পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের অর্থ সংরক্ষণ ও হিসাব পরিচালনায় একাধিক গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে হাজী আহমেদ সিকিউরিটিজ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। জরিমানার মুখে পড়া প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে গ্রাহকের তহবিলে দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি, অননুমোদিত উপায়ে নগদ অর্থ উত্তোলন এবং একই যোগাযোগ তথ্য ব্যবহার করে একাধিক বিও হিসাব খোলার অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।
কমিশনের সংশ্লিষ্ট আদেশ ও পরিদর্শন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জরিমানার অর্থ পরিশোধ না করলে আইনি বিধান অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পুঁজিবাজারের নিয়ম অনুযায়ী, গ্রাহকদের প্রাপ্য অর্থ ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানকে সবসময় আলাদা হিসাবে অক্ষত রাখতে হয়— এতে কোনো ধরনের ঘাটতি রাখার সুযোগ নেই। কিন্তু পরিদর্শনে দেখা যায়, ২০২২ সালের মাঝামাঝি সময়ে প্রতিষ্ঠানটির গ্রাহকদের কাছে দায় ছিল প্রায় সাড়ে এগারো কোটি টাকা, অথচ সংশ্লিষ্ট হিসাবে জমা ছিল মাত্র সোয়া নয় কোটি টাকার কিছু বেশি। ফলে সে সময় প্রায় দুই কোটি দশ লাখ টাকার ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।
উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ঘাটতি কোনো একবারের ঘটনা ছিল না। পরবর্তী দুই বছরে বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত একাধিক পরিদর্শনেও একই ধরনের ঘাটতি বারবার শনাক্ত হয়েছে, যা প্রতিষ্ঠানটির তহবিল ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিক দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয় বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
নিয়ম অনুযায়ী গ্রাহকের অর্থ লেনদেন হওয়ার কথা নির্ধারিত ব্যাংকিং মাধ্যমে— চেক, ব্যাংক ড্রাফট বা ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের মতো পদ্ধতিতে। সরাসরি নগদ অর্থ উত্তোলনের কোনো সুযোগ নেই। অথচ পরিদর্শনে দেখা গেছে, প্রায় তিন বছরের বেশি সময় ধরে একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে চেক ব্যবহার করে বারবার নগদ অর্থ তুলেছে প্রতিষ্ঠানটি, যা নিয়ন্ত্রক বিধির সরাসরি লঙ্ঘন বলে বিবেচিত হয়েছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর অনিয়ম ধরা পড়েছে বিও হিসাব পরিচালনায়। নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি বিও হিসাবের সঙ্গে বিনিয়োগকারীর নিজস্ব ই-মেইল, মোবাইল নম্বর ও ব্যাংক হিসাব সংযুক্ত থাকার কথা, যাতে প্রকৃত হিসাবধারী সহজে শনাক্ত করা যায়। কিন্তু পরিদর্শনে দেখা যায়, একই ই-মেইল ঠিকানা ব্যবহার করে একাধিক ক্ষেত্রে তিন থেকে ষোলটি পর্যন্ত পৃথক বিও হিসাব খোলা হয়েছে। এমনকি একটি মাত্র ই-মেইলের বিপরীতে ষোলটি হিসাব থাকার তথ্যও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। একইভাবে একই ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল নম্বর একাধিক বিও হিসাবে যুক্ত থাকার প্রমাণও পাওয়া গেছে বহু ক্ষেত্রে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের চর্চা প্রকৃত বিনিয়োগকারী শনাক্তকরণ ও লেনদেনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করে, এবং সন্দেহজনক লেনদেন বা পরিচয় গোপনের ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।
এসব অনিয়ম নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কাছে ব্যাখ্যা তলব করেছিল নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং আত্মপক্ষ সমর্থনেরও সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে দেওয়া ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হয়ে সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনার পর জরিমানার সিদ্ধান্ত নেয় কমিশন। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পে-অর্ডারের মাধ্যমে এই অর্থ পরিশোধ করতে বলা হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিকে।
কমিশনের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, গ্রাহকের অর্থ যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং প্রতিটি বিও হিসাবের তথ্য স্বতন্ত্র ও সঠিক রাখা ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক শর্ত। এ ধরনের অনিয়ম পুঁজিবাজারের স্বচ্ছতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত বলেই কমিশন বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে।
একজন পুঁজিবাজার বিশ্লেষক মন্তব্য করেন, ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্রাহকের অর্থ অনেকটা আমানতের মতোই একটি দায়িত্ব— সেখানে ঘাটতি দেখা দিলে স্বাভাবিকভাবেই বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তার মতে, শুধু জরিমানা করেই দায়িত্ব শেষ নয়, বরং একই ধরনের অনিয়ম যাতে ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য নিয়মিত ও কঠোর নজরদারি অব্যাহত রাখা প্রয়োজন।
এই ঘটনা আরও একবার স্পষ্ট করে দিলো যে পুঁজিবাজারের মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহক অর্থ ব্যবস্থাপনা ও হিসাব পরিচালনায় সামান্যতম গাফিলতিও নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজর এড়াচ্ছে না। তবে জরিমানা আরোপের পরও প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রমে প্রকৃত পরিবর্তন আনে কিনা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থা এ বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও কঠোর নজরদারি চালায় কিনা— তা এখন দেখার বিষয়।

