েছে। অন্যদিকে, ‘জেড’ ক্যাটাগরিভুক্ত ৪৩টি কোম্পানির শেয়ারদরও বৃদ্ধি পেয়েছে, যদিও এ শ্রেণির ৫০টি প্রতিষ্ঠানের দর কমেছে। তালিকাভুক্ত মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যেও ইতিবাচক প্রবণতা দেখা যায়; ১১টির দর বেড়েছে, ৭টির কমেছে এবং ১৬টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে।
দরবৃদ্ধির প্রভাবে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স আগের কার্যদিবসের তুলনায় ৪৩ পয়েন্ট বেড়ে ৫ হাজার ৭৮৭ পয়েন্টে পৌঁছেছে। একই সময়ে ডিএসই-৩০ সূচক ২৯ পয়েন্ট বেড়ে ২ হাজার ১৯১ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। শরিয়াহভিত্তিক ডিএসই শরিয়াহ সূচকও ৯ পয়েন্ট বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ১৭৮ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে।
সূচকের পাশাপাশি লেনদেনেও গতি ফিরেছে। এদিন ডিএসইতে মোট ১ হাজার ৫৩০ কোটি ৭ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। আগের কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ১ হাজার ৪৩৯ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক দিনের ব্যবধানে লেনদেন প্রায় ৯১ কোটি টাকা বেড়েছে, যা বাজারে বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
লেনদেনের শীর্ষে ছিল মালেক স্পিনিং, যার শেয়ার কেনাবেচার পরিমাণ দাঁড়ায় ৫৩ কোটি ৪০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে বেক্সিমকো ফার্মা, যেখানে লেনদেন হয়েছে ৪১ কোটি ২৬ লাখ টাকার। তৃতীয় অবস্থানে থাকা বেক্সিমকোর শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৪০ কোটি ৬ লাখ টাকার। এছাড়া আইপিডিসি ফাইন্যান্স, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট, আইটি কনসালট্যান্টস, ফারইস্ট নিটিং, শাহজিবাজার পাওয়ার এবং বিএসআরএম স্টিলও লেনদেনের শীর্ষ তালিকায় স্থান করে নেয়।
দরবৃদ্ধির তালিকায় সবচেয়ে এগিয়ে ছিল ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস। কোম্পানিটির শেয়ারদর প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছে। এরপর রয়েছে ড্রাগন সোয়েটার অ্যান্ড স্পিনিং এবং ফিনিক্স ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। এছাড়া প্রাইম ফাইন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, ইস্টার্ন ক্যাবলস, ক্রাউন সিমেন্ট, এমএল ডাইং, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স এবং ওয়াটা কেমিক্যালসও শীর্ষ দরবৃদ্ধির তালিকায় ছিল।
অন্যদিকে, দরপতনের শীর্ষে ছিল ফ্যামিলিটেক্স (বিডি) লিমিটেড। এরপর খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ ইন্ডাস্ট্রিজ এবং জিল বাংলা সুগার মিলসের শেয়ারদর উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। এছাড়া দুলামিয়া কটন স্পিনিং মিলস, সাইফ পাওয়ারটেক, মাইডাস ফাইন্যান্স, শার্প ইন্ডাস্ট্রিজ, শাইনপুকুর সিরামিক্স, প্রাইম ইসলামী ইন্স্যুরেন্স এবং প্রাইম টেক্সটাইল স্পিনিং মিলসও দরপতনের শীর্ষ দশে ছিল।
চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জেও একই ধরনের ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে। বাজারটির সার্বিক মূল্যসূচক সিএএসপিআই ৯৭ পয়েন্ট বেড়েছে। মোট ২৫৬টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৪২টির শেয়ারদর বৃদ্ধি পেয়েছে, ৯৬টির কমেছে এবং ১৮টির দর অপরিবর্তিত রয়েছে। এদিন সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ৬৬ কোটি ৯৩ লাখ টাকা, যা আগের কার্যদিবসের ৬০ কোটি ৩৬ লাখ টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য বেশি।
বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন অর্থবছরের শুরুতে বড় ধরনের উত্থান বিনিয়োগকারীদের আস্থার একটি ইতিবাচক বার্তা দিলেও এই ধারা ধরে রাখতে হলে বাজারে মৌলভিত্তিক কোম্পানির প্রতি আগ্রহ, প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নীতিগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা প্রয়োজন। তাদের মতে, ধারাবাহিক লেনদেন বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন খাতে ক্রয়চাপ অব্যাহত থাকলে আগামী দিনগুলোতেও বাজারে ইতিবাচক গতি বজায় থাকতে পারে।

