দীর্ঘ ৪৬ বছরের করপোরেট জীবনের অভিজ্ঞতা শেষে দেশের পুঁজিবাজারে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতেই বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বলে জানিয়েছেন মাসুদ খান। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত সুনাম ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও শেষ পর্যন্ত সহধর্মিণীর পরামর্শ এবং দেশের জন্য কাজ করার দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেন।
বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) রাজধানীতে ক্যাপিটাল মার্কেট জার্নালিস্টস ফোরাম (সিএমজেএফ) আয়োজিত ‘সিএমজেএফ টক’ অনুষ্ঠানে নিজের দায়িত্ব গ্রহণের পেছনের অভিজ্ঞতা ও পুঁজিবাজার সংস্কার পরিকল্পনা তুলে ধরেন বিএসইসি চেয়ারম্যান। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সিএমজেএফের সভাপতি মনির হোসেন এবং সঞ্চালনা করেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব রাসেল।
মাসুদ খান বলেন, শুরুতে তিনি বিএসইসির দায়িত্ব নিতে রাজি হননি। অনেকেই তাকে সতর্ক করে বলেছিলেন, কমিশনের নেতৃত্বে আসা অনেকেই বিতর্কের মুখে পড়েছেন। জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে দীর্ঘদিনের অর্জিত সুনাম ঝুঁকিতে না ফেলাই ভালো—এমন পরামর্শও তিনি পেয়েছিলেন।
তিনি জানান, পরে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে আশ্বস্ত করা হয় যে, পুঁজিবাজার সংস্কারে সরকার আন্তরিক এবং কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হবে। কোনো ধরনের অযাচিত হস্তক্ষেপ থাকবে না—এই নিশ্চয়তার পর বিষয়টি নিয়ে তিনি পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করেন।
বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, রাতে বিষয়টি স্ত্রীকে জানালে তিনি ইস্তেখারা করার পরামর্শ দেন। পরদিন স্ত্রী তাকে জানান, দেশের স্বার্থে এই দায়িত্ব গ্রহণ করাই উচিত। তাঁর ভাষায়, করপোরেট জীবনে যা অর্জনের ছিল, তা তিনি অর্জন করেছেন। এখন দেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে শক্তিশালী করতে কাজ করার সময় এসেছে।
তিনি আরও জানান, দায়িত্ব গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রায় তিন মাস আগেই তিনি সংস্কার পরিকল্পনা তৈরি শুরু করেন। করপোরেট খাতে অর্জিত অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি আগে থেকেই স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রস্তুত করেন, যাতে দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্রুত কাজ শুরু করা যায়।
মাসুদ খানের মতে, একটি শক্তিশালী ও স্বচ্ছ পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনবল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য করপোরেট আইন, আর্থিক খাত ও পুঁজিবাজার সম্পর্কে বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে—এমন ব্যক্তিদের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব নিতে রাজি করাতে তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।
দায়িত্ব গ্রহণের পর নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলোর মধ্যে তিনি দীর্ঘদিনের ফ্লোর প্রাইস প্রত্যাহার, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে উদ্যোগ, বিদেশে তালিকাভুক্ত কোম্পানির গ্লোবাল ডিপোজিটরি রিসিপ্ট-সংক্রান্ত জটিলতা নিরসন এবং বাজার তদারকিতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়গুলো উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, অস্বাভাবিক শেয়ারদর বৃদ্ধি, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা তালিকাভুক্ত কোম্পানির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা এবং কিছু ক্ষেত্রে তালিকাভুক্তি-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বিএসইসির পূর্বানুমোদনের বাধ্যবাধকতা শিথিল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে বাজার আরও গতিশীল ও কার্যকর হয়।
বাজেটে পুঁজিবাজারবান্ধব বিভিন্ন কর-সুবিধা অন্তর্ভুক্ত করার ক্ষেত্রেও নিজের ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আন্তঃকোম্পানি লভ্যাংশে করের চাপ কমানো, মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের সীমাবদ্ধতা দূর করা, জিরো কুপন বন্ডে কর অব্যাহতি এবং তালিকাভুক্ত কোম্পানির জন্য বিভিন্ন কর-সংক্রান্ত প্রস্তাব বাস্তবায়নে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হয়েছে।
মিউচুয়াল ফান্ড খাতকে পুনরুজ্জীবিত করাকে অন্যতম অগ্রাধিকার উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সরাসরি শেয়ার কেনার পরিবর্তে পেশাদার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। একই সঙ্গে লাইসেন্সধারী আর্থিক পরামর্শক ব্যবস্থা চালু, প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের প্রক্রিয়া সহজ করা, নতুন কোম্পানির তালিকাভুক্তির সুযোগ বাড়ানো এবং বিদ্যমান বিধিমালা সময়োপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও আস্থাভিত্তিক পুঁজিবাজার ছাড়া দেশের অর্থনীতির টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়নই এখন কমিশনের প্রধান লক্ষ্য।

